শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ জুন, ২০২১ ২৩:১০

নারীবিরোধী প্রতিবন্ধকতা ভাঙতে হবে

তসলিমা নাসরিন

নারীবিরোধী প্রতিবন্ধকতা ভাঙতে হবে
Google News

১. এই যে অর্ধশত বছর ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র প্রশংসা গাইলাম, এই বিশ্বাসে গাইলাম যে এই চেতনাটিই সবচেয়ে আদর্শ চেতনা, এই চেতনাই ধর্মান্ধতা, অজ্ঞানতা, অসাম্য, অন্ধকার, কুসংস্কার আর নারীবিদ্বেষ বিদেয় করে সভ্যতা আর সমতাকে বরণ করবে, কিন্তু কে জানতো একদিন খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধারাই এই চেতনার বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন! ধর্মান্ধতা আর নারীবিদ্বেষ প্রচার করবেন, ঠিক যেমন মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী অপশক্তিগুলো প্রচার করে!

মুক্তিযোদ্ধারা একটি স্বাধীন স্বনির্ভর সেক্যুলার রাষ্ট্র তৈরির স্বপ্ন নিয়ে একাত্তরে যুদ্ধ করেছিলেন, তাঁরা নমস্য। তবে এও ঠিক, কিছু মুক্তিযোদ্ধা দেশের ভেতর ধর্মান্ধতা আর বর্বরতার আস্ফালন দেখেও মুখ বুজে ছিলেন, কিছু মুক্তিযোদ্ধা দেশ রসাতলে গেলেও ফিরে তাকাননি, বরং বেজায় স্বার্থপর হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাউকে তো পথভ্রষ্ট হলে চলবে না! এই মন্ত্রণালয়ে থাকতে হবে সবচেয়ে সৎ, এবং আদর্শবান মানুষদের, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শতভাগ বিশ্বাস করেন। অথচ এর সংসদীয় কমিটিতেই একাত্তরের কালসাপের মতো সাপ ফণা তুলেছে। এই সাপ ছোবল দিতে চায় সভ্যতা আর সমতার শরীরে, নারীর সমানাধিকারে। এই সাপ অন্ধকার ফিরে পেতে চায়। এই সাপের নাম নারীবিদ্বেষ, যে নারীবিদ্বেষ একাত্তরে দু’ লক্ষ অসহায় নারীকে ধর্ষণ করেছিল।

এ কথা ঠিক, মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী অপশক্তি আজ দেশজুড়ে তান্ডব করছে, দেশকে রসাতলে নিয়ে যাচ্ছে, ধর্মান্ধতা আর অজ্ঞানতায় মুড়ে দিয়েছে প্রিয় দেশটিকে। কিন্তু ওদের হাত থেকে দেশকে বাঁচাবার দায়িত্ব তো মুক্তিযোদ্ধাদের, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করা প্রগতিশীল মানুষদের! কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটি মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে যে সম্মান জানানো হয়, বা গার্ড অব অনার দেওয়া হয়, সেখানে নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিষিদ্ধ করেছে। এর কারণ, ধর্মের বিধানমতে নারীদের যেহেতু জানাজায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ, সেহেতু গার্ড অব অনারেও অংশ নেওয়াও নিষিদ্ধ।

কিছু মানবাধিকার এবং নারী সংগঠন থেকে বলা হচ্ছে, জানাজা আর গার্ড অব অনার এক নয়। জানাজায় নারীর উপস্থিতি নিষিদ্ধ, কিন্তু গার্ড অব অনারে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত নয়। আমি অবাক হই  তাঁরা এই প্রশ্ন করলেন না, ‘কেনই বা জানাজায় নারীর উপস্থিতি নিষিদ্ধ’! তাঁরা বললেন না  নারীবিরোধী এই নিষেধাজ্ঞাটি তুলে নিতে হবে।

নারীবিদ্বেষ এবং নারীবিরোধিতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হলে, নারীকে মানুষের সম্মান নিয়ে সমাজে দাঁড়াতে হলে, ধর্মান্ততা এবং পুরুষতন্ত্রের যত প্রথা এবং প্রতিবন্ধকতা, সবকটির বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়াতে হবে। একটির বিরুদ্ধে দাঁড়াবো, আরেকটির বিরুদ্ধে দাঁড়াবো না, এ যদি নীতি হয়, তাহলে নারী কোনওদিনই তার সমানাধিকার পাবে না। ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীর মানবাধিকার চিরকালই লংঘন করা হবে, নারীকে বঞ্চিত এবং লাঞ্ছিত করা চিরকালই হবে।

ধর্মান্ধতার বাধা কি তুচ্ছ করা হয় না? নিশ্চয়ই হয়। হয় বলেই নারী আজ ঘরের বাইরে বেরিয়েছে, নারী আজ ইস্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, নারী আজ বহির্জগতে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে, চাকরি করছে, বাণিজ্য করছে, উপার্জন করছে। স্বনির্ভর হচ্ছে, আত্মবিশ্বাসী হচ্ছে। ধর্মান্ধদের ভ্রæকুটি উপেক্ষা করেই তো নারী আজ পুলিশে, সেনাবাহিনীতে। নারী আজ মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো নিষেধাজ্ঞা তুচ্ছ করেই দলের নেত্রী হয়েছেন, দেশের শাসক হয়েছেন! প্রচলিত বিধান, সে যদি নারীর অধিকারের বিরুদ্ধে যায়, তা যে মানতে হয় না, তার সর্বোচ্চ উদাহরণ শেখ হাসিনা। অত বড় ক্ষেত্রেই যদি প্রচলিত বিধান না মানা হয়ে থাকে, তাহলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষেত্রে তা আঁকড়ে রাখার কোনও মানে হয় না।

এমন ভাবে শত শত বছর ধরে মানুষ ধর্মান্ধতার নিষেধাজ্ঞা ভেঙ্গেছে। তা না হলে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতো, ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে পড়ে থাকতো সমাজ, গণতন্ত্র বলে কিছুর অস্তিত্ব থাকতো না, মানবাধিকার শব্দটি মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতো, নারী নির্যাতন-ধর্ষণ হয়ে উঠতো বৈধ, নারী-পুরুষের মধ্যে প্রভু-দাসীর সম্পর্কই হতো স্বাভাবিক। কিন্তু আজ সমাজ এগোচ্ছে সমতার দিকে। অসমতার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এখন আর অপরাধ নয়। কিন্তু ধর্মান্ধতার কারণে যে অসাম্য, তার বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়েও দেখি বাংলাদেশের বড় বড় প্রগতিশীলদেরও কণ্ঠ বুজে আসে। তাঁরা হন্যে হয়ে কিতাব খোঁজেন, ধর্মের সম্মতি যদি সামান্য হলেও পাওয়া যায়। আর না পাওয়া গেলে হাল ছেড়ে দেন। নারী নির্যাতিত হচ্ছিল, হতে থাকে। আমার প্রশ্ন হলো, ধর্মের সম্মতির দরকার হয় কেন? বাধা, সে যে কোণ থেকেই আসুক না কেন, তাকে ভাঙ্গতে হয়, বা ডিঙোতে হয়। এই ক্ষেত্রে আমি শেখ হাসিনার আদর্শ মানতে চাই। তিনি পরোয়া করেন না লোকে কী বললো না বললো, তার।

শেখ হাসিনা যে প্রচন্ড এক প্রতিষ্ঠিত নারীবিরোধী বিধানকে পায়ে মাড়িয়ে গিয়েছেন, সেইজন্য তাঁকে সাধুবাদ জানিয়েছি। তবে প্রধানমন্ত্রী ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইন- যে আইন ছুঁড়ে ফেলে সমতার সভ্য আইন আনা দরকার ছিল, তা আনেননি। জিহাদি মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় এমন মাদরাসা বন্ধ করার দরকার ছিল, তা তিনি তো করেনইনি, বরং মাদরাসাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দিয়েছেন। এত দীর্ঘ বছর গদিতে বসে সমাজে প্রোথিত নারীবিরোধী নিয়মের কিছুই তিনি বদলাননি, নারীর আজও মসজিদে যাওয়া, ইমামতি করা, জামাতে নামাজ পড়া, জানাজা পড়ানো, এমনকী জানাজায় অংশগ্রহণ করা নিষিদ্ধ, তিনি কিন্তু একটিও নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেননি।

শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলছি, শুধু নিজের ভালোর জন্য নয়, সমাজের ভালোর জন্যও কিছু করতে হয়। যে প্রথা ভাঙলে নিজের সুবিধে হবে, শুধু সে প্রথাই ভাঙলে চলবে না। সকলের সুবিধে হবে যেসব প্রথা এবং প্রতিবন্ধকতা গুঁড়িয়ে দিতে হবে। নারীবিদ্বেষী অপশক্তির হাতে হাতকড়া পরানোর সময় এখন।

২. আমার মা’র অসুখের সময় সারাক্ষণ পাশে ছিলাম আমি। আমিই দিন রাত মা’র যত্ন করেছি। পাশে অন্য কেউ আসেনি তেমন। বাড়ির পুরুষেরা ব্যস্ত ছিল নিজেদের নিয়ে। কিন্তু মা মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মা’র মৃতদেহটি নিয়ে কী কী করতে হবে, তার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল পুরুষেরা। মা’কে খাটিয়ায় শুইয়ে নিয়ে গেলো জানাজায়, কবরস্থানে। আমি যেতে চাইলাম সঙ্গে, আমাকে বলা হলো, না জানাজায়- না কবরস্থানে- কোথাও মেয়েদের যাওয়ার অনুমতি নেই। পুরুষেরা মোটামুটি যা বললো, তা হলো, আমি আমার মা’র সন্তান হতে পারি, কিন্তু জানাজায় আমার মায়ের লাশের সঙ্গে হেঁটে যাওয়ার কোনও অধিকার নেই, জানাজা পড়ার কোনও অধিকার আমার নেই, মায়ের কবরে মাটি দেওয়ার অধিকার নেই, কবরস্থানে ঢোকার অধিকারই নেই। কেন নেই? নেই, কারণ আমি মেয়ে। ধর্ম মেয়েদের বারণ করেছে জানাজায় বা কবরস্থানে যেতে।

বাংলাদেশে কোনও জানাজার নামাজে কোনও মেয়ের উপস্থিতি নেই। কিন্তু পাকিস্তানে আছে, সম্ভবত আরও কিছু মুসলিম দেশে আছে। পাকিস্তানে মানবাধিকারের জন্য লড়াই করার আইনজীবী আসমা জাহাঙ্গীরের জানাজায় অংশ নিয়েছে প্রচুর মেয়ে, সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েছে আসমা জাহাঙ্গীরের কন্যাসহ কয়েকজন মেয়ে। ইসলাম কি তাহলে সম্মতি দেয় মেয়েদের জানাজায় অংশগ্রহণের? উত্তর যা পেয়েছি, তা হলো, অনুমতি দেয় না, বারণ করে, নামাজ মেয়েদের জন্য ঘরে বসে পড়াই উত্তম বলে বিবেচনা করে। কিন্তু জানাজার নামাজ যদি পড়েই মেয়েরা, তা বেআইনি নয়, ইসলামবিরোধী নয়। যদি পড়তেই চায়, পুরুষদের পেছনে দাঁড়িয়ে পড়তে হবে। কিছুতেই সামনে নয়। কেউ কেউ বলে আরব দেশে নবীর আমলে মেয়েরাও অংশ নিত জানাজায়। তখন নিশ্চয়ই তাদেরকে পেছনের কাতারে দাঁড়াতে হতো। আজ ১৪০০ বছর পর, মেয়েদের অধিকার আগের চেয়ে বাড়ার কথা অনেক, অথচ বাংলাদেশে তো জানাজার সামনের কাতারে প্রশ্নই ওঠে না, পেছনের কাতারেও মেয়েরা অনুমতি পায় না দাঁড়ানোর। পাকিস্তান যেটা পারে, বাংলাদেশ সেটা পারে না কেন? পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে, বাংলাদেশের জন্ম ভাষা, সংস্কৃতি আর ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের দুই ভিত্তিতে আকাশ পাতাল তফাত। অথচ পাকিস্তানের মতো ধর্মে ডুবে থাকা দেশেও মেয়েরা স্বাধীনতা আর অধিকার যতটুকু পায়, বাংলাদেশে তা পায় না। আমি দাবি করছি না, পাকিস্তানের মেয়েরা নির্যাতিত হচ্ছে না। হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মেয়েরা নির্যাতিত তো হচ্ছেই, তার ওপর নিজের অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। যে যৎসামান্য অধিকার ইসলাম তাদের দিয়েছে, সেটুকুও তাদের ভোগ করা হচ্ছে না। জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ করার অধিকার আছে মেয়েদের, অথচ বাংলাদেশের মেয়েদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ভারতের কেরালা রাজ্যের মালাপ্পুরামে ওয়ান্দুর চেরুকোড় গ্রামে জামিদা বিবি নামের এক মেয়ে জুমার নামাজের ইমামতি করেছেন। ইসলাম হয়তো মেনে নিতে পারে যে মেয়েরা মেয়েদের নামাজের ইমাম হচ্ছে, কিন্তু পুরুষেরা মেয়েদের পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজে পড়বে, এ অসম্ভব। এই অসম্ভব কান্ডটি একটি গ্রামের মেয়েটি ঘটিয়ে দিয়েছেন। নারী পুরুষ উভয়ে জামিদা বিবির পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েছেন। নামাজ শেষের খুতবায় জামিদা নারী পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলেছেন। বলেছেন, ‘কোরানে নারী পুরুষের সমতার কথা লেখা আছে, কিন্তু বৈষম্যগুলো সৃষ্টি করেছে মানুষ, এই বৈষম্য আমি দূর করবো’। জামিদা বলেছেন, ‘কোরানের কোথাও লেখা নেই যে পুরুষদেরই সবসময় ইমামতি করতে হবে’। জামিদা কোরানে বিশ্বাস করেন, হাদিসে নয়, কারণ, তার যুক্তি, হাদিস আল্লাহ বা রসুল লেখেননি। হাদিস লিখেছেন রসুলের অনুসারীরা। অনুসারীদের ওপর জামিদার আস্থা নেই। দীর্ঘ ১৪০০ বছর যাবৎ পুরুষেরাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে মুসলমানদের সব ব্যাপারে, এই নিয়মের বদল চান জামিদা। জামিদা বিবি মসজিদে নামাজ পড়ান না, পড়ান তার কোরান সুন্নত সোসাইটির অফিসে। এই নামাজের খবর শুনে মুসলমানদের রাজনৈতিক দল ‘জামায়াতে ইসলামি হিন্দ’-এর সেক্রেটারি আবদুল রহমান বলেছেন, ‘জামিদা বিবি যা করছে, তা জাস্ট ড্রামা’। ফতোয়া জারি হয়েছে জামিদা বিবির বিরুদ্ধে। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্রী নন জামিদা। তিনি বলেছেন ইমামতি তিনি করেই যাবেন, ফতোয়া জারি হলে হোক। প্রয়োজনে পুলিশি নিরাপত্তা নেবেন। জামিদা বিবি আরও বলেছেন, ‘ভারতের মতো দেশ সামনে কী করে এগোবে, যদি মেয়েদের দাবিয়ে রাখার নিয়মগুলো না বদল করা হয়?’ জামিদা বিবির মতো সাহসী মেয়ে বাংলাদেশে নেই কেন? বা অন্যান্য মুসলিম দেশে নেই কেন? বাংলাদেশে এখনও মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে মেয়েদের বাধা দেওয়া হয়। অনেক মুসলিম দেশেই মেয়েরা মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েন। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে মেয়েদের পায়ে পায়ে শেকল। এখানে যত বাধা, তত বাধা অন্য কোথাও নেই। কোনও কোনও মসজিদের ভেতর পুরুষের নামাজের এলাকা থেকে দূরে, দেয়ালের ওপারে আলাদা জায়গায়, কখনও কখনও মেয়েরা নামাজ পড়েন বটে, তবে প্রায় সব মসজিদে বড় বড় অক্ষরে নোটিশ টানিয়ে রাখা হয়েছে, ‘মেয়েদের প্রবেশ নিষেধ’। মুসলমান পুরুষদের কাছে মেয়েরা হলো অস্পৃশ্য। সেই ১৪০০ বছর আগে বলা হতো, মসজিদে গিয়ে মেয়েরা নামাজ পড়তেই পারেন, তবে ভালো হয় তাঁরা যদি ঘরে বসে নামাজ পড়েন। ওদিকে আবার এটাও বলা আছে, জামাতে নামাজ পড়লে সওয়াব বেশি। তাহলে মেয়েদের জামাতের সওয়াব নিতে দেওয়া হবে না কেন? মেয়েরা যদি বাংলাদেশের সব মসজিদেই ঢুকতে চান, তবে তাদের ইসলামের কোন আইনে বাধা দেওয়া হয়? কোনও মসজিদের আইনত কোনও অধিকার নেই মেয়েদের মসজিদে যেতে বাধা দেওয়ার। প্রতিটি মসজিদে মেয়েদের নামাজ পড়তে দেওয়া হোক। মেয়েরা নামাজ পড়লে ইমামরা এই যে প্রতিদিন তাদের খুতবায় নারীর বিরুদ্ধে অকথ্য ভাষায় কথা বলেন, তা অন্তত বন্ধ হওয়ার একটি সম্ভাবনা আছে।

যুগের সঙ্গে তাল যে মেলাচ্ছে না মুসলমানেরা তা কিন্তু নয়, শুধু মেয়েদের অধিকারের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে খড়্গহস্ত। মেয়েদের সমানাধিকারের কথা কোরান হাদিসে নেই। মোবাইল ফোন, টিভি, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ফেসবুক ব্যবহারের কথাও তো কোরান হাদিসে নেই। অথচ এগুলো দেদার ব্যবহার করছে মুসলমানেরা। কোরান হাদিসে বরং লেখা আছে, বিধর্মীর সঙ্গে বন্ধুত্ব না করতে। অথচ বিধর্মীর সঙ্গে বন্ধুত্ব ছাড়া জীবন অচল আজকাল। বিধর্মীদের আবিষ্কৃত বিজ্ঞানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল মুসলমানেরা। বিধর্মীকে শত্রু ভাবলে, তাদের আবিষ্কৃত বিজ্ঞান বর্জন করলে আধুনিক জীবন যাপন বাদ দিয়ে প্রাচীন জগতে অথবা অন্ধকার যুগে ফিরে যেতে হবে মুসলমানদের। বিধর্মীদের সঙ্গে শত্রুতা না করা, বরং বন্ধুতা করা- আধুনিক হওয়ার বা সভ্য হওয়ার ছোট একটি পদক্ষেপ মাত্র। আজ কেরালার গ্রামের একটি মেয়ে যদি ইমামতি করতে পারেন, তবে মুসলিম সমাজের আর মেয়েরা পারবেন না কেন? মসজিদে গিয়ে মেয়েদের নামাজ পড়ার অধিকার চাই। ইসলাম সাম্যের কথা বলে- এটি শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। এইবার দেখতে চাই সত্যি সত্যি যে ইসলাম সাম্যের কথা বলে। ইসলাম মেয়েদের মসজিদে নামাজ পড়ায় বাধা দেয় না।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।