Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৬ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ জুন, ২০১৯ ২৩:২৫

মতামত

মানুষের মতো মানুষ হতে হবে

মাজহারুল ইসলাম

মানুষের মতো মানুষ হতে হবে

খান আতাউর রহমানের একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি দেখেছিলাম ১৯৭৪ সালে জামালপুরের কথাকলি সিনেমা হলে। স্বাধীনতার পর বখে যাওয়া যুবসমাজকে সুপথে আসার আহ্বান জানানো হয়েছিল ওই ছায়াছবিতে।

বাঙালিরা কখনই স্বাধীন জাতি ছিল না। ইংরেজ, মোগল, পাঠান, বর্গী, তুর্কি অনেকেই এ দেশ শাসন ও শোষণ করেছে দীর্ঘ সময়। কবিগুরু রবিঠাকুর দুঃখ করে লিখেছেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি...’। ১৯৭১ সালে জাতির জনক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। পাকিস্তানের লারকানা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন বঙ্গবন্ধু। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল জনসভায় কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর মুখে উচ্চারিত হলো- ‘কবিগুরুর বাণী মিথ্যা হয়েছে, আমার বাঙালিরা আজ মানুষ হয়েছে।’ আজ কবিগুরুও নেই, আমাদের বঙ্গবন্ধুও নেই। কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক তার হিসাব মেলাতে পারি না।

পত্রপত্রিকা খুললেই খুন, গুম, ধর্ষণ, ঘুষ, দুর্নীতি ইত্যাদি অমানবিক কর্মকাণ্ডের চিত্রই বেশি দেখি। বিচারহীনতা আর বিলম্বিত বিচারের সংস্কৃতি অপরাধীদের অপরাধ সংঘটনে উৎসাহ জোগাচ্ছে। অপরাধীরা অনেকেই শাস্তি না পেলেও নিরপরাধ অনেক মানুষ জেল খাটে এই দেশে। সবারই জানা, টাঙ্গাইলের নাগরপুরের জাহালম এক নিরপরাধ পাটকল শ্রমিক তিন বছর কারাভোগ করেছেন। বিজ্ঞ আদালতের সুনজরে না এলে হয়তো আজীবনই তাকে কারাভোগ করতে হতো। অতীতেও দেখেছি সিলেট কারাগারে সুনামগঞ্জের এক নিরীহ লোক সুদীর্ঘ ২২ বছর কারাভোগ করেছেন। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নির্দোষ। সমগ্র বাংলাদেশের কারাগারগুলো তদন্ত করে প্রত্যেক কয়েদিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হয়তো বা আরও অজানা অনেক তথ্যই বেরিয়ে আসবে। বাংলাদেশের সংবিধানেও আইনের শাসনের কথাটি সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে। প্রত্যেক নাগরিকই আইনের চোখে সমান। বাস্তবতা তো ভিন্ন। আমরা প্রতিনিয়ত দেখি, অসংখ্য অগণিত নিরপরাধ লোক শাস্তি পাচ্ছে। অথচ দাগি খুনের আসামি, সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুটপাটকারী, ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড। অথচ আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিংনির্ভর শিক্ষার প্রবণতা দেখে মনে হয় অশুভ চক্র কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিচ্ছে। স্বাস্থ্যকে বলা হয় ‘সকল সুখের মূল’। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতালগুলো অধিক মুনাফার জন্য এ দেশের সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। স্বাস্থ্য খাতের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই। শুধু উন্নয়নের মহাসড়কের গল্প বলে জনগণের কান ঝালাপালা করার দরকার নেই। জনগণ বর্তমান সরকারের প্রতি আস্থাশীল। আমাদের মনে রাখা উচিত, দুর্নীতিবাজ যে-ই হোক তার শাস্তি হওয়া উচিত।

অনেক রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। অনেক মা-বোনের ইজ্জত জড়িয়ে আছে আমাদের লাল সবুজ পতাকার সঙ্গে। আমরা একটিবারও ভেবে দেখি না আমাদের জীবনটা কত ছোট। সামান্য একটি ছোট্ট জীবনের জন্য একজন মানুষের কত টাকার প্রয়োজন? ক্ষমতা সে তো ভিন্ন জিনিস। ক্ষমতা খুবই ক্ষণস্থায়ী। ক্ষমতাবানদের এ সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে।

পৃথিবীতে যেসব দেশ উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে এর পেছনে মূল পুঁজি রয়েছে তাদের দেশপ্রেম। এই তো সেদিনের কথা। মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরকে ছেড়ে দিয়েছিল। আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক লি কুয়ান ইউ দুঃখ করে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘সিঙ্গাপুরকে নিয়ে সিঙ্গাপুরবাসীদের নতুন করে ভাবতে হবে।’ একটি ছোট্ট দ্বীপ সিঙ্গাপুর। প্রাকৃতিক তেমন কোনো সম্পদ নেই তাদের। শুধু দেশপ্রেমকে পুঁজি করেই রূপকথার গল্পের মতো সিঙ্গাপুর আজ পৃথিবীর অন্যতম উন্নত রাষ্ট্র। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা সব কিছুতেই সিঙ্গাপুর বিশ্বের রোল মডেল। বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। এ দেশের মাটিতে রয়েছে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ। বৃক্ষ-তরুলতায় ঘেরা আমাদের এই সবুজ দেশটি আজও তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছে না কিছু ব্যক্তির অনৈতিক কার্যকলাপের দরুন।

বাংলাদেশ পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। এ দেশের শতকরা ৯০ জন লোক মুসলমান। ইসলাম হলো একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। কোনো অনৈতিক কাজই ইসলাম সমর্থন করে না। এই শান্তির ধর্মের অনুসারী হয়েও আমরা ইসলামের অনুশাসন-গুলো মেনে চলার চেষ্টা করি না। আমরা একবারও ভেবে দেখি না- এ দেশ আমার, আমাদের সবার। আমাদের জন্য না হোক, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দেওয়া আমাদেরই দায়িত্ব। মিথ্যা আলেয়ার পেছনে ক্ষণস্থায়ী জীবনের খুব বেশি চাওয়া-পাওয়ার দরকার নেই। মালাকুল মউত একদিন আসবেই। সবকিছু রেখে শূন্য হাতেই যেতে হবে। অতএব মানুষের মতো মানুষ হয়ে পরপারে যাওয়াটাই মহৎ কাজ।

                লেখক : কলামিস্ট


আপনার মন্তব্য