শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:৪৮

বাকি চাহিয়া লজ্জা দিবেন না!

মাকিদ হায়দার

বাকি চাহিয়া লজ্জা দিবেন না!

অনেক কিছুই অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছে এবং অনেক কিছু যাওয়ার পথে। এমনকি পায়ে চলার গ্রাম্যপথ, বাঁশঝাড়ের নিচ দিয়ে এঁকেবেঁকে এ গ্রাম-সে গ্রাম হয়ে কোথায় যে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছে অথবা সেই পথের শেষ কোথায়, সে কথা আমি আপনি কেউই কোনো দিন জানতে পারিনি। পারব না। রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেলেই হয়তো বলেছিলেন, ‘পথের শেষ কোথায়’, পথের যে শেষ নেই, সেই বাঁশঝাড়ের শীতল ছায়ার নিচ দিয়ে হেঁটে যাবে না ভেবে/আরিফপুর বলরামপুরের ভিতর দিয়ে যে রাস্তা দিয়ে। একাধিকবার গিয়েছি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ফকরুল ইসলাম স্যারের বাড়ির ওপর দিয়ে কেন যেতাম সেটি বলা যেতে পারে। স্যারের বিশাল বাড়িতে ছিল হরেকরকমের ফলদ বৃক্ষ। আমার প্রিয় আতাফল এবং জাম্বুরা ও তেজপাতার গাছের পাতা চুরি করা ছিল আমাদের মতো কিশোরদের নিত্যনৈমিত্তিক কর্ম। বাড়ির সামনেই ইছামতি নদী। আরও কিছু দক্ষিণে সেকালের রাক্ষুসী পদ্মা। আরও দক্ষিণে কুমারখালী, কাঙ্গাল হরিনাথের বাড়ি। ছেফরিয়া, শিলাইদহ, তালবাড়িয়া এবং কুষ্টিয়া শহরের বিখ্যাত মোহিনী কটন মিল, যে মিলের ধোঁয়া উড়তে দেখতে পেতাম বলরামপুরের ফখরুল স্যারের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। আজ দীর্ঘ ৬০-৬২ বছর পরে কেন যেন হঠাৎ করেই মনে হলো, গ্রাম গ্রামান্তরে একা হেঁটে দেখব, সেই স্নিগ্ধ শীতল বাঁশঝাড়ের নিচ দিয়ে যে পায়ে হাঁটা পথ ছিল এখন আছে কিনা। আমাদের বাড়ি থেকে দক্ষিণের আধামাইল হেঁটে যাওয়ার পরে দেখি, সেই পথ নেই। ইতোমধ্যেই বিলীন হয়েছে বাঁশের বাগান। আম-কাঁঠালের গাছ। সেসব প্রকৃতি যেন নিঃস্ব হয়ে হারিয়ে গিয়েছে অতলের তলে। জায়গা পেয়েছে, দোতলা-তিন তলার বাড়ি, বৈদ্যুতিক তারেও বসে মনের সুখে লেজ নাড়িয়ে প্রেমিককে প্রেম নিবেদন করছে, ঘুঘু ডাকছে মহানন্দে তারই প্রেমিকাকে- কিন্তু ওই বলরামপুরের বিশারদ আলী প্রামাণিকের এক তলা বাড়িটি বিবর্ণ থেকে বিবর্ণতর হয়েছে, ফখরুল ইসলাম স্যারের বাড়ির দক্ষিণের ইছামতি নদীকে ভরাট করে বানিয়েছে বাড়িঘর, দখলের উৎসব চারদিকে।

আমার কিশোরকালের চোখ ইতোমধ্যেই কোথায় যে হারিয়ে গিয়েছেÑ যেমন হারিয়ে গিয়েছে মোহিনী কটন মিলের ধোঁয়া। বিশাল চোঙ্গা দিয়ে যে ধোঁয়া একদা উড়তে উড়তে চলে আসত পাবনা শহরে, উড়ে যেত ঝিনাইদহে। স্বাধীনতার পরে অনেক কলকারখানার মালিকানা বদল হয়েছে। কিন্তু তারা সেই আগের সাফল্য পাননি। এমনকি সেসব কলকারখানার সুনাম যে হারিয়েছে তাই নয়। পাবনা শহরের প্রাণকেন্দ্রের গোপালপুরের বিখ্যাত শিল্পা সজ্জীবনী নামের একটি বিশাল গেঞ্জি উৎপাদনের কারখানা। দোগাছির বিখ্যাত শাড়ি। তাঁতের গামছা, লুঙ্গি বেঁচে থাকলেও লুঙ্গি আর গামছার জায়গা করে নিয়েছে ঢাকার কেরানীগঞ্জের রুহিতপুর, শাড়ি নিয়েছে টাঙ্গাইল। গেঞ্জি নিয়েছে নারায়ণগঞ্জ।

হারানোর খেলায় হেরেছে চাটমোহরের বিখ্যাত জমিদার মৈত্র মহাশয়ের পাবনা শহরের পূর্বদিকের সুদৃশ্য বিশাল দৃষ্টিনন্দন একটি ভবন। জমিদার মৈত্র মহাশয় কলকাতার একজন ইংরেজ স্থপতিকে দিয়ে যে সুরম্য ভবনটি বানিয়েছিলেনÑ সেই ভবনটির নিচতলার দোতলায় এবং ওপরের চিলেকোঠাসহ দরজার মোট সংখ্যা নাকি ছিল ৩৬০টি। আর একটি দরজার পেট কেটে অর্ধেক করা হয়েছিল। কৈশোরে অগ্রজদের কাছ থেকে শুনেছিলাম ৩৬১টি দরজা নাকি আছে বা ছিল পাবনা জজ কোর্টে। জজ কোর্টকে সম্মান দেখানোর জন্য মৈত্র মহাশয় ৩৬১টি না করে ৩৬০টি দরজাই রেখেছিলেন। কবিগুরু ১৯১৩ সালে নোবেলপ্রাপ্তির পরে সেই সময়ের মধ্যে বারকয়েক রবীন্দ্রনাথ মৈত্র মহাশয়ের দৃষ্টিনন্দন ভবনটির অতিথি হয়েছিলেন। অতিথি হওয়ার হয়তো কারণ ছিল। মৈত্র মহাশয়ের সুবিশাল ভবনটির তিন তলা থেকে দক্ষিণের ইছামতি, পদ্মা নদীসহ কুষ্টিয়ার মোহিনী মিলের সেই দীর্ঘ চোঙ্গা দেখা যেত। উপরন্তু কবিগুরু বর্ষায় এসে উঠতেন ওই ভবনটিতে। যেটি আমাদের শৈশব-কৈশোরে নাম ছিল ‘শীতলাই জমিদার বাড়ি’। সেই বাড়িটি না-পাক, পাকিস্তানি সরকার পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রথমে বানিয়েছিল পাবনা মানসিক হাসপাতাল এবং পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকে ওই দৃষ্টিনন্দন ভবনটিকে দীর্ঘমেয়াদের লিজ দিয়েছিল একটি ওষুধ কোম্পানিকে।

ঐতিহ্য হারিয়ে গেল সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন জমিদার ভবনের উত্তরের বিশাল খেলার মাঠে মাঝামাঝি জায়গাটিতে সদ্য একটি ভবন নির্মাণের ফলে হারিয়ে গেছে সেই শীতলাই জমিদারের সুদৃশ্য ভবনটি। যেটি ছিল আমাদের দোহারপাড়ার বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়ার পথে হাতের বামদিকে। ভবনটির পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে মাত্র কয়েক শ গজ এগিয়ে যেতেই ছিল মেথরপাড়া। যাদের কাজ ছিল মানুষের বাড়ির শৌচাগারের নিচ থেকে চাড়িতে জমাকৃত মানুষের বর্জ্য সংগ্রহ শেষে মহিষের গাড়িতে সেসব বর্জ্য একত্রিত করে শহর থেকে তিন মাইল পূর্বের দিকে একটি খোলা মাঠে ফেলে দিয়ে মহিষের পিঠে চড়ে ফিরত তাদের সেই মেথরপাড়ার আস্তানায়। স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখতাম মেথরানীগুলো সুন্দর সাজে নিজেদের সাজিয়ে খোলা উঠোনে দলবেঁধে বানাত বাঁশের হস্ত ও কুটিরশিল্প এবং চালুনি, কুলোর গায়ে আলতা মাখিয়ে বিক্রি করে দিত অন্য লোকের সহায়তায় পাবনা বড় বাজারের উত্তর দিকে পানির ট্যাংকির নিচের এক মুসলিম দোকানির কাছে। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান সব সম্প্রদায়ের মানুষই কিনতেন নির্দ্বিধায়। কেউ জানতই না কুলো, চালুনির প্রস্তুতকারক কে বা কারা। জানলে হয়তো উচ্চ শ্রেণির অনেকেই কিনতেন কিনা সন্দেহ ছিল।

শীতকালে সন্ধ্যার বেশ কিছু পরে যেদিন তাদের পূজা অর্চনা থাকত সেদিন তারা বনখাসিকে [শুয়োর] সুন্দর করে স্নান করিয়ে মাথায় সিঁদুর দিয়ে নাচগান শেষে এবং বাংলা মদের উৎসবের ভিতরেই ওইসব অন্ত্যজ শ্রেণির দলনেতার নির্দেশে সেই বনখাসিকে একটি শক্ত দড়িতে বেঁধে পশুটির পেছন অঙ্গ দিয়ে লোহার গরম রড প্রবেশ করানোর সময় তার আর্তচিৎকারে পথচারীরা জেনে যেত আজ মেথরপাড়ায় পূজা অর্চনা হবে এবং সারারাত ধরে চলবে হৈ হুল্লোড়। কিছুদিন আগে গ্রামের বাড়ি থেকে পাবনা শহরে আসতে গিয়ে দেখি সেই মেথরপাড়াÑ এমনকি মেথরেরাও কেউ নেই, অথচ ব্রিটিশ শাসিত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ওইসব অন্ত্যজ শ্রেণিকে মাদ্রাজ থেকে ধরে এনে পাবনা মিউনিসিপ্যালটির অধীনে চাকরি দেওয়া হয়। তাদের জন্য ঘর এবং তরল পানীয় বিনামূল্যে বিতরণ করা হতো। সেই ব্রিটিশ একদিন ভারত ছাড়লে ওই সম্প্রদায়ের কিছু লোকের ভিতরে কেউ কেউ হলেন মর্গের ডোম, কেউ বা হলেন চাঁড়াল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ৮ এপ্রিল শুক্রবার শহরের হিন্দু-মুসলমানদের সঙ্গে পায়ে হেঁটে পাকশীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দিয়ে ভেড়ামারা হয়ে তারা দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়েছিল। ওইসব অন্ত্যজ যাদের ব্রিটিশ সরকার তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ইংরেজ শাসকসহ শহরবাসীর মলমূত্র নিষ্কাশনের জন্য এনেছিল মাদ্রাজ থেকে মেথরপাড়ার পরিত্যক্ত মেথরদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘরগুলো পেয়েছিল রাজাকাররা। স্মৃতির শহরের পুরাতন বাড়িঘর থাকলেও মাঝখানে খালি জায়গায় কেউ কেউ ইতোমধ্যে তুলেছেন হাইরাইজ। অথচ ২০০০ সাল বা পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এলেও শিল্প-সংস্কৃতিতে অবদান নিম্নমুখী। কেননা এ শহরের একাধিক কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও ছাত্র-ছাত্রীদের ভিতরে শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে বলে অন্তত আমার মনে হয়নি। যদিও বিষয়টি একান্ত নিজস্ব ক্ষোভের।

শহরের বড় বাজারের অধিকাংশ হিন্দুর দোকানগুলোর মালিকানা বদল হয়েছে। বড় বাজারের সবচেয়ে বড় শাড়ি-লুঙ্গির দোকান ছিল ললিত মোহন বসাকের। ওই দোকানে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়ত ‘বাকি চাহিয়া লজ্জা দিবেন না।’ আমাদের পিতা শেখ মোহাম্মদ হাকিমউদ্দিনের বোধহয় বন্ধুজন ছিলেন ওই বসাক ব্রাদার্সের মালিক ললিত মোহন বসাক। সে বছর রোজার ঈদ উপলক্ষে পিতা আমাকে সঙ্গে নিয়ে বড় বাজারের বসাক ব্রাদার্সে গিয়ে ললিত বাবুকে বললেন, পাঁচ-সাতটি দামি শাড়ি এবং তিন-চারটি ভালো ধুতি দাও। ধুতিগুলো যেন মোহিনী মিলের মিহিন সুতোয় হয়, আর শাড়িগুলো যেন শাহজাদপুর দোগাছির হয়। ধুতিগুলো চাচি-খালার জন্য আর শাড়িগুলো আমার বড় দুই মেয়ে এবং তোমার বউদিদের জন্য। এ ছাড়া আছেন আমার শাশুড়িমাতা তাকেও দিতে হবে দামি ধুতি। ললিত কাকার ছোট ভাইকে কাকা বললেন, ওই সিঁদুর মাখানো আলমারির ভিতর থেকে দামি শাড়িগুলো বের কর- শাড়ি বের করার পর বাবা জানতে চাইলেন, কোনটির কত দাম। ললিত কাকা বললেন, বউদিদের জন্য ১৭ টাকা দামের তিনটি এবং তোমার মেয়েদের জন্য ১৮ টাকা দামের দুটি, অন্য দুটি ১৪ থেকে ১৫ টাকার মধ্যে। ইতোমধ্যে আমাদের জন্য বিস্কুট, মিষ্টি এলো, চা এলো না, পিতা চা খেতে পছন্দ করতেন না, সেটি ললিত কাকা জানতেন।

বিস্কুট মিষ্টি পানি খেয়ে ললিত কাকাকে পিতা বললেন, তোমার সবগুলো শাড়ি এবং ধুতির দাম কত হলো, হিসাব শেষে কাকার ছেলে জানাল, সবগুলো মিলিয়ে সাতটির দাম হলো শাড়ি বাবদ ৯৪ টাকা আর ধুতির দাম হলো তিনটি ২৫ টাকা, বাবা বললেন, ললিত তোমাকে এখন কত টাকা দিতে হবে, কাকা বললেন যা পারো তাই দাও। তিনি ৫০টি টাকা ললিত কাকার হাতে দিয়ে বললেন, ঈদের পরে তোমার বাকি টাকা আমার ছেলে রোকন এসে দিয়ে যাবে। [রোকন আমার ডাকনাম]। খাতায় ৬৯ টাকা লিখে রাখ। বাজার থেকে ফেরার পথে পিতাকে বললাম, দোকানের ভিতরে লেখা দেখলাম, বাকি চাহিয়া লজ্জা দিবেন নাÑ আপনাকে এত টাকা বাকি দিলেন কেন? আমার প্রশ্নে বাবা জানালেন, ‘সত্য শাসনের অনুগত নয়। তাকে পাওয়ার হলে পাওয়া যায়। নইলে যায়ই না।’ কথাটি রবীন্দ্রনাথের। বাকি দেওয়া নেওয়া উভয়ের মধ্যে সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল।

                লেখক : কবি।


আপনার মন্তব্য