শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩১ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:৫১

বায়তুল মোকাররমের খুতবা

রাষ্ট্রের উন্নয়নে জাকাত ও আয়করের ভূমিকা

মুফতি মিজানুর রহমান সিনিয়র পেশ ইমাম

রাষ্ট্রের উন্নয়নে জাকাত ও আয়করের ভূমিকা

ইসলামী শরিয়তের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হলো জাকাত। জাকাত ব্যবস্থা আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জনের এক ঐকান্তিক আকুতি। এর মূল উদ্দেশ্য লোভ-লালসা, সম্পদলিপ্সা, কৃপণতা থেকে মুক্তি ও দুস্থ-এতিমদের থেকে দোয়া-ভালোবাসা অর্জনের মাধ্যমে মালের মধ্যে বরকত পয়দা করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আপনি তাদের মাল থেকে সাদাকা গ্রহণ করুন, যা দ্বারা আপনি তাদের সংশোধন করবেন। আর আপনি তাদের জন্য দোয়া করুন নিঃসন্দেহে আপনার দোয়া তাদের জন্য শান্তির কারণ। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।’ সূরা তওবা, আয়াত ১০৩। হজরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহতায়ালা জাকাত ফরজ করেছেন শুধু এজন্য যে, তোমাদের মাল যেন উত্তম ও পবিত্র হয়ে যায়।’ আবু দাউদ।

জাকাতের মাধ্যমে যেমন গরিব ও দুস্থ মানুষের অর্থনৈতিক চাকা সচল হয়, তেমনিভাবে ধনীর সম্পদের মধ্যে বরকত লাভ হয়। এতে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা থাকাকালে জাকাত আদায় করলেই হয়ে যেত। রাষ্ট্রীয় আয়করের প্রয়োজন হতো না। আধুনিক রাষ্ট্রে জনগণ কর্তৃক সরকারকে আয়কর দিতে হয়। এর মধ্যে কেউ কেউ আবার আয়করকে জাকাতের বিকল্প হিসেবে ভাবতে শুরু করেছেন। কারও কারও ধারণা, বর্তমানে যেহেতু আয়কর দিতে হচ্ছে, তাই জাকাত দেওয়া ততটা বাধ্যতামূলক নয়। অথচ প্রকৃতপক্ষে জাকাত ও আয়কর একই বিষয়বস্তু নয়। দুটির মধ্যে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য।

জাকাত শব্দটি আরবি। আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে শব্দটির কয়েকটি অর্থ দেখা যায়। যেমন পূত-পবিত্রতা, পরিশুদ্ধি-পরিচ্ছন্নতা, সুচিন্তা এবং প্রবৃদ্ধি ও ক্রমবৃদ্ধি। পরিভাষায়, ‘ধনসম্পদে আল্লাহ কর্তৃক সুনির্দিষ্ট ও ফরজকৃত অংশই হলো জাকাত।’

ইসলামের দৃষ্টিতে সাহেবে নিসাব বা সম্পদশালী হলেন যার কাছে ঋণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও প্রয়োজনীয় খাদ্য-বস্ত্রের অতিরিক্ত সোনা, রূপা, নগদ টাকা ও ব্যবসায়িক সম্পত্তির কোনো একটি বা সব কটি রয়েছে, যার সমষ্টির মূল্য সাড়ে ৭ তোলা (৮৭.৪৮ গ্রাম) সোনা বা সাড়ে ৫২ তোলা (৬১২.৩৬ গ্রাম) রুপার সমান হয়- তিনিই সম্পদশালী। তাকে বছরান্তে উদ্বৃত্ত সম্পদের শতকরা আড়াই শতাংশ হারে জাকাত দিতে হয়।

জাকাত প্রত্যেক স্বাধীন, সুস্থমস্তিষ্ক, প্রাপ্তবয়স্ক ও নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী মুসলিম নর-নারীর জন্য আল্লাহর নির্দেশিত অন্যতম ফরজ ইবাদত। জাকাত মানুষকে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্তিদানের লক্ষ্যে প্রবর্তিত হয়েছে। কোনো স্থানে বা কোনো সময়ে জাকাত গ্রহণকারী লোকের সন্ধান পাওয়া না গেলেও ধনীদের ওপর জাকাতদানের আদেশ সমভাবে বহাল থাকে।

জাকাত দেওয়ার মাধ্যমে জাকাত প্রদানকারীদের ধনসম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থাও সুদৃঢ় হয়। ফলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের আর্থিক উন্নতি ঘটে। যারা অভাবী হিসেবে জাকাত গ্রহণ করে তারাও একসময় জাকাত -দাতারূপে পরিবর্তিত হয়।

আয়কর মানে হচ্ছে আয় থেকে কর। কোনো ব্যক্তি বা সত্তার ওপর সরকার কর্তৃক আরোপিত কর, যা আয় বা লভ্যাংশের পরিমাণভেদে পরিবর্তিত হয়। এটি রাষ্ট্রের সব জনসাধারণের স্বার্থে রাষ্ট্রের ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারকে প্রদত্ত বাধ্যতামূলক অর্থ।

‘রাষ্ট্রকে যে পরিমাণ ট্যাক্সই দেওয়া হোক না কেন, তাতে জাকাত আদায় হবে না। বরং ট্যাক্স পরিশোধের পর সম্পদ নিসাব পরিমাণ থাকলে এবং তা এক বছর অতিবাহিত হলে তাতে জাকাত দিতে হবে’।

জাকাতের অর্থ শুধু আল কোরআনে নির্দেশিত খাতেই ব্যয় করতে হবে। এটি প্রত্যেক মুমিনের জন্য আর্থিক ফরজ ইবাদত। জাকাতের সম্পর্ক আল্লাহ ও বান্দার সঙ্গে। ট্যাক্স হলো সরকারি কর। সরকার এ কর যে কোনো কাজেই ব্যয় করতে পারে। ট্যাক্সের সঙ্গে সম্পর্ক হচ্ছে সরকার ও জনগণের। এর সঙ্গে জাকাতের কোনো সম্পর্ক নেই।


আপনার মন্তব্য