শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ এপ্রিল, ২০২০ ২৩:১৭

মৃত্যুর সওদাগরকে তিনি লালগোলাপ পাঠিয়েছিলেন

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

মৃত্যুর সওদাগরকে তিনি লালগোলাপ পাঠিয়েছিলেন

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বঙ্গেশ্বরী সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন তিনি বাংলার গর্ব। তার নির্দেশনা ২৫০ দিন ধরে সারা রাজ্যে প্রচার চালানো হবে- দিদি বাংলার গর্ব। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেছেন তার এই নির্দেশ পাগলের প্রলাপ। সম্প্রতি সরকারি প্রচার চকরা থেকে যেসব বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে তার নিচে লেখা হচ্ছে- ‘জয় বাংলা’। রাজনীতিবিদরা এই বিজ্ঞাপন দেখে বলছেন, বঙ্গবন্ধুর স্লোগান চুরি করেছে মমতা। ঘটনার কোনো বিরাম নেই। সব কিছুর নেপথ্যে ভোটব্যাংক।

মওত কা সওদাগরকে লাল গোলাপ ফুল পাঠিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। আবার তিনিই এখন বলছেন গণহত্যা। কদিন আগে ভুবনেশ্বরে খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার আগে-পরে তার মুখ থেকে দিল্লির দাঙ্গার নিন্দায় একটিও কড়া মন্তব্য শোনা যায়নি। অথচ কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফিরে যেতেই দিল্লি নিয়ে রণংদেহী মূর্তি মমতা ব্যানার্জির। ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে জ্বলছে দিল্লি। সশস্ত্র দাঙ্গাবাজদের তা-বের নিন্দা করতে মুখ্যমন্ত্রী পাক্কা আট দিন সময় নিলেন। এর মধ্যেই নিজেকে বাংলার গর্ব সাজিয়েছেন। কারণ সামনে পুরভোট। ‘বাংলার গর্ব’ হয়ে তাকে ভোটপ্রচারে নামতে বলেছে তার পরামর্শদাতা সংস্থা। তাদের তৈরি ইভেন্টের সূচনায় সোমবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে মমতা বলেছেন, আমার মন কাঁদছে। গতকাল মমতা ব্যানার্জির কড়া সমালোচনা করে সিপিআই(এম) পলিটব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিম বলেছেন, উনি কী মনে করেন? মানুষ সব ভুলে গেছে? ২০০২ সালে মোদি-শাহ গুজরাটে গণহত্যা সংঘটিত করার পর উনি দ্বিতীয়বারের জন্য বিজেপি পরিচালিত এনডিএ সরকারে যোগ দিয়েছিলেন। গণহত্যার নায়ক নরেন্দ্র মোদি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর পুষ্পস্তবক পাঠিয়ে তিনিই অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।

সেলিম বলেন, উনি বলছেন, ঘোলা জলে মাছ ধরার কথা। আমরা বলছি জলটা ঘোলা করল কে? বাংলার জল ঘোলা হলো কেন? বামফ্রন্টের সময়, কংগ্রেসের আমলে, স্বাধীনতার আগে-পরে এ রাজ্যে বিজেপি-আরএসএস কখনো দাঁত বসাতে পারেনি। এখন খাল কেটে কুমির এনে জল ঘোলা করে অন্যকে দোষ দিচ্ছেন মমতা ব্যানার্জি। এ রাজ্যের মাটিতে গেরুয়া বাহিনীর উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রতিটি পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানিয়ে চলেছেন বামপন্থিরা। রাস্তায় নেমে প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতেও জড়াচ্ছেন তারা। মোদি গো ব্যাক... অমিত শাহ গো ব্যাক স্লোগান দেওয়ার জন্য বামপন্থিদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে মমতা প্রশাসন।

সেলিম বলেন, মমতা ব্যানার্জি এখন পরিকল্পিত গণহত্যা বলছেন। যখন ভুবনেশ্বরে অমিত শাহের সঙ্গে সভা করতে গেলেন, সেখানে কেন সরাসরি বললেন না দিল্লিতে যা হয়েছে তা পরিকল্পিত গণহত্যা।

মমতা ব্যানার্জি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের তিনজন সাংসদ ও এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সারদা-নারদা সংক্রান্ত দুর্নীতির তদন্ত আটকে রেখেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমতি চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে আর্জি জানায় সিবিআই। কিন্তু সেই ফাইল দিনের পর দিন আটকে রয়েছে। কারোর ব্যাপারেই সম্মতি দেননি নরেন্দ্র মোদি। সম্প্রতি এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় বোঝা গেছে, মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে সমঝোতা চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন বিরোধী ঐক্যকে চূরমার করার। বিশেষ করে অন্যান্য বিরোধী দল যাতে বাম-কংগ্রেসের সঙ্গে শামিল না হয় সেই ব্যবস্থা করার দায়িত্ব চাপানো হয়েছে তৃণমূল নেত্রীর ওপর। বিনিময়ে মামলার ফাইল জাতীয় মহাফেজখানায় চিরতরে গুম করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

সারদা কর্তা সুদীপ্ত সেন কোটি কোটি টাকায় মমতার ছবি কিনেছিলেন। সেই টাকা সারদার গ্রাহকদের কাছ থেকে তোলা। অর্থাৎ চিটফান্ড কেলেঙ্কারির অংশ হয়েছিল ছবি বিকিকিনির সেই ঘটনা। এ নিয়ে সিবিআই বেশ কিছু অকাট্য প্রমাণও জোগাড় করে। ছবিগুলোও বাজেয়াপ্ত করা হয়। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে চেয়ে সিবিআই বেশ কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের দ্বারস্থ হয়েছে। তারপর গঙ্গা-যমুনা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। কিন্তু সেই ফাইল দিনের আলো দেখেনি। উল্টো তদন্তকারী অফিসারকেই চার মাস আগে সরিয়ে দেওয়া হয়। সিবিআইয়ের বিষয়টি দেখভাল করে প্রধানমন্ত্রীর আওতাধীন কর্মীবর্গ ও জনঅভিযোগ মন্ত্রণালয়। সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংয়ের হাতে থাকলেও প্রধানমন্ত্রী নিজে যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। একা প্রধানমন্ত্রী নন, সিবিআইয়ের কাজে নানা সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও হস্তক্ষেপ করে থাকেন। তাদের জন্যই যে সিবিআই এগোতে পারছে না তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

শাসক বিজেপি আর তৃণমূল কংগ্রেসের ছদ্ম লড়াইয়ের ছবি প্রকট হয়েছে সেন্ট্রাল ভিজিল্যান্স কমিশন সিভিসির রিপোর্টে। সাম্প্রতিক ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ১১০ জন দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকের বিরুদ্ধে সিবিআইয়ের ব্যবস্থা গ্রহণের আর্জি প্রধানমন্ত্রীর দফতর আটকে রেখেছে। ১২ জন আইএএস আধিকারিক এবং ইউবিআই ও পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের কয়েকজন আধিকারিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের নিষ্পত্তি করার ব্যাপারেও সরকার গরজ দেখাচ্ছে না। তৃণমূল কংগ্রেসের তিন সাংসদ ও এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির তদন্ত একইভাবে আটকে রয়েছে।

ভুয়ো কোম্পানি দেখিয়ে টাকা নয়ছয় করা। অবিশ্বাস্য দামে ছবি বিক্রি করার মতো একাধিক বিচার্য বিষয়ে সিবিআই তদন্ত চালিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ পায়। তা সত্ত্বেও মামলা চলছে অত্যন্ত শ্লথগতিতে। জানা গেছে, ব্যবস্থা গ্রহণের আর্জি জানানোর আবেদন ২০১৯-এর এপ্রিল থেকেই বকেয়া রয়েছে। ওই তিন সাংসদ ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন লঙ্ঘন করে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। সিবিআইয়ের মামলা শুরুর আর্জি জানানোর আবেদন আপাতত কর্মীবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার বিভাগের টেবিলেই আটকে। সিভিসির গত ডিসেম্বরের রিপোর্টে জানা যায়, তৃণমূল কংগ্রেসের দমদমের সাংসদ সৌগত রায়, হাওড়ার সাংসদ প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, বারাসতের সাংসদ কাকলী ঘোষ দস্তিদারের বিরুদ্ধে সিবিআই মামলা করতে চেয়ে আবেদন জানায়। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় এজেন্সি পরিবহনমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধেও মামলা করতে চেয়েছে। তার বিরুদ্ধেও সারদা-নারদা কেলেঙ্কারিতে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল।

                লেখক : প্রবীণ ভারতীয় সাংবাদিক।


আপনার মন্তব্য