শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ নভেম্বর, ২০২০ ২৩:৪২

বিজয়ের মাস ও বেগম খালেদা জিয়া

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

বিজয়ের মাস ও বেগম খালেদা জিয়া

আজ ১ ডিসেম্বর, বিজয়ের মাস। এ মাসে হাজার বছরের লাঞ্ছনা-বঞ্চনা কাটিয়ে আমরা স্বাধীন হয়েছি, মুক্ত হয়েছি পাকিস্তানের জাঁতাকল থেকে। দেখতে দেখতে অর্ধশতাব্দী কেটে গেল। মুক্ত স্বাধীন দেশে এতটা সময় বেঁচে থাকব কখনো আশা করিনি। তাই একটু পিছু ফিরে দেখি। তত দিনে কাদেরিয়া বাহিনী একটি নিয়মিত বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে। যুদ্ধকৌশল, অস্ত্রশস্ত্র কোনো কিছুতেই আর পিছে পড়ে নেই কাদেরিয়া বাহিনী। ঈদুল ফিতরের পর প্রতিটি ঘাটে প্রতিটি যুদ্ধে হানাদার বাহিনী নিদারুণ নাস্তানাবুদ হয়েছে, পরাজিত হয়েছে। যুদ্ধের শুরুতেই বাসাইল-ভুয়াপুর-গোপালপুর-ঘাটাইল-কালিহাতী এসব থানা দখল করে নিয়েছিলাম। সখীপুর তখন থানা ছিল না। সখীপুর আমাদের দখলেই ছিল। আগস্টের শেষের দিকে আমাদের হাত থেকে হানাদাররা দুই দিনের জন্য সখীপুরকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। ওই পর্যন্তই। তারপর আর কখনো পা রাখতে পারেনি। দুর্ধর্ষ কমান্ডার লাবিবুর রহমান জুলাইয়ের শেষের দিকে নাগরপুর থানা দখল করে সব অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ এবং ওয়্যারলেস সেট নিয়ে এসেছিল। তারপর আবার হানাদাররা থানা দখল নেয়। তাই নভেম্বরে শেষ সপ্তাহে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম নাগরপুর থানা দখলে নেওয়ার। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বেশি যোদ্ধা ও সমরাস্ত্র নিয়ে নাগরপুর থানার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। ছয়-সাতটি কোম্পানিতে প্রায় দেড় হাজার যোদ্ধা নাগরপুর থানা আক্রমণ করেছিল। বলতে দ্বিধা নেই এত শক্তি প্রয়োগ করেও শেষ পর্যন্ত আমরা নাগরপুর থানা পুরোপুরি দখলে নিতে পারিনি। এমনভাবে থানার ভিতর মাটির নিচ দিয়ে হানাদাররা জাল বিছিয়েছিল যেখানে আমাদের গুলিগোলা প্রবেশ করতে পারেনি। নাগরপুরের সবকিছু আমাদের দখলে এলেও থানা দখল করতে পারিনি। বরং আমাদের বেশ কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়েছিল। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান চর পাকুল্যার শামসু, আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী, কোম্পানি কমান্ডার হুমায়ুন বাঙাল ও সুফী নুরুজ্জামান। আক্রমণের আগের দিন কাদেরিয়া বাহিনীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ডা. শাহজাদা চৌধুরী ভারত ভ্রমণ শেষে সংসদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকী ও আনোয়ারুল আলম শহীদের সঙ্গে কেদারপুর এসেছিল। তার কাছে বিপুল চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকায় যুদ্ধাহত বীর যোদ্ধারা বেঁচে যায়। হানাদাররা প্রথম ধাক্কা সামলে নিলে সারা দিন যুদ্ধ হয়। আমরা কোথাও অত গুলি খরচ করিনি যা নাগরপুর করেছিলাম। দুই দিন নিরন্তর চেষ্টার পর খবর পাই নাগরপুরে অবরুদ্ধ হানাদারদের মুক্ত করতে এক ব্যাটালিয়ন হানাদার টাঙ্গাইল থেকে আসছে। থানা ঘিরে না রেখে টাঙ্গাইলের দিক থেকে আসা হানাদারদের বাধা দেওয়া সমীচীন মনে করে দলবল নিয়ে উত্তরে এলাসিন ঘাটে যাই। তখনো পাকিস্তানিরা ধলেশ্বরী নদী পার হতে পারেনি। এখন তো মরা ধলেশ্বরী। তখন ধলেশ্বরী ছিল চিরযৌবনা প্রায় দেড়-দুই মাইল পাশ। কখনোসখনো মাঝি এপাড় থেকে ওপাড় যেতে ভয় পেত। এলাসিন ঘাটে এসে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এখন মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে দেখা হয়। সে বড় উৎসাহ নিয়ে জানায়, শত্রু সৈন্য নদী পার হতে পারেনি। আমরা আরও উত্তর দিকে এগিয়ে যাই। ডিসেম্বর, নদীতে তেমন পানি ছিল না। উত্তর পাড়ে কয়েক শ গজজুড়ে পানি, তারপর বালি আর বালি। আমরা একেবারে দক্ষিণ পাড় ঘেঁষে পশ্চিমে যাচ্ছিলাম। নদীর গভীরতা অনেক। নিচে তাকিয়ে দেখি কয়েক শ হানাদার নদীর তল দিয়ে পুব দিকে যাচ্ছে। আমরা পশ্চিমে, ওরা পুবে। দূরত্ব ৫০ গজের বেশি নয়। প্রশ্ন, আমরা শুধু ওপরে ওরা নিচে। তখন উত্তর পাড় থেকে প্রচ- গুলি আসতে থাকে। আড়াল নেওয়ার তেমন জায়গা ছিল না। হঠাৎই সামনে এক ছোট্ট খাল দেখতে পাই। সেখানে ১০-১২ জন ঝাঁপিয়ে পড়ি। অন্যরা হারিয়ে যায়। আবদুল্লাহ বীরপ্রতীক বাঁ পাশে, ডান পাশে ছানোয়ার। হঠাৎ ছানোয়ারের পিঠে গুলি লেগে মারাত্মক জখম হয়। গুলি লাগাতে ক্ষতস্থান দিয়ে ভিতরে দেখা যাচ্ছিল। ছানোয়ার বসে পড়ে বলল, স্যার, আমার গুলি লেগেছে। আমি দেখলাম কোনো পথ নেই। বললাম, কে বলেছে? আমি বলছি তোর গুলি লাগেনি। তুই এক দৌড়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে ভাররা বাজারে চলে যা। ছানোয়ার উঠে দৌড় দিল। কিছু দূর গিয়ে নিজেকে সামলাতে পারছিল না। ততক্ষণে সেখানে মাসুদ, আবদুল্লাহ বীরপ্রতীকসহ আরও কে কে যেন হাজির হয়েছিল। তারা তাকে ধরাধরি করে প্রথমে ভাররা বাজার, সেখান থেকে পাশের গ্রামে নিয়ে যায়। আমাদের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে।

নাগরপুর কেদারপুরে শহীদ বীর যোদ্ধার জানাজায় লেখক

সবুর নেই, খোকা নেই, ফজলু কেউ নেই। সব হারিয়ে গেছে। হানাদাররা নদীর পাড়ে উঠে বেকায়দায় পেয়ে দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে হত্যা করে। তারা ছিল রবিউলের কোম্পানির। রবিউল তার কোম্পানিকে কিছু না বলে পালিয়ে যায়। নাম ছিল রবিউল গেরিলা। গেরিলা নামে হয়তো শত্রু সৈন্যদের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছিল। আমাদের যোদ্ধাদের ওপরও শুভ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। কিন্তু রবিউল কখনো তেমন ভালো করতে পারেনি। এলাসিন ঘাট থেকে পালিয়ে সোজা চলে যায় কেদারপুরে। সেখানে গিয়ে এক অভাবনীয় কান্ড ঘটায়। বলে বসে, সর্বাধিনায়ক হানাদারদের হাতে ধরা পড়েছে। একটু পরে সেখানে যায় আমার দেহরক্ষী দলের প্রধান ফজলুল হক বীরপ্রতীক। সেও রবিউলের কথায় সায় দেয়। শুরু হয়ে যায় এক মারাত্মক কান্নাকাটি। মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে কখনো কোনো দিন অমন কান্নাকাটি হয়নি। লতিফ ভাই এক দিন আগে কেদারপুর এসেছেন। তার কান্না সব থেকে বেশি। আমি ওসবের কিছুই জানি না। আহত ছানোয়ারকে নিয়ে বড় পেরেশানিতে ছিলাম। মাঝরাতে সুটাইনের ইউনিয়ন কমান্ডার এলে প্রায় সব সমস্যার অবসান হয়। সবুরকে পাওয়া যায়, পাওয়া যায় অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের। আমরা দুপুরের দিকে এলাসিন ঘাট থেকে দুজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে কেদারপুরে পৌঁছি। কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ২ শতাংশ জমি কিনে দুই মুক্তিযোদ্ধাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। আজ এত বছর পর বারবার মনে পড়ে তাদের কথা। সেটাই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নামে মুক্তিযোদ্ধাদের করা বাংলাদেশ সরকারের আঁকা স্ট্যাম্পে দলিল করে কবরস্থ করা। আজ সে কবরের চিহ্ন থাকলেও মর্যাদা নেই। কেউ হয়তো খোঁজও নেয় না, কবর দুটি কার বা কাদের।

বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে কিছুদিন বেশ আলোচনা। করোনা দুর্যোগ-দুর্বিপাকের শুরুতে সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে ছয় মাসের জন্য জেল থেকে মুক্তি দিয়েছিল। তিনি তাঁর গুলশানের বাড়িতে করোনাকাল কাটাচ্ছেন। বেগম খালেদা জিয়া একজন জাতীয় নেতা। তাঁর নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব-আপসহীন ব্যক্তিত্ব দেশবাসী দেখেছেন। জিয়া ট্রাস্টের যে মামলায় খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত সে সাজা কেন জানি অনেকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। তা যাই হোক সেই দন্ড নিয়েই বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে ছিলেন। একসময় চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালেও ছিলেন। যদিও তাঁর সরকারি চিকিৎসকদের ওপর আস্থা ছিল না। তবু সরকারি নিয়মে জেলকোডের বাধ্যবাধকতা মেনে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের কেবিন ব্লকে প্রিজন সেলে ছিলেন। আমিও পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে অনেক দিন ছিলাম। কিছুদিন যাবৎ শুনছি, বিএনপির কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন বেগম খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। কেন তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখা হবে? তিনি তো সাজাপ্রাপ্ত বন্দী। সরকার উদারতা দেখিয়ে তাঁকে জেলের স্থলে বাড়িতে থাকার সুযোগ দিয়েছে। আমার ধারণা, অন্য কারও সরকার হলে সাজাপ্রাপ্ত বেগম খালেদা জিয়াকে কখনো নাজিমউদ্দিন রোডের জেলে নিতেন না। যে জেলে একসময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব থেকেছেন, সর্বজনাব শেখ ফজলুল হক মণি, আবদুর রাজ্জাক, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, কে এম ওবায়দুর রহমান, ফণীভূষণ মজুমদার, বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল কুদ্দুস মাখন, সিরাজুল আলম খান, শাজাহান সিরাজ, লতিফ সিদ্দিকী- এমনকি আমার মতো অপদার্থরা থেকেছেন। সেখানে বেগম খালেদা জিয়াকে নেওয়ার কোনো দরকার ছিল না। গুলশানের বাড়ি সাবজেল করে কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে সেখানেই তাঁকে রাখা যেত। যেটা ভালো মনে করেছে সরকার করেছে। কিন্তু যে সময় তাঁকে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো জেলখানায় রাখা হয়েছে সেটা খুব একটা জেল আইনে ঠিক হয়নি। নির্জন একাকী কোনো সাজাপ্রাপ্তকে রাখার জেলকোডে বিধান নেই। আরেকটি মারাত্মক ত্রুটি হয়েছে অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়াকে সাহায্য করার জন্য নিত্য সহযোগী তাঁর বাড়ির সেবিকা ফাতেমাকে থাকতে দেওয়া। এটা জেল আইনের পরিপন্থী। সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের জন্য জেল আইনে কতটা কী সুযোগ-সুবিধা থাকে ভালো করে পড়ে দেখতে হবে। কিন্তু নিরাপত্তা বন্দী হিসেবে জেলে যে কোনো প্রথম শ্রেণির বন্দীকে কাজ করার জন্য হাজতিদের দেওয়া হয়। সেই সাহায্যকারীদের ‘ফালতু’ বলে। আমি অনেক ফালতু দেখেছি যারা মা-বোন-স্ত্রীর চেয়েও বেশি যত্ন নেয় বা নিতে পারে। বেগম খালেদা জিয়ার জন্য একজন কেন পাঁচ-দশ জন সেবিকা দেওয়া যেতে পারত। কিন্তু তাদের অবশ্যই জেলের বাসিন্দা হতে হবে। এখানে স্পেশাল বা বিশেষ ব্যবস্থার কোনো সুযোগ নেই। খালেদা জিয়াকে দেখাশোনার জন্য জেলে ফাতেমাকে দেওয়া হয়েছে। কেন তাকে দেওয়া হয়েছে? কোনো অপরাধ না করেই তিনি কেন জেল খাটবেন? এতে কি তার নাগরিক অধিকার ক্ষুণœ হচ্ছে না? মানবাধিকার ক্ষুণœ হয়নি?

সাজাপ্রাপ্ত বা অভিযুক্ত সে অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা হোক কোনো অভিযোগে আদালতের নির্দেশ ছাড়া কাউকে জেলে রাখার বিধান নেই। আজ কেউ কিছু বলছে না, কারণ আজ ভাষা নীরব। কিন্তু ৫০ বা ১০০ বছর পরও এ নিয়ে কাউকে না কাউকে জবাব দিতে হবে। কোনো বিষয়ই চিরসত্য নয়। সকালবেলার আমির রে ভাই ফকির সন্ধ্যাবেলা- এ কথা যুগে যুগে সত্য বলে প্রমাণিত। তাই জেনেশুনে ভবিষ্যৎ অন্ধকার করা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সরকারের সঙ্গে কথা না হলে বেগম খালেদা জিয়া জেল থেকে বাইরে আসতে পারতেন না। কথা হয়েছে, বনিবনা হয়েছে তাই তিনি বাইরে। আগেই বলেছি, অন্য কেউ সরকার হলে হয়তো বেগম খালেদা জিয়াকে জেলখানায় নিতেন না। তাঁর বাড়ি সাবজেল করে সেখানে রাখতেন। মানুষের হায়াত-মউতের কথা বলা যায় না। বেগম খালেদা জিয়ার জেলখানায় স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও অনেকেই বিশ্বাস করতেন না, বিএনপির লোকেরা তো নয়ই। বলার চেষ্টা করা হতো, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। এমন যে অতীতে কখনো হয়নি তা নয়। তাই বলা হতো এবং অনেকে তা বিশ্বাস করত। শত চেষ্টা করেও সরকার তা চাপা দিতে পারত না। খালেদা জিয়া সাজা মাথায় নিয়েই তাঁর বাড়ি আছেন। এখন মারা গেলে সরকার মেরেছে, বিষ প্রয়োগ করেছে বা অন্যভাবে- এসব ধোপে টিকবে না। গোঁড়া বিএনপিরা বলতে পারেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাতে আমল দেবেন না। এদিক থেকে সরকার একটি মারাত্মক বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, খালেদা জিয়া গৃহবন্দী কিনা? তিনি গৃহবন্দী হবেন কেন, তিনি পুরোপুরি বন্দী। তাঁকে জামিন দেওয়া হলেও না হয় তাঁর চলাফেরা, দেখা-সাক্ষাৎ, রাজনীতির ওপর সরকারি বাধানিষেধের কথা বলা যেত। তাঁকে জামিনও দেওয়া হয়নি। সরকার ক্ষমতায় তাঁর দন্ড ছয় মাসের জন্য স্থগিত রেখেছে। আমারও প্রশ্ন- এ ছয় মাস বা তার পরে বৃদ্ধিকৃত ছয় মাস দন্ডের মধ্যে গোনা হবে নাকি দন্ডের বাইরে থাকবে। দন্ড মাথায় তিনি যেখানেই থাকুন তাঁর দন্ডের সময় গোনার কথা। সেদিন শুনে অবাক হলাম, খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে দুই মাস আগে আবেদন করেছেন। কিন্তু তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পৌঁছেনি। কি মারাত্মক কথা! দেশের একজন প্রধান নেত্রীর কোনো আবেদন দুই মাসেও যদি মন্ত্রীর হাতে না পৌঁছে বা মন্ত্রীর টেবিলে না যায় তাহলে সে তো এক ভয়াবহ ব্যাপার। বেগম খালেদা জিয়ার লোকজন কোথায় আবেদন করেছেন, জেল কর্তৃপক্ষের কাছে নাকি আইন মন্ত্রণালয়ে? আমার তো মনে হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে জেল কর্তৃপক্ষ এবং প্রধানমন্ত্রী বরাবর তার অনুলিপি দিয়েছেন।

আমাদের ছোট্ট দেশ, সবকিছু ঢাকায়। কচ্ছপ গতিতে ফাইল চললেও দুই মাস লাগার কথা নয়। দু-এক দিন বা দুই সপ্তাহ লাগতে পারে। বড় ধন্দে আছি। এভাবে চলে না। চললে দেশের কল্যাণ হয় না। একজন রাস্তার ফকিরও সরকারের কাছে কোনো আবেদন-নিবেদন করলে ‘হ্যাঁ, না’ সঙ্গে সঙ্গে বলা উচিত। বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ’৬৯-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকেও প্যারোলে মুক্তি দিয়ে আইয়ুব খানের সঙ্গে কথা বলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। নেতা তা গ্রহণ করেননি। দেশ ছিল উত্তাল। ’৬৯-এর গণআন্দোলনের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদের লৌহকঠিন দৃঢ়তা এবং বঙ্গবন্ধুর অনমনীয় মনোভাবে শেষ পর্যন্ত প্যারোলের বদলে মিথ্যা আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করতে আইয়ুব খান বাধ্য হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু মুক্ত মানুষ হিসেবে গোলটেবিলে গিয়েছিলেন। যেখানে তাঁর জন্য নানা কৌশলে ফাঁসির দড়ি প্রস্তুত করা হচ্ছিল। তাই মানুষ ভাবে এক, দয়ালু আল্লাহ করেন আরেক। কখন কী হয় কেউ বলতে পারে না। বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও এসবের ব্যতিক্রম হবে না। দুই মাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বিএনপির আবেদন যায়নি। এখন দুই ঘণ্টা অথবা দুই দিনে অবশ্যই যাবে এবং সিদ্ধান্তও হবে, একসময় মানবিক কারণে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেগম খালেদা জিয়া বিদেশ যাবেন। তার পরের ইতিহাস কী হবে সে জন্য আমাদের কিছুটা অপেক্ষা করতেই হবে। সে অপেক্ষাতেই থাকলাম।

লেখক : রাজনীতিক।

www.ksjleague.com

 


আপনার মন্তব্য