শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ মার্চ, ২০২১ ২৩:১১

স্মরণ

আবুল মনসুর আহমদ : একজন বিরলপ্রজ মানুষ

ইমরান মাহফুজ

আবুল মনসুর আহমদ : একজন বিরলপ্রজ মানুষ

‘আমাদের অঞ্চলে অনেক গণক-ঠাকুর আছেন তারা আমার হাত দেখিয়া বলিলেন, ছেলের কপালে রাজটিকা আছে। বাঁচিয়া থাকিলে ছেলে কোনো দিন দেশের রাজা হইবে। কিন্তু এর ভাগ্যে বড় বড় ফাঁড়া আছে। শান্তি স্বস্ত্যয়ন করিলেই সেসব ফাঁড়া কাটিয়া যাইবে।’ সত্যিকার অর্থে আবুল মনসুর আহমদ বাংলা ভাষাঙ্গনের রাজা হয়েছেন এবং রাজটিকা পরেছেন। শুধু যে রাজা হয়েছেন তা নয়, তিনি সাধারণ মানুষের মননে ঈর্ষণীয় স্থানও করে নিয়েছেন। তাঁর কর্ম, সাধনা ও একাগ্রতা মানুষের জন্য একটি স্বরূপ নির্মাণ করেছেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যিনি একাধারে মানুষের কথাই ভেবেছেন, মানুষের সুখ-দুঃখে একাকার হয়েছেন। আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন বিরলপ্রজ মানুষ। তাছাড়া ত্রিমুখী আবুল মনসুর আহমদ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর অনুরক্ত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে তিনি কংগ্রেস আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের একজন সক্রিয় সদস্য হন। ১৯৪০ সাল থেকে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবেও কাজ করেন। মূলত তিনি কৃষক-প্রজা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আসেন। তিনি ১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জনাব আতাউর রহমান খাঁর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। তিনি ছয় দিন উক্ত দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে (১৯৫৬-৫৭) তিনি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সময়ে অল্প কিছু দিনের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর স্থলাভিষিক্তও ছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য দল থেকে শুরু করে সুভাষ বসুর আকর্ষণে কংগ্রেস, পাকিস্তান আন্দোলন, কৃষক প্রজা পার্টি, মুসলিম লীগ এবং সর্বশেষ আওয়ামী লীগ গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

ড. রফিকুল ইসলামের একটি বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে- একুশে ফেব্রুয়ারিকে আবুল মনসুর আহমদ একুশ দফাতে পরিণত করেছিলেন। তাঁর সৃষ্টিশীল প্রয়াস স্বাধীনতা আন্দোলনের দানা বেঁধে ওঠার পেছনে অবদান রেখেছে। আমরা জাতীয়তাবাদের একটা মহান চেতনা তাঁহার কাছ থেকে পেয়েছি। সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক হিসেবে মরহুমের লেখনীকে আমাদের উত্তরাধিকারী হিসেবে পেতে হবে। সত্যি আবুল মনসুর আহমদ তাই ছিলেন। ‘আয়না’, ‘হুজুর কেবলা’, ‘নায়েবে নবী’র রম্যর মতো গল্পের জন্যই লেখক হিসেবে তিনি আমার মতো অনেকের কাছে নমস্য। বর্তমান সময়ে মৌলবাদের থাবায় যখন আতঙ্কিত মুক্তচিন্তার মানুষ; এই সময় থেকে বহু বছর আগে তিনি এই ধরনের গল্প লিখে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। এবং আজকের দিনে ধর্মের ব্যাপার নিয়ে এভাবে কল্পনা করাও অসম্ভব। কবি নজরুল তার বহু আগেই তথাকথিত আলেমদের দ্বারা কাফের আখ্যায় চিহ্নিত হয়েছেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর বলেন : আবুল মনসুর আহমদ বাংলাদেশের স্যাটায়ার রচনার ক্ষেত্রে তিনি যে পূর্ব বাংলার পরশুরাম এ সম্পর্কেও বোধ করি কেউ দ্বিমত হবেন না। অন্যদিকে রক্ষণশীল মুসলমান সমাজ চিত্রশিল্পের বিরোধিতা করলেও সে সময়ে অনেক প্রগতিপন্থি বুদ্ধিজীবী এ শিল্প মাধ্যমের সমর্থন জানান দৃঢ়ভাবে। কাজী নজরুল ইসলাম গোঁড়া রক্ষণশীল সমাজপতিদের উদ্দেশে লেখেন- আজ বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে একজনও চিত্রশিল্পী নাই, ভাস্কর নাই, সংগীতজ্ঞ নাই, বৈজ্ঞানিক নাই, ইহা অপেক্ষা লজ্জার আর কী আছে? এই সবে যাহারা জগৎ প্রেরণা লইয়া আসিয়াছিল, আমাদের গোঁড়া সমাজ তাহাদের টুঁটি চাপিয়া মারিয়া ফেলিয়াছে ও ফেলিতেছে। এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমাদের সমস্ত শক্তি লইয়া যুঝিতে হইবে।

কথাসাহিত্যিক আবুল ফজল চিত্রশিল্পের পক্ষে নিজের সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর চৌচির (১৯৩৪) উপন্যাসের নায়ক তসলিমের যে ভাবনা সেখানে আছে চিত্রশিল্পের প্রতি সমর্থন। শুদ্ধ চিন্তার আবুল মনসুর আহমদ সাংবাদিকতা করেছেন, রাজনীতি করেছেন, ওকালতি করেছেন এবং সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো এমন একজন মানুষ আবার সাহিত্য চর্চাও করেছেন। এ জন্য তাঁকে ভালোভাবে বুঝতে হলে আলাদা

আলাদাভাবে অন্তত তিনটি জীবনী লেখা দরকার বলে অনেকে মনে করছেন। যার একটি হবে সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে, একটি সাহিত্যিক হিসেবে এবং অপরটি রাজনীতিবিদ হিসেবে। পত্রিকার সম্পাদকীয় লেখা সম্পর্কে একটা মজার কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি বলে গেছেন। আমাদের এখনকার সম্পাদকদের এই কথাগুলো কাজে লাগতে পারে। প্রতিভার দিক দিয়ে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য অগ্রণী ভূমিকা রেখে গেছেন। যা আজও আমাদের জন্য গ্রহণীয়।      

ফলত দেখা যায় সত্য প্রকাশে আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন অকুতোভয় কলম সৈনিক। অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়স্বার্থেও ক্ষমতাসীন মহলকে সাবধান করিতে তাহার ন্যায় মহান প্রতিভাধর প্রবীণ প্রাজ্ঞ ব্যক্তিকেও কখনো কখনো হুমকির সম্মুখীন হইতে হইয়াছে। কিন্তু তিনি সেসব হুমকির জবাব তাঁর অনুকরণীয় মিছরির ছুরিতে ও ভঙ্গিতে এমনিভাবে দিয়াছেন যাহার মোকাবিলায় ক্ষমতামত্তরাও স্তব্ধ হইয়া পরাভব মানিয়েছেন। এক কথায়, জাতির বিবেকের সদা জাগ্রত প্রহরী।

সর্বোপরি সাহিত্যিক হিসেবে বাংলাসাহিত্যে আবুল মনসুর আহমদের আসন স্থায়ী। আমরা তাকে স্মরণ করতে ভুলে গেলেও তাঁর স্থান অবিচলিত থাকবে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক : কালের ধ্বনি।


আপনার মন্তব্য