শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২২:৫৪

হামারা তাকিয়া কিধার

তুষার কণা খোন্দকার

হামারা তাকিয়া কিধার

আমার এক আত্মীয়ের মুখে ১৯৭১ সালের একটি ঘটনা শুনেছিলাম। ভদ্রলোক পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। ’৭১ সালে বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তানে কর্মরত সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের নিরস্ত্র করে বিভিন্ন বেসামরিক অবস্থানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমার চেনা সেনা কর্মকর্তা করাচি এয়ারপোর্টে দায়িত্ব পালন করতেন। মুক্তিযুদ্ধ বেগবান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধে আহত প্রচুর পাকিস্তানি সেনা করাচি বিমানবন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছিল। একদিন বাংলাদেশের যুদ্ধে আহত এক পাকিস্তানি সেনাকে যখন স্ট্রেচারে করে প্লেন থেকে নামিয়ে আনা হচ্ছিল তখন লোকটি বার বার বলছিল, ‘হামারা তাকিয়া কিধার’। আহত সেনার বালিশপ্রীতি দেখে এয়ারপোর্টে কর্তব্যরত বাঙালি সেনার মনে কৌতূহল জাগল। ভাবল, লোকটার তাকিয়ার মধ্যে কী আছে যার জন্য সে নিজের শরীরের দুর্দশার কথা ভুলে বালিশ বালিশ বলে বিলাপ করছে। কৌতূহলী বাঙালি আহত সেনার বালিশ সংগ্রহ করে তাতে চাপ দিয়ে দেখল বালিশের ভিতর সোনার গহনা গজগজ করছে। বাংলাদেশে লুটপাট চালিয়ে পাকিস্তানি সেনা যত গহনা জোগাড় করেছে সেগুলো সে তার বালিশে ভরে দেশে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশে বেশ কয়েক বছর ধরে মাঝে মাঝে বালিশ জিনিসটা গণমাধ্যমে ফোকাস পাচ্ছে। কয়েক বছর আগে বন বিভাগের রক্ষক লোকটি তার ঘুষের টাকা ক্যাশ করে চালের ড্রাম আর কোলবালিশে ঢুকিয়েছিল। দুর্নীতি দমন কমিশনের লোকজন বনরক্ষকের বাসায় হানা দিয়ে কোলবালিশ চিরে টাকা বের করার পরে ঘটনাটি দেশজুড়ে লোকজনের মুখে মুখে ফিরতে লাগল। সে সময় আমি যতবার বনরক্ষকের কোলবালিশ-কা- শুনছিলাম ততবার আমার পাকিস্তান-ফেরত বাঙালি আত্মীয়ের মুখে শোনা ‘হামারা তাকিয়া কিধার’ অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ছিল। অনেক বছর পরে ২০১৯ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বালিশকা- শুনে আমার আবার সেই তাকিয়া কিধার গল্প মনে পড়ে গেল। মনে হলো লুটের মাল ভরা বালিশ বুঝি বাঙালির পেছন ছাড়বে না। রূপপুরের বালিশকা- শেষ না হতেই ফরিদপুরে পর্দাকা- শুরু হয়েছে। বালিশকা--পর্দাকা-কে মাননীয় এক মন্ত্রী বলেছেন ছিঁচকে চুরি। কিন্তু লোকে ভাবছে দৃশ্যমান ছিঁচকে চুরি বুঝি দুর্নীতির ডুবো পাহাড়ের চূড়া। দৃশ্যমান চূড়ার নিচে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি হয়তো পানির তলে অদৃশ্য রয়ে গেছে। দেশের মানুষ সরকারের সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির ঘা নিয়ে চিন্তিত।

যে কোনো দেশে মানুষ যখন কোনো বিষয় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করে তখন সেটার সঙ্গে মিল রেখে হরেকরকম গল্প-গাথার জন্ম হতে থাকে। বাংলাদেশের দুর্নীতির চিত্র নিয়ে সেদিন একজনের মুখে একটা গল্প শুনলাম। গল্প বলিয়ে লোকটি যেভাবে গল্পটা বলেছে আমি সেটা হুবহু আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। এক আমেরিকান, এক বাংলাদেশি আর এক রাশিয়ান- তিন দেশের তিন বুড়ার মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিন বুড়ার ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার কিছু ছিল না। তারা ভাবতেন, আমরা আর বাঁচবই বা কদিন? দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে কপালগুণে যদি একজন সর্বজ্ঞ দেবতার দেখা পেতাম তাহলে নিজ নিজ দেশের  ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জেনে নিশ্চিন্ত মনে মরতে পারতাম। তিন বন্ধু নিজ নিজ দেশের ভবিষ্যৎ জানার আশায় দেবতার সন্ধানে বনে বনে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। তিন বুড়ার হাপিত্যেশ দেখে একদিন এক দেবতার মনে দয়া হলো। সেই দেবতা তিন বুড়াকে দেখা দিয়ে বললেন, ‘আমি তোমাদের মনের সাধ পড়তে পেরেছি। বল, আমার কাছে তোমরা কে কী জানতে চাও?’ দেবতার দেখা পেয়ে তিন বন্ধু আহ্লাদে আটখান। বিগলিত তিন বুড়ার মধ্য থেকে আমেরিকান বুড়া আগ বাড়িয়ে বললেন, ‘প্রভু! আমার এত আদরের মাতৃভূমি আমেরিকা আর্থিক মন্দার কারণে ফকির হয়ে চীনের পায়ের তলে বসে গেল। তুমি কি বলতে পারো আমার দেশে আর্থিক মন্দার কবে অবসান হবে? আর্থিক সচ্ছলতা ফিরে পেতে আমেরিকাকে আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে?’ আমেরিকানের প্রশ্ন শুনে দেবতা একঝলক হেসে মাথা দুলিয়ে বললেন, ‘শোনো হে আমেরিকান! আমেরিকার আর্থিক মন্দা কাটতে আরও পঞ্চাশ বছর লাগবে।’ দেবতার জবাব শুনে আমেরিকান বুড়া কেঁদে আকুল হয়ে বললেন, ‘হায়রে কপাল! আমার যা বয়স তাতে আমি আর বাঁচবই বা কদিন। আমেরিকার মন্দা কাটার আগে আমাকে দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে চলে যেতে হবে। মন্দামুক্ত আমেরিকা দেখার স্বপ্ন আমার অপূর্ণ রয়ে গেল।’ এবার রাশিয়ান বুড়ার প্রশ্ন করার পালা। রাশিয়ান বুড়া দেবতার দিকে চেয়ে বললেন, ‘কমরেড দেবতা! আমি কি রাশিয়ায় গণতন্ত্র দেখে মরতে পারব?’ দেবতা মাথা ঝাঁকিয়ে হেসে বললেন, ‘নাহে কমরেড রাশিয়ান! সেটি সম্ভব নয়। রাশিয়ায় গণতন্ত্র আসতে আরও এক শ বছর লাগবে। স্বৈরতন্ত্রের শনি তোমাদের জিনচক্রে ঢুকে গেছে। ওটি বের হতে আরও শ বছর পার হয়ে যাবে।’ দেবতার কথা শুনে রাশিয়ান বুড়া প্রবল হতাশায় হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগলেন। সবার শেষে এবার বাংলাদেশির প্রশ্ন করার পালা। বাংলাদেশি বুড়া সামনে দন্ডায়মান দেবতাকে আদাব-সালাম দিয়ে বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘জনাব দেবতা! আমি কি আমার জীবনে বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত দেখতে পাব?’ বাংলাদেশি বুড়ার অতি সামান্য একটি প্রশ্নে উপস্থিত সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কারণ প্রশ্নটা শোনামাত্র দেবতা ভ্যা করে কেঁদে ফেললেন। চোখের সামনে একজন দেবতাকে এমন অঝরে কাঁদতে দেখে উপস্থিত সবাই বিব্রতমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। বিনিয়ে বিনিয়ে অনেক কেঁদে অবশেষে দেবতা চোখ মুছে বললেন, ‘শোনো হে বাংলাদেশি! বাংলাদেশ কবে দুর্নীতিমুক্ত হবে সে কথা দেবতাকুলেও অজানা। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আমি দেখতে পেলাম, বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার আগে আমার জীবনাবসান হবে। বাংলাদেশে বহমান অবিনশ্বর দুর্নীতির পাশে দেবতাদের জীবনও নশ্বর বটে।’ দেবতা হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন।

বাংলাদেশে বালিশকা- শেষে এখন পর্দাকা- চলছে। মাননীয় মন্ত্রী বললেন, বালিশকা--পর্দাকা- হচ্ছে ছিঁচকে চুরি। হাওয়া ভবনের সঙ্গে বালিশকা--পর্দাকা- মেলালে অনেক বড় ভুল হবে। হাওয়া ভবনের কাজকারবার ছিল সূক্ষ্ম দুর্নীতি। দুর্নীতি আর ছিঁচকে চুরির ফারাক বুঝতে না পারলে জনগণ দেশকে রসাতলে নিয়ে যাবে। এর জন্য রাজনীতিবিদরা দায়ী থাকবে না। মাননীয় ওই মন্ত্রী একজন পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তিনি সাহিত্যচর্চা করেন। আমি ধরে নিচ্ছি তিনি জর্জ অরওয়েলের লেখা অ্যানিমল ফার্ম বইটি পড়েছেন। রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র আসার আগে মুরগি দিনে একটা ডিম দিয়ে কক্ কক্ করে জানান দিত। সমাজতন্ত্র আসার পর মুরগি আগের মতো দিনে একটা ডিম দিতে লাগল ঠিকই কিন্তু ডিম দেওয়া শেষ করে সে কক্ কক্ শব্দ করা বন্ধ করে দিল। নতুন শাসনামলে সে বলতে লাগল, মহান নেতার নির্দেশে আজ আমি একটি ডিম দিয়েছি। আপনি দুর্নীতিকে ছিঁচকে চুরি বলে সাফাই গেয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে চাইলে সে দায় আপনার। জনগণ দুর্নীতিকে দুর্নীতি বলেই বোঝে। দেশের মানুষ দুর্নীতি সংঘটনের আমল ও স্থান বিবেচনা করে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ চয়ন করতে চায় না। দেশ রসাতলে যাওয়ার আগে জনগণ দুর্নীতির অবসান চায়। দুর্নীতির উৎস হাওয়া ভবন নাকি পানি ভবন তা নিয়ে জনগণ মাথা ঘামায় না। দেশে দুর্নীতির অবাধ চর্চা দেখে মনে হয়, আহারে! আমাদের সর্ব অঙ্গে ব্যথা। ব্যথার স্বীকৃতি দিতে মন্ত্রীরা দ্বিধান্বিত থাকলে আমরা ওষুধ পাব কোথায়। দুর্নীতিকে দুর্নীতি বলে না মেনে আপনারা আমাদের ভাবতে বলছেন, আমাদের দেশ দুর্নীতিমুক্ত, কারণ আওয়ামী লীগ এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। আওয়ামী নেতারা প্রতিদিন সরবে ঘোষণা দিয়ে বলছেন তারা দুর্নীতির প্রতি শূন্যসহনশীল অর্থাৎ জিরো টলারেন্ট! কিন্তু দেশের ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম ও পত্রপত্রিকায় প্রতিদিন হরেকরকম দুর্নীতির খবর প্রকাশ হচ্ছে। গত সপ্তাহে একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত খবরে পড়লাম, সরকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করে বড় কলেবরের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত ঠিকাদারের কাছ থেকে সংগৃহীত চাঁদার অর্থ ভাগাভাগি করতে গিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীদের মধ্যে গুরুতর গোলযোগ দেখা দিয়েছিল। এমন অশান্ত পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য তার নিজ বাসভবনে নিজের পরিবার-পরিজনের উপস্থিতিতে চাঁদার টাকা ভাগাভাগি করেছেন বলে খবরে বিস্তারিত লেখা হয়েছে। কোন নেতা কত টাকার ভাগ পেয়েছেন সে কথা পত্রিকায় বিশদে লেখা হলেও মধ্যস্থতাকারী উপাচার্য ও তার পরিবার-পরিজনের স্বার্থ কীভাবে রক্ষিত হয়েছে সে কথা রিপোর্টের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। দেশজুড়ে শিক্ষা খাতে যে ব্যাপক দুর্নীতি চলছে তা মাঝে মাঝে পত্রিকার পাতায় উঠে আসে। দেশের সব খাত যখন ভয়ানক দুর্নীতির করাল গ্রাসে ডুবতে বসেছে সেখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর দুর্নীতির সাগরে ডুবো পাহাড়ের চূড়া। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি নিয়ে লিখতে লিখতে সাংবাদিকরা ক্লান্ত হয়ে গেছে। স্বাস্থ্য খাতে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে সরকারের তেমন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। সরকারি হাসপাতালে মানুষ চিকিৎসা পায় নাকি ওখানে জনগণের অর্থের হরিলুট চলছে সে সম্পর্কে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকজনের তেমন ধারণা নেই। সরকারের মন্ত্রী-আমলারা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিয়মিত বিলেত আমেরিকা আসা-যাওয়ায় ব্যস্ত। দেশের ভিতর স্বাস্থ্যসেবার মান সম্পর্কে সম্ভবত তারা ওয়াকিবহাল হওয়ার সুযোগ পান না। মন্ত্রী-আমলারা পরিবহন খাতের দুর্দশা বুঝতে পারেন না, কারণ তারা কখনো গণপরিবহন ব্যবহার করেন না। দেশে মহামারী আকারে ডেঙ্গু এলো, এখন প্রাকৃতিক নিয়মে আপাতত ডেঙ্গুর অবসান হচ্ছে। ডেঙ্গু সমস্যাকে সরকার কখনো গুজব বলে উড়িয়ে দিল, কখনো ডেঙ্গু বিষয়ে নিশ্চুপ থেকে সমস্যাকে পাশ কাটাল। মশা মারার ওষুধ কেনা নিয়ে দেশে দুর্নীতি হয়েছে জনগণের এই অভিযোগ সরকারের কোনো কর্তৃপক্ষ আদৌ কখনো শুনতে পেয়েছে কিনা তা বোঝা গেল না। আরও মর্মন্তুদ বিষয়, দেশে এত মানুষ ডেঙ্গু রোগে ভুগল, এত মানুষ রোগে ভুগে মারা গেল কিন্তু সরকারের একজন মন্ত্রী কিংবা এমপি এক দিনের জন্য কোনো হাসপাতালের দরজায় উঁকি দিয়ে দেখলেন না। কে জানে তাদের মনে কী আছে। সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা হয়তো ভাবছেন, ডেঙ্গু আসবে ডেঙ্গু যাবে। দেশের সাধারণ মানুষ ডেঙ্গুতে ভুগে কিংবা গাড়িচাপা পড়ে মরতে থাকবে কিন্তু মন্ত্রী-এমপিরা সিংহাসনের ছায়াতলে বসে অনন্তকাল সুখ ভোগ করতে থাকবেন। প্রকৃতি কি ক্ষমতাধর মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে একমত? পদমর্যাদার সঙ্গে মিল রেখে প্রকৃতি মন্ত্রী-এমপিদের জন্য সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা কোনো বন্দোবস্ত রেখেছে বলে কি আমরা বিশ্বাস করব? আমরা বিশ্বাস করি প্রকৃতির বিধান আমাদের সবার জন্য সমান। তবু ক্ষমতাধরদের জন্য আমাদের দীর্ঘশ্বাস মেশানো শুভ কামনা রইল।

              লেখক : কথাসাহিত্যিক

 


আপনার মন্তব্য