শিরোনাম
শনিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ টা

বর্তমানে বসে ভবিষ্যৎ রচনা করে চলেছি

শাইখ সিরাজ

বর্তমানে বসে ভবিষ্যৎ রচনা করে চলেছি

১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ, ভালো উৎপাদন ভালো পুষ্টি আর ভালো পরিবেশই উন্নত জীবন’। সারা বিশ্ববাসীই এখন উন্নয়নকে অন্যরকমভাবে দেখছে। কেননা উন্নয়নের তাগিদে অনেক রাষ্ট্রই ভুল পথে অগ্রসর হয়েছে। আমরা যদি ঠিক এ মুহূর্তে পৃথিবীবাসীর খাদ্য ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার হিসাবটা দেখতে চাই, তাহলে দেখতে পাব- জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব বলছে, পৃথিবীর মোট জনগোষ্ঠীর ৪০ ভাগ অর্থাৎ ৩০০ কোটিরও বেশি মানুষের স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে ২০০ কোটিরও বেশি মানুষের ওজন মাত্রাতিরিক্ত। সমস্যা খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বণ্টনে। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে ২০৩০ সালে পৃথিবীর মানুষের স্বাস্থ্য পরিচর্যা ব্যয় পৌঁছাবে ১৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলারে। পৃথিবীতে কৃষি ও খাদ্য সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে এখন যুক্ত ১০০ কোটি মানুষ। যা যে কোনো খাতের চেয়ে বেশি। পৃথিবীর মোট খাদ্যের ৩৩ ভাগের জোগান দিয়ে থাকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা। দারিদ্র্য স্বীকার করে অর্থ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি স্বল্পতাকে সঙ্গে নিয়ে এই অবদান রাখছে তারা। বিশ্বের ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী নারীর মধ্যে ২০ ভাগ রয়েছেন চরম দারিদ্র্যের ভিতর। ১৮ ভাগ আদিবাসী নারী দিনে ২ ডলারের কম উপার্জন করেন। সামগ্রিকভাবে খাদ্য উৎপাদন খাত ৩৩ ভাগ গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী। পৃথিবীতে ১৪ ভাগ খাদ্য নষ্ট হচ্ছে ফসল তোলা, পরিবহন ও সংরক্ষণের ত্রুটিতে। ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্য নষ্ট হচ্ছে ১৭ ভাগ। পৃথিবীর ৫৫ ভাগ মানুষ এখন শহরে বসবাস করছে। ২০৫০ সালে এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৬৮ ভাগে। পৃথিবীর ১৭ ভাগ মানুষ প্রতিনিয়ত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস প্যারাসাইট ও রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাবযুক্ত অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করছে। জলবায়ুর পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত করছে গ্রামীণ দরিদ্র শ্রেণিকে। শুধু ফসলের ফলনই কমছে না, ফসলের ভিটামিন, আমিষসহ প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদান কমিয়ে দিচ্ছে। মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ায় সামগ্রিক প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্যে।

পৃথিবী যখন এ পরিস্থিতির হিসাব কষছে ঠিক তখন বাংলাদেশ বলছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা। পুষ্টিতে অগ্রসরতার কথা। জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের কথা। উচ্চমূল্যের ফল ফসল উৎপাদনে বৈপ্লবিক সাফল্যের কথা। আমাদের প্রাণিজ আমিষ বিশেষ করে মাছ, মুরগি ও ডিম উৎপাদনে রয়েছে অভাবনীয় সাফল্য। বহু প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আমাদের তরুণ উদ্যোক্তারা দেশের খাদ্য ও পুষ্টিবলয় গড়ে তুলছে। প্রচলিত কোনো পরিসংখ্যানে না গিয়েও বলা যায়, আমাদের আবাদি জমি কমছে। মূল খাদ্যশস্যের জমিও কমছে। ঊর্ধ্বমুখী উৎপাদন প্রয়াস শুরু হয়েছে ফসল উৎপাদন, মাছ চাষ থেকে শুরু করে প্রাণিসম্পদ ও দুধ উৎপাদনেও।

আজ এই দৃঢ়তা ধারণ করে বাংলাদেশ। সম্প্রতি শেষ হওয়া জাতিসংঘের ৭৬তম অধিবেশনের একটি অংশে এবার অনুষ্ঠিত হয়েছে ফুড সিস্টেম সামিট। এই বিশ্বসভায় খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্য ব্যবস্থা ও কৃষি নিয়ে ৫ দফা সুপারিশমালা তুলে ধরেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য অধিক খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী একটি ‘স্থিতিশীল খাদ্য ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে একটি বৈশ্বিক জোট ও অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে খাদ্যের অপচয় হ্রাসের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পর্যাপ্ত খাবার পাওয়ার অধিকার একটি মৌলিক অধিকার, যা সব নাগরিকের কল্যাণ ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থার সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব রয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী তাঁর পরামর্শে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি উন্নয়নের জন্য গবেষণা, বিনিয়োগ ও উন্নত প্রযুক্তি বিনিময়ের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা অর্জনের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বর্ধিত তহবিল প্রয়োজন। তিনি টেকসই নিরাপত্তা অর্জনে প্রযুক্তি শেয়ারিংসহ জলবায়ুজনিত চরম ইভেন্টগুলোর সঙ্গে অভিযোজনের জন্য প্রতিশ্রুত তহবিল ছাড়েরও পরামর্শ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি আমরা সবার জন্য মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করতে আমাদের প্রচেষ্টা জোরদার করেছি।’ খাদ্যই প্রাণীর জীবনধারণের পূর্বশর্ত। সব প্রাণীকেই খেতে হয়। সৃষ্টির সেরা হিসেবে মানুষের খাদ্য ব্যবস্থার সঙ্গে কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সমাজ, রাষ্ট্র তথা সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থার গভীর যোগাযোগ রয়েছে। সেই জাতি সবচেয়ে উন্নত, যাদের খাদ্য শৃঙ্খল ও ব্যবস্থাপনা সুগঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিত। গত দুই দশক ধরে পৃথিবীর সবকটি মহাদেশের খাদ্য ও জীবন-জীবিকার গভীরে গিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। শুধু কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের হিসাবই নয়, দেখার সুযোগ হয়েছে জীবনবৈচিত্র্যের নানা চিত্র। জাপান, চীন, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনের খাদ্যবৈচিত্র্যের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার যেমন মিল নেই, একইভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার খাদ্যবৈচিত্র্যের মধ্যে নেই বিন্দুমাত্র সাযুজ্য। ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্যগত ভিন্নতা। কেউ প্রাণিজ আমিষে জোর দিচ্ছে, কেউ সবজির শক্তিকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। খাদ্যবৈচিত্র্যে আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে বেশ ভিন্নতা দেখেছি। যেমন পূর্ব আফ্রিকার দ্রুত অগ্রসরমান দেশ রুয়ান্ডা আয়রন বিনকে প্রধান খাদ্য হিসেবে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, পার্শ¦বর্তী দেশ উগান্ডা প্রধান খাদ্য হিসেবে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে মাটুকে বা কলাকে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে খাদ্য ও পুষ্টির প্রশ্নে প্রতি বছরই সরকারের নীতি পরিকল্পনা হালনাগাদ করা হয়।

খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে দুই ধরনের চিন্তা রয়েছে। প্রথম, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। দ্বিতীয়ত, পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্যের ভাবনা। আজকের দিনে এই ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাদ্যের অপচয় রোধ ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়। এবার বিশ্ব খাদ্য দিবসে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটই বেশি আলোচিত। বিশ্বব্যাংক বিগত ৪৪ বছরের জলবায়ু পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট প্রস্তুত করেছে। তারা বলছে, বাংলাদেশে ২০৫০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা বাড়বে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃষ্টিপাত বাড়বে ৭৪ মিলিমিটার। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে স্বাস্থ্য খাতে। ৩ হাজার ৬০০ খানা ও ১৫ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, শুষ্ক মৌসুমে বাড়বে সংক্রামক ব্যাধি, বর্ষা মৌসুমে ২৬ শতাংশ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির প্রভাব হিসেবে বাড়বে শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ। দেখা যায়, ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়লে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ পড়বে শ্বাসজনিত নানা রোগের কবলে, ১ ভাগ আর্দ্রতা বাড়লে শ্বাসজনিত রোগে পড়তে পারে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ। সব মৌসুমেই মানুষের হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে। ঢাকা শহরের উষ্ণতা ও তাপমাত্রা বাড়ছে। বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রভাব। ফেব্রুয়ারির মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টি এবং মার্চ-জুলাইয়ের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বাড়িয়ে তুলছে ডেঙ্গুর প্রভাব। ১৯৮০ থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে আধা ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বেড়েছে। বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। আমাদের গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বাড়ছে শীত হয়ে উঠছে উষ্ণ আর বর্ষা হয়ে উঠছে দীর্ঘ ও অনিয়মিত। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বৃষ্টিপাত বাড়ছে। সার্বিক পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য হয়ে পড়ছে কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের কৃষি ও জীবনবৈচিত্র্যের দিকে পরিকল্পিত দৃষ্টি প্রয়োজন। গত কয়েক বছর নগরে কৃষি সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা চলছে আমাদের। নাগরিকরা উৎসাহিত হচ্ছেন কৃষি অনুশীলনে। তারা সচেতন কৃষি, নিরাপদ খাদ্য তথা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলোতে। বিশ্ব ব্যবস্থা ও স্থানীয় বাস্তবতা, সব দিক বিবেচনায় কৃষির প্রতি আমাদের সমন্বিত মনোনিবেশ একটি সুশৃঙ্খল খাদ্যবলয় গড়ে তুলতে পারে। উৎপাদন ও বাণিজ্যে এখন বড় উদ্যোক্তা ও বড় বিনিয়োগ যুক্ত হতে শুরু করেছে। এখানে ভারসাম্যপূর্ণ একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। যাতে আমাদের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা টিকে থাকতে পারে। অন্যদিকে কৃষিতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে আনা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে শুদ্ধতা অনুসরণ করা এবং সব মানুষের পুষ্টি নিশ্চয়তায় একটি নির্দিষ্ট খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করা প্রয়োজন। যা যে কোনো শ্রেণির জন্য সহজে অনুসরণযোগ্য হয় এবং হয়ে ওঠে সর্বজনীন। আমাদের আজকের প্রস্তুতি ও উদ্যোগই হতে পারে আগামীর বুনিয়াদ।

লেখক : মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।  

[email protected]

সর্বশেষ খবর