শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:০৬

পণ্য কেনাবেচায় নবীজির হুঁশিয়ারি

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

পণ্য কেনাবেচায় নবীজির হুঁশিয়ারি

মুমিনের দিলের দরজায় কড়া নাড়ছে রমজান। আল্লাহপ্রেমী বান্দারা আরও আগে থেকেই রমজানের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছেন। আমাদের চারদিকে তাকালে এ ধরনের মুত্তাকি বান্দা হয়তো দেখতে পাই না। কিন্তু রমজানের জন্য আরও আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া প্রেমিকবান্দা নেই- এ কথা কোনোভাবেই সত্য নয়। আগে হয়তো এ ধরনের রমজানপ্রেমিক বেশি ছিল, এখন হাতের গোনায় এসে ঠেকেছে সেসব প্রেমিকের সংখ্যা। তবে আছে তা নিশ্চিত। আফসোস! রমজানের জন্য আমাদের কোনো প্রস্তুতি নেই। ভুল বললাম। একশ্রেণির মানুষ তো প্রস্তুতি নিচ্ছে, নিজেদের প্রস্তুত করছে। কীভাবে রোজাদারের গলায় ছুরি ধরে বেশি লাভ করবে সে ধান্ধা আরও আগে থেকেই সেরে রেখেছে তারা। হ্যাঁ, আমি এ দেশের মজুদদার ব্যবসায়ীদের কথাই বলছি।

পৃথিবীতে আমরাই শুধু সেই জাতি, যারা রোজাদারদের গলায় ছুরি ধরে মোটা লাভের চিন্তায় ছয় মাস-এক বছর আগেই প্রস্তুতি নিই। অথচ অনেক অমুসলিম দেশেও রোজার মাসে রোজাদারদের জন্য বিশেষ সেবা দেওয়ার কথা শুনি। যেসব ব্যবসায়ী পণ্য মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তাদের ব্যাপারে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কঠোর হুঁশিয়ারিগুলো জেনে নিই। যদি একজন ব্যবসায়ীও আল্লাহকে ভয় করে আখেরাতের প্রতিদানের আশায় মানুষকে ঠকানো থেকে রোজাদারের গলায় ছুরি ধরা থেকে বেঁচে থাকে তাহলে বুঝব আমাদের এই লেখালেখি, ওয়াজ-নসিহত কাজে এসেছে। ইসলাম যদিও কেনাবেচা, স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা এমনকি ব্যক্তি-স্বাধীনতায় হাত দেয় না। তবে অন্যের ক্ষতি হয় কিংবা জাতীয় স্বার্থে আঘাত আসে এ ধরনের কাজকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে। মজুদদারির মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করাকে ঠিক এ কারণেই ইসলাম কঠিন অপরাধ মনে করে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মজুদকরণকে কঠোর ভাষায় নিষেধ করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিন পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্য মজুদ করে রাখবে, সে আল্লাহ থেকে দায়মুক্ত হয়ে যাবে এবং আল্লাহও তার থেকে দায়মুক্ত হয়ে যাবেন।’ মুসনাদে আহমদ। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, ‘মুজরিম তথা অপরাধীর পক্ষেই সম্ভব পণ্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা।’ মুসলিম। এ হাদিসের ব্যাখ্যায় এ সময়ের শ্রেষ্ঠ আলেম আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলার ড. ইউসুফ আল কারজাভি বলেন, আলোচ্য হাদিসে মজুদকারীকে অপরাধী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘অপরাধী’ কোনো সহজ কথা নয়। মহাগ্রন্থ কোরআনে অপরাধী শব্দটি ফেরাউন, হামান ও কারুনের মতো প্রতাপশালী এবং অহংকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই ফেরাউন, হামান ও তাদের সৈন্যবাহিনী অপরাধী ছিল।’ সূরা কাসাস, আয়াত ৮। মজুদকারীর নোংরা মনমানসিকতা ও কদর্যপূর্ণ স্বার্থপরতাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে ব্যক্ত করেছেন, ‘মজুদকারী ব্যক্তি কতই না নিকৃষ্ট যে, যদি জিনিসপত্রের দাম কমে গেছে শোনে তাহলে তার খারাপ লাগে, আর যদি শুনতে পায়, জিনিস-পত্রের দাম বেড়েছে তাহলে তার আনন্দ হয়।’ জামিউল উসুল মিন আহাদিসির রাসুল। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, ‘বাজারে পণ্য সরবরাহকারী ব্যক্তি রিজিকপ্রাপ্ত হয়, আর মজুদকারী ব্যক্তি হয় অভিশপ্ত!’ সুনানে ইবনে মাজাহ। মজুদকরণ ও পণ্যসামগ্রীর মূল্য নিয়ে খেলতামাশা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস সাহাবি মাকাল বিন ইয়াসার (রা.) বর্ণনা করেছেন। তা হলো- ‘হজরত হাসান (রা.) বর্ণনা করেন, মাকাল ইবনে ইয়াসার (রা.) অসুস্থ হলে উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ তাকে দেখতে গিয়ে বলেন, হে মাকাল! তুমি কি জানো যে, আমি অন্যায়ভাবে কারও রক্তপাত ঘটিয়েছি? তিনি বললেন, না, আমি জানি না। উবায়দুল্লাহ আবার বললেন, তুমি কি জানো যে, আমি মুসলমানদের জন্য পণ্যের মূল্য নির্ধারণে কোনো কারসাজি করেছি? মাকাল (রা.) বললেন, না, তা-ও আমি জানি না। এরপর তিনি বললেন, তোমরা আমাকে বসাও! তাকে বসানো হলে তিনি বললেন, হে উবায়দুল্লাহ! আমি তোমাকে এমন একটি বিষয় শোনাব, যা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে এক-দুইবার শুনিনি; আমি তাকে বহুবার বলতে শুনেছি, পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে যারা কোনো কারসাজি করে, আল্লাহর অধিকার হলো তাদের কিয়ামতের দিন আগুনের মধ্যে বসানো। উবায়দুল্লাহ বললেন, তুমি কি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে এটা শুনেছ? মাকাল বললেন, এক-দুইবার নয়; বহুবার শুনেছি।’ মুসনাদে আহমদ। হে আমার ব্যবসায়ী ভাই-বন্ধুগণ! রোজাদারদের কষ্ট দেওয়ার জন্য এত প্রস্তুতি এত কারসাজি করছেন, আপনি কি জানেন যত টাকাই ইনকাম করুন না কেন খালি পকেটেই যেতে হবে। যাদের জন্য আপনি রোজাদারদের সঙ্গে অপরাধীর আচরণ করছেন, সেই স্বজন-প্রিয়জনেরা কিন্তু কবরে আপনার সঙ্গী হবে না। হে আল্লাহ! আমার ব্যবসায়ী ভাই-বন্ধুদের তাওফিক দিন, তারা যেন রমজানের সফলতা অর্জন করতে পারেন। মজুদদারির অভিশাপ থেকে তাদের মুক্তি দিন।

লেখক : বিশিষ্ট মুফাস্সিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। চেয়ারম্যান : বাংলাদেশ মুফাস্সির সোসাইটি।

               www.selimazadi.com


আপনার মন্তব্য