Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ জুন, ২০১৯ ২৩:৩৯

ধর্মতত্ত্ব

বিদ্রোহী কবির কৃষকের ঈদ আজকের পরিপ্রেক্ষিত

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

বিদ্রোহী কবির কৃষকের ঈদ আজকের পরিপ্রেক্ষিত

নির্মম হলেও সত্য এ দেশের সব মানুষের ঘরে ঈদ আসে না। সব মানুষ ঈদের আনন্দের জোয়ারে ভাসতে পারে না। শুধু এ দেশেই নয়, এ বিভাজন পৃথিবীর সবখানেই দেখা যায়। একদল মানুষ উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে, আরেক দল মানুষ উপোসের বেদনায় চোখের জল ফেলে। যারা উৎসবের আনন্দে মেতে থাকে তারা কি কখনো উপোস করা মানুষের খোঁজ রাখে? হয়তো তারা ভেবেই নিয়েছে এক মাসের সংযম শেষে আমরা যেমন ভোগের পেয়ালায় ডুবে যাব, অন্য সবাই একইভাবে ভোগের পেয়ালায় হারিয়ে যাবে। সবাই যা ভুলে যায়, কবি তা মনে করিয়ে দেয়। এ জন্যই তিনি কবি। কবি লিখেছেন-

‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ

মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ।’

কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশে এ বড় বেদনাময় প্রশ্ন। আজ থেকে ৫০ বছর আগে ‘কৃষকের ঈদ’ নামে ব্যথাভরা কবিতা লিখেছেন নজরুল। তারও ৫০ বছর আগে বেগম রোকেয়া লিখেছেন কৃষকের রক্তে আঁকা প্রবন্ধ- ‘চাষার দুঃক্ষু’। যুগ যুগ ধরে এদেশের কৃষকরা যে মানবেতর জীবনযাপন করে আসছেন অল্প কথায় এত চমৎকারভাবে আর কেউ বলতে পারেনি। ‘চাষার দুঃক্ষু’ প্রবন্ধ শুরু হয়েছে ছোট্ট একটি কবিতা দিয়ে-

‘ক্ষেতে ক্ষেতে পুইড়া মরি রে ভাই/পাছায় জোটে না ত্যানা।

বৌ এর পৈছা বিকায় তবু/ছেইলা পায় না দানা।’

ক্ষেতে ক্ষেতে পুড়ে মরা কৃষককে নজরুল তুলনা করেছেন শীর্ণ গরুপালের সঙ্গে। নজরুল বলেছেন, ঈদের সকালে কৃষক যখন দল বেঁধে নামাজে যায়, দূর থেকে দেখে মনে হয়, একদল শীর্ণ গরু খোঁয়াড়ে যাচ্ছে। এ ব্যথাভরা দৃশ্য দেখে নবীজীর মুয়াজ্জিন বেলালের কথা মনে পড়ে যায় কবির। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, শ্রেষ্ঠ জাতি মুসলমানের জন্য এ দৃশ্য যে কত লজ্জার, তাই বোধহয় এ লজ্জামাখা দৃশ্য দেখার ভয়ে মরু গোরস্তানে লুকিয়ে আছেন বেলাল। চোখের জলে কৃষকের রোজা-ইফতার আর ঈদের দিনে ঋণের বোঝা মাথায় জীর্ণশীর্ণ দেহ নিয়ে হাঁটতে থাকা কৃষককে দেখে তাই বেলালের আজানও থেমে যায়। নজরুলের ভাষায়-

রোজা এফতার করেছে কৃষক অশ্রু-সলিলে হায়,/বেলাল! তোমার কণ্ঠে বুঝি গো আজান থামিয়া যায়!

থালা ঘটি বাটি বাঁধা দিয়ে হেরো চলিয়াছে ঈদগাহে,/তির-খাওয়া বুক, ঋণে-বাঁধা-শির, লুটাতে খোদার রাহে।

সারা বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করেও ‘পাছায় ত্যানা’ জোটাতে না পারার দৃশ্য একশ বছর আগে যেমন ছিল, এখনো তেমনই রয়ে গেছে কৃষক পরিবারে। তাই তো এ বছরও ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার যন্ত্রণা বুকে নিয়েই ঈদের নামাজ পড়তে যাবেন কৃষক। এবারও কৃষকের চোখের অশ্রু বেলালের আজান থামিয়ে দেবে। হায়! কৃষক মাঠে গিয়ে দেখবে, ওই তো সেই এজিদ- সিন্ডিকেটের মরণ বিষে যে কৃষকের ছেলে-মেয়ে-পরিবারের স্বপ্নময় ঈদকে হত্যা করেছে। আহা! ইমাম খুতবা পড়বেন, কিন্তু কৃষকের অধিকার নিয়ে কথা বলবেন না, জাকাত আদায়ের নির্দেশ দেবেন না; বরং নামাজ শেষে ওই সিন্ডিকেট এজিদের সঙ্গেই কোলাকুলি করবেন। তাই তো নজরুল বলেছেন, ঈদের মাঠে যত তাকবির ধ্বনি ওঠবে, কৃষকের হৃদয় ততই হাহাকার করে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে খান খান হয়ে যাবে।

‘কৃষকের ঈদ! ঈদগাহে চলে জানাজা পড়িতে তার,/যত তকবির শোনে, বুকে তার তত উঠে হাহাকার!

মরিয়াছে খোকা, কন্যা মরিছে, মৃত্যু-বন্যা আসে/এজিদের সেনা ঘুরিছে মক্কা-মসজিদে আশেপাশে।’

ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া কৃষকের কথা কে ভাববে? কে বলবে তার অধিকারের কথা? কোনো ইমাম তো খুতবায় কৃষকের কথা বলেন না। কোনো মৌলভী তো কৃষকের অধিকার আদায়ে রাস্তায় নামেন না। তাই বড় আফসোস করে নজরুল বলেছেন, কৃষকের অধিকার নিয়ে বলবে, সে ইমাম তো এখনো এ পৃথিবীতে আসেনি। ঈদগাহে কৃষকের লাশ ডিঙিয়ে ধনীরা আসে, লাশ ডিঙিয়েই চলে যায়। অথচ ইমাম চাইলে  ধনীদের বলে দিতে পারতেন, কৃষককে মেরে কোন ইসলাম করতে এসেছ তোমরা। আগে কৃষকের পাওনা  বুঝিয়ে দাও, তা না হলে ঈদের নামাজ পড়া হবে না। হায়! সে ইমাম নেই। ইমাম হয়তো জানেও না, কৃষক-চাষাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই যুগে যুগে নবীরসুলরা এসেছিলেন। হজরত মুহাম্মদ (সা.)সহ প্রায় নবীই চাষার বন্ধু রাখাল হয়ে জীবনযাপন করেছেন।

হে আল্লাহ! অসহায় কৃষিবাসীর গায়েবি সাহায্য করুন। তাদের জীবনে ঈদ আনন্দ দান করুন।

 

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, চেয়ারম্যান : বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি।

www.selimazadi.com

 


আপনার মন্তব্য