শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৮ এপ্রিল, ২০২১ ২২:৫৬

আতঙ্ক নগরী দিল্লি

তসলিমা নাসরিন

আতঙ্ক নগরী দিল্লি

ঘুম থেকে উঠছি। বাইরে ঝলমল করছে রোদ, কিন্তু মনে হয় রাত এখনও ফুরোয়নি। মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা চারদিকে। কোনও শব্দ নেই কোথাও। মানুষের কোনও কোলাহল নেই। প্রতিবেশীরা যেন সব ঘুমিয়ে আছে। কোনও ফেরিওয়ালা হাঁকছে না। কোনও গাড়ির বা কোনও অটোরিক্সার আওয়াজ, কোনও সাইকেলের মৃদু ঘণ্টাধ্বনিও নেই।  সকাল গড়িয়ে দুপুর নামে, একই রকম স্তব্ধতা থিকথিক করে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, শুধু থেকে থেকে কিছু পড়শি পাখির ওড়াওড়ির শব্দ, আর কোনও শব্দ নেই। দিল্লি দীর্ঘ লকডাউনে আগেও গেছে, কিন্তু এমন মৃতপুরী একে এর আগে হতে দেখিনি। গত বছরের লকডাউন আর এ বছরের লকডাউনে বিস্তর ফারাক বটে। গত বছর শ্মশান হয়ে যায়নি দিল্লি, এ বছর দিল্লি আক্ষরিক অর্থেই শ্মশান। 

ছোট্ট শহর দিল্লি। এ শহরই করোনার কামড়ে শতচ্ছিন্ন আজ। করোনা মানুষের ফুসফুস থেকে শ্বাসের বাতাস কেড়ে নিয়েছে। এ শহর হয়ে উঠেছে আস্ত একটি শ্মশান। দিল্লির সরকারি শ্মশানঘাটে শবদেহের স্তূপ। অগত্যা শহরের খোলা মাঠ, পার্ক, এমনকী গাড়ি-পার্কিং-এর জায়গাও হয়ে উঠেছে অস্থায়ী শ্মশান। মানুষ পিপিই পরে নিজেরাই দাহ করছে আত্মীয়স্বজনের। সারি সারি চিতার লেলিহান শিখা আকাশ কালো করে তুলছে। এক শবের চিতায় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে পাঁচ-পাঁচটি শব। সৎকারের পেশা যাদের বা দাহ করার দায়িত্ব যাদের, তারা দিন রাত ব্যস্ত, একফোঁটা ফুরসত নেই তাদের। চিতা জ্বালাতে জ্বালাতে তাদের মুখ অনেকটা ঝলসে যাচ্ছে, তাদের আর দেখলে চেনা যায় না।

এই সত্য এখন অনেকে জানে যে সরকারি হিসেবে মানুষের যত সংক্রমণ, যত মৃত্যু, আসল সংক্রমণ আর মৃত্যুর সংখ্যা তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। কেন সরকারি খাতায় সংক্রমণ আর মৃত্যুর সংখ্যা কম করে লেখা? আসল সংখ্যাটা জানলে নাকি আতঙ্কে ডুবে যাবে জনতা। আতঙ্কে কি আর কিছু কম ডুবছে? হাসপাতালে দৌড়োচ্ছে মানুষ রোগী নিয়ে, কোনও হাসপাতালে কোনও শয্যা খালি নেই, কোনও হাসপাতালে কোনও অক্সিজেন নেই, কোনও আইসিইউ ফাঁকা নেই, কোনও সাধারণ ওয়ার্ডও খালি নেই। হাসপাতাল উপচে পড়ছে করোনা রোগীতে। মানুষ হাসপাতালের বাইরে ফুটপাতে, বারান্দায়, গাড়িতে, অটোরিক্সায় পড়ে পড়ে ধুঁকছে। একটুখানি অক্সিজেন চাই। অক্সিজেনের জন্য চারদিকে হাহাকার। কান পাতলেই শুনতে পাই সেই হাহাকারের আওয়াজ।

কেউ কেউ অক্সিজেনের একখানা সিলিন্ডার জোগাড় করতে পেরেছে তো ফুটপাতে, স্ট্রেচারে, গাড়িতে বসে বা শুয়ে গোগ্রাসে অক্সিজেন নিচ্ছে। যাঁরা হয়তো বাঁচতেন একটু অক্সিজেন পেলে, তাঁরা অক্সিজেন না পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। দিল্লির শ্মশানগুলোর ভেতর খালি জায়গায় গত কদিনে দাহ করার নতুন বেদি তৈরি করা হয়েছে। পার্কগুলোতেও তৈরি করা হয়েছে শত শত বেদি। যমুনা নদীর তীর ঘেঁষা এলাকাগুলোতে অস্থায়ী শ্মশান তৈরি করা হয়েছে। গাড়ি পার্কিংএও বেদি তৈরি করা হয়ে গেছে। এভাবে যদি পরিকল্পিতভাবে দ্বিতীয় ঢেউ আসার আগেই হাসপাতালগুলোয় সারি সারি অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখা হতো! তাহলে দিল্লিকে শ্মশান বানানোর প্রয়োজন পড়তো না। মানুষের জীবনের মূল্য নেই, বাঁচার অধিকার নেই, কিন্তু স্বধর্মে মরার অধিকার তো আছে, তাই দাহ করতে ত্রুটি করছে না স্বজনেরা। অতিমারির সত্যিকার রূপ করোনার প্রথম ঢেউয়ে দেখা যায়নি। দ্বিতীয় ঢেউ সুনামি ঘটিয়ে দিয়েছে।

দিল্লিতে তো খুব বেশিদিন আগের কথা নয় যে ধীরে ধীরে শূন্যে এসে দাঁড়িয়েছিল কোভিডের মৃত্যু। সেই শূন্য থেকে লাফিয়ে উঠেছে সংখ্যা। কী কারণ এর? দ্বিতীয় ঢেউয়ের ব্যাপারে আশঙ্কা করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু এমন যে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে পরিস্থিতি, এ মনে হয় বিজ্ঞানীরাও ধারণা করতে পারেননি। কেন, তার নানা কারণ। করোনার মিউটেশান হয়েছে। চরিত্র বদলে গেছে করোনার। আগের চেয়ে বেশি সংক্রমণ করার ক্ষমতা এখন। একজনের করোনা হলে সে ৪০০ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। এইসময় গঙ্গায় ধর্মীয় স্নানে গেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। কুম্ভ মেলাটিকে কি এ বছর বন্ধ করা যেত না? যেত ঠিকই। কিন্তু সরকার থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যেহেতু কোনও বাধা ছিল না, বরাবরের মতো বিশ্বাস মানুষকে টেনে নিয়ে গেছে মেলায়। পবিত্র গঙ্গার জলে একবার ডুব দিয়ে এলে সে শরীরে আর রোগ-শোক-করোনা ধরবে না। ২০/২৫ লক্ষ মানুষ গেছে কুম্ভে। যদিও উত্তরাখন্ডের প্রশাসন বলেছিল, কোভিডের নিয়ম মেনে কুম্ভের আয়োজন হবে, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি! বেশির ভাগ পুণ্যার্থী মাস্ক পরেননি। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার তো প্রশ্নই ওঠে না। কুম্ভে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে। যদিও কুম্ভ মেলা আয়োজন কমিটির এক সদস্য বলেছেন, ‘আমাদের কাছে বিশ্বাস সবথেকে বড়। মা গঙ্গার ওপর মানুষের বিশ্বাস রয়েছে বলেই তো এত মানুষ এখানে স্নান করতে এসেছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন মা গঙ্গা তাঁদের এই অতিমারির হাত থেকে বাঁচাবেন।’ উত্তরাখন্ডের মুখ্যমন্ত্রীও বলেছেন, ‘মানুষের স্বাস্থ্য অবশ্যই গুরুত্ব পাবে। তাই বলে ধর্মকে অবহেলা করতে পারব না।’

লক্ষ করেছি যে মিডিয়া এবং মানুষ সরব ছিল তাবলীগ জামাতের লোকেরা দিল্লিতে গত বছরের মার্চে জমায়েত করেছিলেন বলে, তাঁরা কুম্ভ মেলা নিয়ে কোনও রা-শব্দ করছেন না। যে কোনও জমায়েতই নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ, তাবলিগি জামাত ক্ষতি করলে কুম্ভ মেলাও ক্ষতি করে। কুম্ভ মেলায় হাজারো লোকের শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে, ঠিক যেমন তাবলিগি জামাতের কারও কারও শরীরে পাওয়া গিয়েছিল। তাবলিগি জামাতের ওপর ভীষণ ক্ষিপ্ত হওয়া, তাবলিগিদের মধ্যে যাঁরা বিদেশি, তাঁরা যেন আর কখনও ভারতে আসার ভিসা না পান, সে ব্যাপারেও ব্যবস্থা পাকা করে ফেলা- মনে আছে সেইসব। কিন্তু কুম্ভ মেলার প্রতি তাঁদেরই পক্ষপাত আমাকে অবাক করেছে। যতই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উপদেশ দেওয়া হোক, জনসমুদ্রের সকলে সে উপদেশ মানবে না। শুধু কি ধর্মীয় জমায়েত, নির্বাচনের প্রচারে রাজনৈতিক জমায়েত চলছেই। শুধু কি রাজনৈতিক জমায়েত, সামাজিক জমায়েতেরও কোনও কমতি নেই। বিয়ের উৎসব কোথাও বন্ধ হয়নি। এইসবের প্রতিক্রিয়া যে এমন বিস্ফোরণে রূপ নেবে তাই বা কে জানতো। কিছু বিজ্ঞানী বলছেন, যাঁরা কোভিডে ভুগে সুস্থ হয়ে উঠছেন, তাদের শরীরে এন্টিবডি তৈরি হচ্ছে না, সে কারণেই ভাইরাস আবার ভয়াবহ আকারে ফিরে এসেছে। শুধু তো টিকা প্রতিষেধক দিয়ে ভাইরাসকে বিদেয় করা সম্ভব নয়, শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতাও গড়ে ওঠা চাই।

দুঃসংবাদ যখন আসে, চারদিক থেকেই আসে। হাহাকার চারদিকে। অসংখ্য মৃত্যু। মানুষ মরিয়া হয়ে টিকা নিচ্ছে। টিকার ওপরই বা ভরসা কী! কোভিশিল্ড বা অ্যাস্ট্রাজেনেকা ইউরোপের দেশগুলোয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কারণ টিকার কারণে রক্ত জমাট বেঁধে স্ট্রোক হচ্ছে মানুষের, মানুষ মারা যাচ্ছে। তারপরও আমরা ভারত-বাংলাদেশে সেই টিকাই নিচ্ছি। এ অঞ্চলে যে টিকার ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটেনি, তা নয়, ঘটেছে। সেই সব খবর কার্পেটের তলায় লুকিয়ে ফেলা হয়েছে। নিশ্চয়ই হয়েছে। উন্নত দেশে ১০ জনের মৃত্যু হলেই টিকাকরণ বন্ধ করে দেওয়া হয়, আর অনুন্নত দেশে, যেসব দেশে মানুষের জীবনের একফোঁটা মূল্য নেই, ৪০০ জনের মৃত্যু হলেও ‘ও কিছু না’ বলে টিকাকরণ চালু রাখি।  আমরা বেঁচে থাকলেও যেমন কারও কিছু যায় আসে না, আমরা মরে গেলেও কারও কিছু যায় আসে না। এ অঞ্চলে সাধারণ মানুষের কথা কেউ ভাবে না। যাঁরা অসাধারণ, যাঁরা ধনী, যাঁরা প্রভাবশালী, তাঁদেরই বেঁচে থাকাটা জরুরি বলে ভাবা হয়।

তবে দিল্লির শ্মশান হয়ে যাওয়া দেখে বিভিন্ন দেশ সাধারণ মানুষকে সাহায্য করার জন্য হাত বাড়িয়েছে। অক্সিজেন আসছে, ভেন্টিলেটর আসছে, কিছুরই আর অভাব হবে না। শুধু এইসবের অভাবে গত ক’দিন যাঁদের মৃত্যু হলো, তাঁরাই আর ফিরে আসবেন না। বাতাস এখন বিষাক্ত, বাতাসে কিলবিল করছে লক্ষ কোটি ভাইরাস। চারদিকে শুধু চিতার আগুন, চারদিকে শুধু কবরের নিস্তব্ধতা। কিন্তু এভাবে বেশিদিন নয়। আবার বাসযোগ্য হবে এ মাটি, আবার হবে জীবনের ঝলমলে উৎসব! নিশ্চয়ই হবে।

                লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।