শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩১ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:৪৮

মেটাতে হবে সময়ের দাবি

আমিনুল ইসলাম মিলন

মেটাতে হবে সময়ের দাবি

বুভুক্ষু হৃদয়ের দাবি, একটু সান্ত্বনা-সহানুভূতি। ক্ষুধার্ত উদরের দাবি-সামান্য খাদ্য, পিপাসার্ত পথিকের দাবি-পানীয়। রোগাক্রান্ত মানুষের দাবি-চিকিৎসা, আর্তের দাবি-সেবা-শুশ্রƒষা, ভগ্নগৃহের দাবি-গৃহসংস্কার, দুর্বল প্রতিষ্ঠানের দাবি-মানোন্নয়ন ও শক্তিশালীকরণ। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বিরাজমান আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ দাবি প্রবল হয়ে ওঠে। সময়ের এ দাবিকে আত্মস্থ করা একটি সংগঠনের এগিয়ে চলার পথকে মসৃণ করে তোলে। সময়ের দাবিকে ধারণ করতে না পারলে ব্যর্থতা অনিবার্য। সদ্যসমাপ্ত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের পরিপ্রেক্ষিতে এ সমীকরণ খুবই প্রযোজ্য। গত ১১ বছরের সার্বিক উন্নয়নের মাপকাঠিতে এ মুহূর্তের জনদাবি ও সময়ের দাবি হচ্ছে-আওয়ামী লীগই দেশ পরিচালনা করুক। তবে সে আওয়ামী লীগকে হতে হবে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি মুক্ত পরিচ্ছন্ন-পরিশীলিত এক আওয়ামী লীগ। এক কথায় উন্নত আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের পরম শত্রুও স্বীকার করবেন যে, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠানটি যতবার ক্ষমতায় এসেছে ততবারই দেশ উন্নয়নের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে যুদ্ধবিপর্যস্ত একটি জাতি যেভাবে স্বল্প সময়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল তা ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা। বিধ্বস্ত সড়ক-জনপথ, পুল-ব্রিজ-কালভার্ট- নয় মাসের যুদ্ধের কারণে বিস্তীর্ণ অনাবাদি জমি-এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার পুনর্নির্মাণ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চোরাচালান দমন করে মাত্র সাড়ে তিন বছরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান সাফল্য। যদিও এ সময়ে তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে মুসলিম বাংলার নামে কথিত সন্ত্রাস, চরমপন্থি বামদলগুলোসহ গণবাহিনীর চরম নৃশংসতা এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কুটিল ষড়যন্ত্র। ১৯৯৬-২০০১ ছিল বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল শাসনামল। কিছু কিছু ঘটনা ও কতিপয় নেতার বাড়াবাড়িতে মাঝে মাঝে সরকারের সুনাম ক্ষুণœ হলেও সার্বিক জনজীবন ছিল স্বাভাবিক ও কর্মমুখর। বাজার দর ছিল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। সংকট দেখা দিলেও ত্বরিত সমাধান হয়েছে। ১৯৯৮ সালের দীর্ঘস্থায়ী ও দীর্ঘ-বিস্তৃত বন্যা সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিপুল প্রশংসিত হয়। এর পর ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় থেকে সরকার উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে। সর্বার্থে বাংলাদেশ এখন একটি ডিজিটালাইজড দেশ। উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশ এখন আর বিশ্বে কোনো অপরিচিত দেশ নয়। বিশ্ব ফোরামে বাংলাদেশ উচ্চারিত হয় সাফল্যের প্রতীক হিসেবে-শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের সঙ্গে। কিন্তু তারপরও  অতৃপ্তি কিছু থেকে যায়। দুর্নীতি-চাঁদাবাজি-ধর্ষণ-নারী নির্যাতন-সরকারি অর্থের বিপুল অপচয়-লুটপাট-বিদেশে টাকা পাচার, ব্যাংকিং সেক্টরের দুর্দশা, পুঁজিবাজারের নৈরাজ্য প্রভৃতি জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার কমিয়ে দিয়ে সরকার মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিকে মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করেছে। অবসরভোগী চাকরিজীবীদের, যারা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিয়ে সংসার চালান তাদের সংসার চালানো এখন সত্যিকার অর্থে কঠিন হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিককালে পিয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বাজার অর্থনীতির কোনো চিত্র নয়। এটি স্রেফ মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের কারসাজি। সরকার এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু লবণের মূল্য বৃদ্ধির চক্রান্তকে সরকার কঠোরভাবে মোকাবিলা করায় লবণের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়নি। এ ক্ষেত্রে সরকার শতভাগ সফল। চাঁদাবাজি রাজধানী থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে যাওয়া এক মহা-কালব্যাধি। জমি বেচাকেনা, নতুন বাড়িঘর তোলা, বিয়ে-শাদী সব ক্ষেত্রে চাঁদা দিতে হয়। এমন কি মাঝে মাঝে অপহরণের ঘটনাও ঘটে থাকে। তবে সবচেয়ে আতঙ্কে থাকেন প্রবাসীরা। প্রবাসী চাঁদা একটি নিত্য ঘটনা। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে এটিকে দমন করতে পারেনি। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি উদঘাটনের আগে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি দুর্নীতি ও লুটপাটের চিত্র এতটা গভীর ও ভয়াবহ। ধন্যবাদ জানাতে হয় সরকার প্রধানকে। তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে এ ভয়াবহ নৈরাজ্য থেকে জাতিকে উদ্ধার করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের ফলে ইদানীং এসব উৎপাত অনেকটাই বন্ধ হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়েও দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠিন বার্তা পৌঁছেছে। জনগণের কাছে যেটি আশা ও সান্ত্বনার বিষয়, সেটি হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কঠোর হয়েছেন। বিশেষ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান জাতিকে আশান্বিত করে তুলেছে। আওয়ামী লীগের জন্মের আগে যে ছাত্র সংগঠনের জন্ম, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে যে সংগঠনের রয়েছে গৌরবদীপ্ত ভূমিকা, তার প্রধান দুজন কর্ণধারকে পদচ্যুত করার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের জনগণকে জানান দিলেন-তিনি শুধু উন্নয়নেরই কান্ডারি নন-তিনি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের এক নব-আলোকবর্তিকা। যুবলীগের ক্ষেত্রেও তাঁর অবস্থান আরও কঠোর।

ইতিমধ্যে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়েছে। মাঝে মাঝে নতুন নেতৃত্ব দেখা যাচ্ছে। তবে সমালোচনা পিছু ছাড়ছে না। কদিন আগের পত্রিকায় দেখলাম ছাত্রলীগের ১১১টি ইউনিটের মধ্যে ১০৮টি কমিটির মেয়াদ নেই। সব জায়গায় অন্তর্দ¦ন্দ্ব-কোন্দল। বিগত ইউনিয়ন পরিষদ-উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এ কোন্দলের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিরপেক্ষতাও মাঝে মাঝে প্রশ্নবিদ্ধ। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘হাইব্রিড’ ও ‘কাউয়া’ শব্দের জনক। কিন্তু গত তিন বছরে তিনি না পারলেন একটি কাউয়া নিধন করতে, না পারলেন একজন হাইব্রিডকে বহিষ্কার করতে। আওয়ামী পরিবার এখন এদের হাতে বন্দী। এরাই সব অপকর্মের মূলহোতা। আওয়ামী লীগে পরিবারতন্ত্রের জন্ম হচ্ছে। এটি একটি অশুভ লক্ষণ। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে পরিবার বলতে একটিই থাকবে-সেটা বঙ্গবন্ধুর পরিবার। সারা দেশে গত ১১ বছরে কোনো ত্যাগী, পরীক্ষিত, পরিশ্রমী নেতা-কর্মীর সঠিক মূল্যায়ন হয়নি বলে সমালোচনা আছে। আওয়ামী লীগ এখন রাজ-রাজড়ার সংগঠন। নেতারা হেলিকপ্টারে যান, সম্মেলন শেষ করে অপরাহ্ণে ফিরে আসেন। কাউন্সিলরদের ভোটে কয়টি জেলা-উপজেলা কমিটি হয়েছে তার হিসাব নেওয়া প্রয়োজন। কোথাও কোথাও প্রতিদ্বন্দ¦ী প্রার্থীরা দাঁড়াতেই পারেননি। সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালী। যদি বলা হয় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিল না, তাহলে তো আরও ভয়ঙ্কর অবস্থা। এতে বুঝে নিতে হয়, বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয় ক্ষমতাসীনরা কতটা একনায়ক ও ক্ষমতাবান। হয়তো তাদের অর্থবিত্তের কাছে সব কিছুই ম্যানেজড। এ অবস্থা থেকে আওয়ামী লীগকে বেরিয়ে আসতে হবে। আওয়ামী লীগ কর্মীর দল। এসব লাখো-কোটি কর্মীই ছিল বঙ্গবন্ধুর হাতিয়ার। এসব লাখো-কোটি কর্মীই হচ্ছে শেখ হাসিনার অস্ত্র। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ১৯৭৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত একনাগাড়ে ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল। বেশি দিন ক্ষমতায় থাকলে যা হয়-এক সময়ে সব নেতা-কর্মীর রোশনাই বেড়ে যায়। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে, কিন্তু নেতা-কর্মীর মুখের বুলিতে ধরাধাম ধরাশায়ী। এমনি সময়ে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কঠিন বাস্তবতা উপলব্ধি করলেন। ডাক দিলেন ‘উন্নত বাম’-এর। কিন্তু ততক্ষণে গঙ্গা-ভাগীরথীতে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। ২০১১ ভোটযুদ্ধে আর শেষ রক্ষা হয়নি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট পশ্চিমবঙ্গের মতো নয়। এখানে আওয়ামী লীগ তৃতীয় মেয়াদে ১১ বছর পার করছে। ২০২৪ সাল নাগাদ ১৫ বছর পার করবে। তাই আওয়ামী লীগকে এখনই সতর্ক হতে হবে। আওয়ামী পরিবারকে সব অর্থে জঞ্জালমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, দখলবাজমুক্ত, তোষামোদমুক্ত একটি সংগঠনে পরিণত করতে হবে। দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা জোরদার করতে হবে। আওয়ামী লীগ নেতাদের লার্ডশিপ কালচার ত্যাগ করতে হবে। তোষামোদের রাজনীতি পরিহার করে মেধাভিত্তিক রাজনীতিকে লালন-পালন করতে হবে। রাজনৈতিক কর্মী নামে এক শ্রেণির বখাটে তরুণ-যুবক বিপুল সংখ্যায় আওয়ামী পরিবারে প্রবেশ করেছে। বখাটেপনাকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। এসব বখাটে জনগণের শত্রু। জনগণ তাদের ভয়ে চুপ থাকে বটে, কিন্তু সময় পেলে জনগণ এসব বখাটেপনার উপযুক্ত জবাব দেবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জনগণের কোনো বিরোধ নেই। বিরোধ এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসী নেতৃত্বের সঙ্গে। জনগণ সবসময় বিশ্বাস করে আওয়ামী লীগের আমলে দেশের উন্নয়ন হয়। অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। কর্মসংস্থান হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে। পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, পাতাল রেল এখন আর বাঙালির কাছে স্বপ্ন নয়। প্রক্রিয়া চলছে এখন কেবল ছোঁয়ার অপেক্ষা। তাই সময়ের দাবি হচ্ছে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকুক, দেশ উন্নত হোক। তবে এ জন্য আওয়ামী লীগকেও উন্নত হতে হবে। হতে হবে পরিশীলিত, মার্জিত, বিনয়ী, শিক্ষিত ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে। যেখানে গডফাদারদের স্থান হবে না। স্থান হবে পিতৃসুলভ নেতৃত্বের। সে লক্ষ্যে আওয়ামী নেতৃত্বের উন্নয়ন ঘটাতে হবে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত। তাই এখন সময়ের দাবি, উন্নত আওয়ামী লীগ। আশা করি আওয়ামী নেতৃত্ব এ বিষয়টিকে আমলে নেবেন। 

লেখক : সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা।

 


আপনার মন্তব্য