শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১০ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ মে, ২০২১ ২২:৫৬

দিদি, আমরা কতদিন ভরসা রেখে বসে থাকব?

প্রভাষ আমিন

দিদি, আমরা কতদিন ভরসা রেখে বসে থাকব?
Google News

মমতা ব্যানার্জিকে আমি দুই বার কাছ থেকে দেখেছি। দ্বিতীয়বার গত বছর কলকাতা ইডেন গার্ডেনসে পিঙ্ক টেস্টের সময়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেই টেস্ট উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও। দ্বিতীয়বার কাছ থেকে দেখাটা পূর্ব নির্ধারিত, প্রত্যাশিত। তবে প্রথমবারের দেখাটা ছিল চরম নাটকীয়। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরের কোনো এক সময়। আমি জাতীয় প্রেস ক্লাবে ঢুকছি, দেখি বেবি আপা বেরোচ্ছেন। বেবি আপা মানে প্রয়াত বেবি মওদুদ। শেষ বেলায় সংসদ সদস্য হলেও বেবি আপা ছিলেন পেশাদার সাংবাদিক। তবে বেবি আপার আরেকটা বড় পরিচয় ছিল। তিনি ছিলেন শেখ হাসিনার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু এই ঘনিষ্ঠতার কোনো সুযোগ তিনি কখনো নেননি। বরাবরই তিনি ছিলেন মাটির মানুষ। সাদামাটা শাড়ি পরে একদম সাধারণভাবে চলাফেরা করতেন। আমি বেবি আপাকে দেখে সালাম দিলাম, কুশলবিনিময় করলাম। কিন্তু বেবি আপার সঙ্গে পোশাকে-আশাকে, চাল-চলনে একদম তার মতোই সাদামাটা আরেকজন নারী ছিলেন। এতই সাদামাটা, তার দিকে ভালো করে তাকাইওনি। বেবি আপাই পরিচয় করে দিতে গেলেন। তবে ভালো করে তাকাতেই বিস্ময়ে আমার বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। আরে এ তো মমতা ব্যানার্জি। পশ্চিমবঙ্গের দাপুটে নেত্রী। তারপর দুজন হেঁটেই ক্লাব থেকে বেরোলেন। তারপর মমতা ব্যানার্জি মন্ত্রী হয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু তার চেহারা পাল্টায়নি মোটেই। ২৫ বছরে একটুও বদলাননি মমতা, অন্তত পোশাকি অবয়বে।

মা-মাটি-মানুষের মমতা আবারও চমক দেখিয়েছেন। বিজেপির সব চেষ্টাকে উড়িয়ে দিয়ে, বামফ্রন্ট-কংগ্রেস জোটকে ভাসিয়ে দিয়ে তৃতীয়বারের মতো পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছেন তিনি। নন্দীগ্রামে এক সময়ের ডানহাত শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হারলেও মমতাই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। মমতার খ্যাতি তার গোয়ার্তুমির জন্য, তার আটপৌরে জীবনযাপনের জন্য। ক্ষমতায় আসার আগে যে আটপৌরে শাড়ি পরতেন, যে চপ্পল পরতেন, টালির যে বাড়িতে থাকতেন; এখনো তেমনই আছেন, সেখানেই আছেন। মমতা ছবি আঁকেন, গান শোনেন, বই পড়েন। একদম সাধারণ বাঙালি নারীর প্রতিচ্ছবি। আর এই বাঙালিয়ানাই ঠেকিয়ে দিয়েছে সাম্প্রদায়িকতাকে। মমতার ব্যক্তিত্ব এমনই, তাকে অপছন্দ করা যায়, উপেক্ষা করা যায় না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আন্তরিক ও উষ্ণ। বাংলাদেশের প্রতিও তার রয়েছে আলাদা টান ও প্রবল অনুরাগ। বিভিন্ন সময়ে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। মমতা ব্যানার্জির জয় বাংলাদেশেও উচ্ছ্বাসের জোয়ার এনেছে। তবে এবারের উচ্ছ্বাস যতটা মমতার জয়ের জন্য, তারচেয়ে বেশি মোদি-অমিত জুটির অশুভ তৎপরতা ঠেকিয়ে দেওয়ায়। মমতার জন্য বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে যতটা ভালোবাসা ছিল, তা শুকিয়ে গেছে পানিশূন্য তিস্তার বুকের মতোই। মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য যতটা মমতাময়ী, বাংলাদেশের মানুষের জন্য ততটাই মমতাহীনা।

বর্তমানে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সবচেয়ে ভালো। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু একাত্তরের পর থেকেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অমøমধুর সম্পর্কের যাত্রা শুরু। ’৭৫-এর পর বাংলাদেশের রাজনীতির মূল সুর হয়ে যায় ভারতবিরোধিতা। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক সবচেয়ে ভালো অবস্থায় পৌঁছেছে বর্তমান সরকারের আমলে। এতদিনে দুই দেশই নিজেদের ভালো সম্পর্কের গুরুত্বটা বুঝতে পেরেছে। বন্ধু বদলানো যায়, কিন্তু প্রতিবেশী বদলানো যায় না। তিনদিক ঘিরে রাখা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছাড়া যেমন বাংলাদেশের চলা কঠিন, তেমনি ভারতেরও নিজেদের স্থিতিশীলতার স্বার্থে বাংলাদেশকে দরকার। এ দফায় আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে তখন ভারতে ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। আওয়ামী লীগ আর কংগ্রেসের সম্পর্কের একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এই সম্পর্ক নিয়ে ক্ষণিকের সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বিজেপিও নিজেদের স্বার্থটা বুঝে নিতে ভুল করেনি। তাও সম্পর্কের উষ্ণতা বজায় ছিল এবং আছে। আগের দফায় ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ ভারতের সঙ্গে দারুণ কূটনৈতিক দক্ষতায় গঙ্গার পানি চুক্তি করে দীর্ঘদিনের সমস্যা মেটায়। এ দফায় ক্ষমতায় এসে মিটে সীমান্ত সমস্যা। তবে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন সমস্যা আটকে আছে মমতাহীনা মমতার টেবিলে। ২০১১ সালে ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় তিস্তার পানি চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও মমতা ব্যানার্জির বাগড়ায় তা আটকে যায়। তারপর থেকেই মমতা বাংলাদেশে ভিলেন হয়ে যান।

অভিন্ন নদীর পানি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি বড় ফ্যাক্টর। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীর উৎপত্তি ভারতে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করাই প্রাকৃতিক নিয়ম। কিন্তু ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে প্রথম সে প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। তারপর থেকেই অবিশ্বাসের যাত্রা। ভারত তাদের স্বার্থে উজানে নদীর পানি আটকে দেয়, যা সমস্যায় ফেলে বাংলাদেশকে। কিন্তু ভারতের গজডোবায় ব্যারাজ নির্মাণ করে তিস্তার পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে দারুণ সমস্যা হয়। লালমনিরহাটে তিস্তা ব্যারাজ কৃষকদের জন্য যতটা আশা নিয়ে নির্মাণ হয়েছিল, পানির অভাবে তা হতাশায় বদলে যায়। ভারত ব্যারাজ ও সেচ খালের মাধ্যমে পানি নিয়ে নেওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে ব্যারাজটি অকার্যকর হয়ে যায়। আবার বর্ষায় পানি ছেড়ে দেওয়ায় বাংলাদেশে বন্যা এবং নদী ভাঙনের সৃষ্টি হয়। ১৯৭২ সালে যৌথ নদী কমিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। ১৯৮৩ সালে একটি এডহক সমঝোতাও হয়েছিল। সে অনুযায়ী ২৫ শতাংশ পানি তিস্তা ও প্রবাহের জন্য রেখে, বাকি ৭৫ শতাংশ পানি ৩৯:৩৬ অনুপাতে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ভাগ করার কথা ছিল। তবে সে সমঝোতা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে পরের বছরই ভারত সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। তবে সে সফরে কোনো চুক্তি হয়নি। পরের বছর ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা চুক্তি করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। কিন্তু মমতার বাগড়ায় তা হয়নি। কথা থাকলেও মমতা মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশে আসেনইনি। আর মমতার সম্মতি ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষেও চুক্তি করা সম্ভব ছিল না। তারপর থেকেই আটকে আছে তিস্তা চুক্তি। মমতার এই মমতাহীন আচরণ আমাদের বেদনার্ত করেছে। তবে এটাও ঠিক মমতা তার রাজ্যের স্বার্থটাই আগে দেখবেন। কিন্তু স্বার্থ দেখতে গিয়ে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করা কোনো কাজের কথা নয়। ন্যায়-অন্যায় বলেও তো একটা কথা আছে। নিজের স্বার্থ অক্ষুণœ রাখতে চেয়ে তো আপনি আরেক দেশকে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করতে পারেন না। বাংলাদেশকে পর্যাপ্ত পানি দিলে সমস্যায় পড়বে পশ্চিমবঙ্গ। তাই মমতা এতে বাগড়া দেন। মমতার দাবি, উৎপত্তিস্থল সিকিম পানি প্রত্যাহার করায়, পশ্চিমবঙ্গই পর্যাপ্ত পানি পায় না। তিস্তা চুক্তির জন্য আমাদের যতটা তাগিদ, ভারতের ততটা নয়। উজানের দেশ হওয়ায়, চুক্তি না হলে তাদের কোনো ক্ষতি নেই, বরং লাভ। তারা তাদের সুবিধা মতো পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। এত কিছুর পরও ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মমতা ব্যানার্জি বাংলাদেশে সফরে এসে উষ্ণ ও আন্তরিক অভ্যর্থনা পান। তিনি একাধিক অনুষ্ঠানে খুব আন্তরিক ভঙ্গিতে বাংলাদেশের মানুষকে তার ওপর ভরসা রাখতে বলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনাদেরও প্রবলেম আছে, আমাদেরও প্রবলেম আছে। তবে এটা আমাদের ওপর ছেড়ে দিন। এটি নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। ‘২০১৬ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে মমতার সে আশ্বাসে ভরসা রেখেছিল বাংলাদেশ। আমরা জানতাম নির্বাচনকে সামনে রেখে তখন তার পক্ষে তিস্তা চুক্তিতে সায় দেওয়া রাজনৈতিকভাবে কঠিন ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে দারুণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরও মমতা কথা রাখেননি। এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে আরও পাঁচটি বছর। এবার মমতা আরও দৃঢ়তায় ক্ষমতায় ফিরেছেন। একক দল হিসেবে ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। এখন সময় এসেছে। মমতা ব্যানার্জির উচিত বাংলাদেশের মানুষ তার প্রতি যে ভালোবাসা দেখিয়েছে তার মর্যাদা রাখা। আমরা জানি অপ্রিয় কাজগুলো ক্ষমতার প্রথম বছরেই করে ফেলতে হয়। তাই মমতা যদি সত্যি সত্যি তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে আন্তরিক হন, তাহলে এখনই তার সময়। পশ্চিমবঙ্গের কী সমস্যা সেটা নিয়েও আলোচনা হোক, বাংলাদেশের সমস্যাটা আলোচনা হোক।

বাংলাদেশের উচিত এখনই ভারতের ওপর, বিশেষ করে মমতার ওপর চাপ দেওয়া। করোনা মহামারীর সময়েও ভার্চুয়াল কূটনীতি চালিয়ে তিস্তা চুক্তি করতে ভারতকে বাধ্য করা। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন ভালো। কিন্তু কোনো একতরফা সম্পর্কই টেকে না। খালি কথায় আর আশ্বাসে চিড়ে ভিজবে না। বাস্তবতা যাই হোক, তিস্তা এখন বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক ইস্যু। তিস্তা শুকনো থাকলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কও উষ্ণ হবে না। আমরা জানি, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি রাজ্য মাত্র। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের আলোচনা, দরকষাকষি সব হবে দিল্লির সঙ্গে। তবুও কূটনীতির পিছনেও কূটনীতি থাকে। জ্যোতিবসু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বলেই গঙ্গা চুক্তি হতে পেরেছিল। এখন হয়েছে উল্টো, মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণেই হতে পারছে না তিস্তা চুক্তি। তাই দিল্লি পর্যন্ত যাওয়ার আগে ঢাকাকে কলকাতা হয়েই যেতে হবে। সেটা যত দ্রুত সম্ভব দুই দেশের জন্য ততই মঙ্গল। 

২০১৫ সাল থেকে মমতার কথার ওপর ভরসা করে বসে আছে বাংলাদেশ। প্রিয় দিদি, এখন আপনার দায়িত্ব সেই ভরসার প্রতিদান দেওয়া। আমরা কতদিন ভরসা করে বসে থাকব? মমতার ভরসায় বসে থাকতে থাকতে আমার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কবিতা ‘কেউ কথা রাখেনি’র কয়েকটি লাইন ‘নাদের আলী, আমি আর কত বড় হব? আমার মাথা এ ঘরের ছাদ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায় তিন প্রহরের বিল দেখাবে?’ সেই কবিতার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমারও বলতে ইচ্ছা করছে, ‘প্রিয় মমতা দিদি আমরা আর কত ভরসা করব? পানির অভাবে বাংলাদেশ শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেলে তারপর তুমি আমাদের পানি দেবে?

                লেখক : সাংবাদিক।