শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ জুন, ২০২১ ২২:৪৮

কভিড-১৯ : ভারত ভ্যারিয়েন্টের ভয়

লে. কর্নেল নাজমুল হুদা খান, এমফিল, এফপিএইচ

Google News

করোনাযুদ্ধে বিশ্বব্যাপী হতাহতের নিত্যকার খবর কারোরই অজানা নয়। বিশ্বে এ পর্যন্ত কভিড-১৯-এ আক্রান্ত ১৭ কোটি, মৃত্যু প্রায় সাড়ে ৩৭ লাখ। বাংলাদেশে আক্রান্তের ৮ লাখের ওপর, মৃত্যুও ১৩ হাজার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশে এ যুদ্ধের প্রথম ঢেউ কিছুটা সামলাতেই দ্বিতীয় ঢেউ উপস্থিত হয়। প্রথম দফা ভ্যাকসিন কর্মসূচি শেষ না হতেই আলোচনায় আসে করোনার আরেক শঙ্কা ভারত ভ্যারিয়েন্ট। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় প্রতিদিনই করোনায় নতুন নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর আসছে; সঙ্গে করোনার ভারত ভ্যারিয়েন্টের নামটিও উঠে আসছে জোরেশোরে।

ভারত ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ : ভারত ভ্যারিয়েন্টের শঙ্কা আমাদের দেশে নতুন হলেও এটি শনাক্ত হয় গত বছরের অক্টোবরে ভারতের মহারাষ্ট্র প্রদেশে। একে চিহ্নিত করা হয়েছিল B.1.617 হিসেবে। এ ভ্যারিয়েন্টে স্পাইকের রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইনে দুটি প্রোটিন E484Q এবং L452R-এ মিউটেশন ঘটায় এর নাম দেওয়া হয় ‘ডাবল মিউট্যান্ট’। পরে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরে এ ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়। মার্চে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইডেন; এপ্রিলে বাংলাদেশসহ নেপাল, ইতালি, রাশিয়া; মেতে ফিলিপাইন, ব্রাজিল, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, পাকিস্তানসহ পৃথিবীর প্রায় ৭৩টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রিক অক্ষর অনুসরণে এর একটি অধিকতর সংক্রমণক্ষম শ্রেণির নামকরণ হয়েছে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট (B.1.617.2)। ১১ মে, ২০২১ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা একে ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন (VOC) শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে।

ডাবল মিউট্যান্টের ট্রিপল ক্যাটাগরি : ভ্যারিয়েন্ট কধঢ়ঢ়ধ (Kappa (B.1.617.1) : এ ভ্যারিয়েন্টটি ২০২০ সালের ডিসেম্বরে শনাক্ত হয়। ভ্যারিয়েন্ট Delta (B.1.617.2) : এটিও গত বছর ডিসেম্বরে ভারতে শনাক্ত হয় এবং ইংল্যান্ডের পাবলিক হেলথ অব ইংল্যান্ড (PHE) একে ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন (VOC) গোত্রর্ভুক্ত করে। পরে ১১ মে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এর অনুমোদন দেয়।

ভ্যারিয়েন্ট আন্ডার ইনভেস্টিগেশন (VUI) (B.1.617.3) : অন্য দুটি গোত্রের চেয়ে এর সংক্রমণের গতি মন্থর হওয়ায় তেমনভাবে আলোচনায় স্থান পায়নি।

ভারত ভ্যারিয়েন্টের ঘন ঘন রং পরিবর্তন : এ ভ্যারিয়েন্টের প্রায় ১৩-১৭ বার মিউটেশন ঘটে। এর মধ্যে স্পাইক প্রোটিনে নিম্নোক্ত মিউটেশনগুলো ভাইরাসটির সংক্রমণ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করছে।

D614G : এ প্রোটিনে মিউটেশনের ফলে ভাইরাসের আক্রমণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

E484Q : আক্রান্তের দেহের প্রতিরোধী কোষগুলোকে ফাঁকি দিয়ে আক্রমণের তীব্রতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

L452R : এ স্থানে মিউটেশনের ফলে ভাইরাসের স্পাইকের সঙ্গে আক্রান্তের দেহের এনজিওটেনসিন কনার্ভাটিং এনজাইম-২ (ACE-2) -এর সঙ্গে সংযুক্তির ক্ষমতা বেড়ে যায়। ফলে দেহকোষে সহজে প্রবেশ করতে পারে।

P681R : এটি আক্রান্তের দেহকোষে দ্রুত সংক্রমণে সহায়তা করে।

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ঢের ক্ষমতা : ভারত ভ্যারিয়েন্টের ডেল্টা গোত্রের স্ট্রেইনের সংক্রমণ ক্ষমতা বেশি এবং সহজে আক্রান্তের দেহকোষে প্রবেশ করতে পারে। রোগের তীব্রতা এবং মৃত্যুহারও বাড়াতে সক্ষম এ ভাইরাস। ব্রিটিশ কভিড-১৯ পরামর্শক কমিটির মতে এ ভাইরাসের ৫০% অধিক সংক্রমণ ক্ষমতা রয়েছে এবং একে পরাস্ত করতে ৭ গুণ বেশি অ্যান্টিবডি প্রয়োজন হয়। ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য এ ভ্যারিয়েন্টকেই দায়ী করা হয়। শুধু দিল্লিতেই শতকরা ৬০ ভাগ আক্রান্তের শরীরে এ ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এ ছাড়া অন্ধ্র, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, তেলেঙ্গানাসহ বেশ কটি রাজ্যে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

বাংলাদেশে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট : গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডাটা (জিআইএসএআইডি) এবং আইইডিসিআরের সূত্রমতে করোনা ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে বাংলাদেশেও। যে ভ্যারিয়েন্টের জন্য ভারতের মতো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও হাসপাতালসমূহের করোনা আক্রান্তের ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ার উপক্রম হিসেবে দায়ী করা হয়; বাংলাদেশে সে ভাইরাসের উপস্থিতি রীতিমতো শঙ্কার কারণ। সীমান্তবর্তী জেলাসমূহ বিশেষ করে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর, কুমিল্লা, ঝিনাইদহসহ অন্যান্য জেলার শনাক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি রীতিমতো উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক আইইডিসিআরের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, খুলনা ও গোপালগঞ্জ থেকে সংগৃহীত নমুনার ৫০টির মধ্যে ৪০টিতেই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ভাইরাসের অস্তিত্ব মেলে।

আক্রান্তের মধ্যে মৃত্যুহারও আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি পাচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক ঘোষিত লকডাউন নির্দেশাবলি এবং যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে পরিস্থিতি ভয়াবহতার দিকে মোড় নিতে পারে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্টজনদের মত। স্থলবন্দরগুলোর মাধ্যমে চলা আমদানি/রপ্তানির কাজে ব্যবহৃত যানবাহনের যথাযথ জীবাণুমুক্তকরণ, চালক ও হেলপারদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং কভিড-১৯ প্রটোকল মানার বিষয়ে জোর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

কভিড-১৯ চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোয় সীমান্তবর্তী জেলাসমূহ থেকে আগত আক্রান্তদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া ও আইইডিসিআরের নির্দেশনা মোতাবেক জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে জনগণকে অধিকতর সচেতন করার উদ্যোগ নিতে হবে। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল বা ভারত যে ভ্যারিয়েন্টই হোক না কেন, আতঙ্কিত না হয়ে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই সব ধরনের ভ্যারিয়েন্ট প্রতিরোধ করা সম্ভব।

লেখক : সহকারী পরিচালক কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল।