শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৫ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:০৪

নারীর অবদানও কম নয়

মাশহুদা খাতুন শেফালী

কবি নজরুলের নারী কবিতার ভাষায়-বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।/ ...জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান/ মাতা ভগ্নি ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে কবি নজরুলের নারী কবিতার মাহাত্ম্য বিদ্যমান। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি মিলুক আর না মিলুক, ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণ ছিল সূর্যের আলোর মতোই প্রকাশ্য উজ্জ্বল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত আগে যত সংগঠিত আন্দোলন হয়েছিল তার প্রত্যেকটি আন্দোলনে নারীর দৃষ্টান্তমূলক অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৭১-এর নয় মাসব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধ দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেমন কোনো দৈব ঘটনা ছিল না, তেমনি মেয়েদের অংশগ্রহণ ও কোনো আকস্মিক বিষয় ছিল না। আতিউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধ জনযুদ্ধ, ঢাকা সাহিত্য প্রকাশ, ২০০৩-এর তথ্য মতে, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সরকার গঠনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। এর প্রতিবাদে ১৯৭১-এর ১ মার্চ থেকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। এই অসহযোগ আন্দোলনে বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনের নারীকর্মীরা অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। এই নারীরা জনমত গঠনের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্যাল ফিটনেস, মার্চপাস্ট, অস্ত্র চালনা, ফাস্টএইড, ব্যারিকেড তৈরির প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন আত্মরক্ষামূলক কৌশলসমূহ শিখেছেন এবং এসব বিষয় পাড়ায় পাড়ায় গঠিত ব্রিগেডগুলোতে শিক্ষা দিতে থাকেন। মাহমুদ সামসুল হকের ‘হাজার বছরের বাঙালি নারী’, ঢাকা পাঠক সমাবেশ ২০০০-এর ভাষ্যমতে, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে কোনো পর্যায়ের নেতৃত্ব ব্যাপকভাবে নারী সমাজকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার নিমিত্তে প্রশিক্ষণ প্রদানে এগিয়ে আসেনি। কিন্তু ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের আলোচনা ব্যর্থ হলে যুদ্ধের আসন্ন সম্ভাবনা উপলব্ধি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের কয়েকজন ছাত্রী আর্মড ফোর্স, সুইসাইড স্কোয়াড, গেরিলা স্কোয়াড ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। সারা দেশে সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে এ ধরনের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হলেও মেয়েদের এতে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছিল না। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের জন্য মনো-দৈহিকভাবে প্রস্তুত নগণ্যসংখ্যক ছেলেমেয়েদের জন্য পরিচালিত কোনো কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মেয়েদের প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সংখ্যাগুরু নীতিনির্ধারকরাই মনে করতেন সশস্ত্র যুদ্ধ মেয়েদের পক্ষে সম্ভব নয়।’ ড. আবুল আজাদ, চেয়ারম্যান, মুক্তিযুদ্ধ একাডেমির তথ্যমতে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকবাহিনী প্রথমে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে অতর্কিত আক্রমণ চালায়, অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলে আক্রমণ করে এবং এই রাতে হলে অবস্থানরত প্রায় সব তরুণ ছাত্রকে হত্যা করে। তৃতীয় আক্রমণটি চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে। কিন্তু রোকেয়া হলে পাকবাহিনী কোনো হত্যাযজ্ঞ চালায়নি। সেই রাতে হলে উপস্থিত সব ছাত্রীকে গাদাগাদি করে দুই ট্রাক ভর্তি করে তুলে নিয়ে যায়। তারা আর কোনো দিন ফিরে আসেনি। সম্ভবত, যারা দীর্ঘ নয় মাস পাকবাহিনীদের ব্যারাকে পৈশাচিক নির্যাতন সহ্য করে বেঁচেছিলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের পরিচয় দেওয়ার মতো সমাজে গ্রহণযোগ্য কোনো পরিচয় ছিল না। তারা যেন ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের শিকার হয়ে এক অশ্লীল ভাষা ও অবজ্ঞার পাত্রী হলেন। আসমা পারভীন তার বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ-২০১১ এর পঞ্চম অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন যে, ২৫ মার্চের রাতেই পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য বীর নারী রওশন আরা বেগম বুকে মাইন বেঁধে পাকিস্তান বাহিনীর ট্যাংকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তিনি নিজের দেহকে ছিন্নভিন্ন করে ঘায়েল করতে সক্ষম হয়েছিলেন পাকবাহিনীর একটি পুরো প্লাটুন ট্যাংক। এভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ঘুমন্ত মানুষের ওপর অঘোষিত বর্বর হত্যাযজ্ঞের সূচনাপর্বেই নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে একজন নারী প্রতিরোধের প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। অথচ, এত বড় আত্মত্যাগের পরও এই বীর নারীর নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় আজ অবধি স্থান পায়নি। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের পর থেকেই প্রশিক্ষণ শিবির স্থাপন করা হয় ভারত সীমান্ত অঞ্চলে, সেখানে পুরুষের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীও অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। প্রথম দিকে বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনের নারীকর্মীরা এবং শিক্ষিত পেশাজীবী নারীরা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে বা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করলেও ক্রমেই এ দেশের সাধারণ নারীরা পাকসেনা ও দেশীয় রাজাকার আলবদরের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া থেকে দেশমাতৃকা রক্ষার্থে, পরিবারের আপনজন হারানোর বেদনা, ঘাতপ্রতিঘাতে এবং আত্মরক্ষার্থে বাংলার নারী সমাজ হয়ে উঠে দুর্দান্ত ও আপসহীন। কী নিজ বাড়িতে অবস্থান নিয়ে, কী আত্মগোপনে থেকে এমনকি নিজ ভূখন্ডের বাইরে গিয়ে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ নিয়ে সম্মুখসমরে অংশ নেয়। পুরুষের পাশাপাশি কখনোবা পরিবারের তরুণ ভাইদের সঙ্গে, সহপাঠীর সঙ্গে, স্বামী অথবা প্রেমিকের হাত ধরে ভারত পাড়ি দিয়ে ভারতে বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত প্রশিক্ষণ শিবিরে অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ গ্রহণ, সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ, রণাঙ্গনে অস্ত্রের জোগান, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাস্থ্যসেবা, গোপন তথ্য সংগ্রহ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান পরিবেশনের মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠন করে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেছেন। এমনকি পরিবারের উপার্জনক্ষম স্বামী-সন্তান বা ভাইকে যুদ্ধে পাঠিয়ে পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ পালন করেছেন। যে সব নারী বাড়ির বাইরে যেতে পারেননি তারা নিজ বাসস্থানে বা আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রিত হয়ে ও মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার রান্না করা, সরবরাহ করা, কাপড়-চোপড় সরবরাহ, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দান, মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা, তথ্য আদান-প্রদান, হাতবোমা বহন করা, এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশ মোতাবেক বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো ও অস্ত্র লুকিয়ে রাখাসহ যাবতীয় কাজে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করে মুক্তিবাহিনীর সব যুদ্ধকার্যে সহযোগিতা করেছেন। মূলত নিরীহ, নিরস্ত্র জনসাধারণের ওপর পাকবাহিনীর অতর্কিত ও বর্বরোচিত আক্রমণ, নির্বিচারে নারী নির্যাতন ও গণহত্যার প্রতিশোধস্পৃহা, আত্মরক্ষা, দেশপ্রেমে নারীদের প্রত্যক্ষভাবে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে আকৃষ্ট করে তোলে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, নারী উদ্যোগ কেন্দ্র (নউক)।