শিরোনাম
রবিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

বিশ্বনবীর নির্দেশনার স্বরূপ বুঝতে হবে

আল্লামা মাহ্মূদুল হাসান

সঠিক জ্ঞানের অভাবেই মানুষ কবরে গাছের ডাল প্রোথিত করে কবরস্থ ব্যক্তির নাজাত কামনা করে। একই আকিদায় কবরে ফুল ছড়ায়, গিলাফ দেয়, আরও কত কিছু করে। তারা মনে করে গাছের ডাল ও ফুলের জিকিরের বরকতে কবরের আজাব দূর হয়ে যায় বলেই তো রসুল (সা.) দুজনের কবরে নিজ হাতে বৃক্ষশাখা প্রোথিত করে বলেছিলেন, ডালগুলো শুকানোর আগেই কবরস্থ ব্যক্তিদ্বয়ের কবরের আজাব দূর হয়ে যাবে। ডাল-ফুলের জিকিরের এই বরকত! সুতরাং এরূপ করা নেক আমল হবে না কেন?

এ তো এমন হলো, যেমন জাহেলি যুগে লোকেরা হজ করতে এসে উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করত আর বলত, আমাদের কাপড় সন্দেহজনক, এতে হারাম অর্থ লেগেছে কি না আমাদের জানা নেই। তাই এরূপ কাপড় পরিধান করে আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ করা গুনাহের কাজ এবং বেয়াদবি। এই বলে তারা উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করত। অথচ উলঙ্গ হওয়া তথা ফরজ তরক করা যে হারাম তা তারা বুঝেও বুঝত না। এরূপ সীমা লঙ্ঘন এবং গর্হিত কাজ অজ্ঞতা ও মূর্খতার পরিণাম। মোট কথা, দুজনের একজনের আজাবের কারণ ছিল পেশাবের ব্যাপারে তার অসতর্কতা। দ্বিতীয়জনের আজাবের কারণ ছিল কূটনামি। সে একজনের কথা আরেকজনের কাছে বলে বেড়াত; কানকথা বলে ও গিবত করে মানুষের মধ্যে ঝগড়া-কলহ সৃষ্টি করত, লোকজনকে গালিগালাজ করত। হাদিসে আছে, ‘গালিগালাজ করা ফাসিকি আর কতল করা কুফরি।’ আর এক হাদিসে গিবতকে জিনার চেয়ে বড় গুনাহ বলা হয়েছে। হাশরের বিচারের পর দেখা যাবে অনেক বক্তা, ওলামা-মাশায়েখ ও পীরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। লোকেরা প্রশ্ন করবে হুজুর! আপনার ওয়াজ-নসিহত শুনে আমল করে আমরা জান্নাতি হয়েছি। কিন্তু আপনার এ বিপদ কেন? উত্তরে বলবে, আমরা গিবত-কূটনামিতে অভ্যস্ত ছিলাম, এগুলো শুনতে পছন্দ লাগত, তৃপ্তিবোধ হতো, এরই প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে আজ আমরা জাহান্নামি। যদি গিবত শোনার এই শাস্তি হয় তাহলে যারা হামেশা গিবত-কুৎসা রটায় এবং অশ্লীল কথাবার্তায় লিপ্ত থাকে তাদের কী অবস্থা হবে? আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘এরা কূটনামি করে, মানুষের ভালো কাজে বাধার কারণ হয়। অন্যের উন্নতি দেখলে জ্বলেপুড়ে মরে, এরা চরম পাপাচারী ও সীমা লঙ্ঘনকারী।’ হজরত থানভি (রহ.) বলেন, গিবত আজ ঘি-ভাতে পরিণত হয়েছে। আর আমি বলি যে ঘি-ভাত অনেকেই পায় না, অনেকেই খায় না; আবার অধিক খেলে পেটে রোগ দেখা দেওয়ার কারণে খাওয়া থেকে বিরত থাকে; কিন্তু গিবত এত রুচিকর খাদ্য যে সবাই খায় এবং অধিক পরিমাণে খায়। এর পরিণাম যে কত ভয়াবহ কেউ অনুভব করে না। দ্বিতীয় লোকটি এ কাজে লিপ্ত থাকত যে কারণে কবরে আজাব হচ্ছিল।

ওই দুই ব্যক্তি হয়তো বা কোনো বিশেষ নেক আমলের অধিকারী ছিল, তাই ভাগ্যগুণে বিশ্বনবীর চলার পথে এ কবর দুটি সামনে পড়ে এবং তিনি কবরস্থ ব্যক্তিদ্বয়ের আজাবের ব্যাপারে অবহিত হন। তিনি ছিলেন দয়ার সাগর রহমাতুল্লিল আলামিন। তাই তিনি আল্লাহর দরবারে লোক দুটির নাজাত কামনা করেন। পরিণামে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন। ক্ষমা ও মুক্তির নিদর্শনস্বরূপ রসুল (সা.) উভয়ের কবরে একটি করে খেজুরের ডাল প্রোথিত করে দেন। অতএব ডালের জিকিরের কারণে অথবা ডালের বরকতে কবরের আজাব বন্ধ হয়েছে উক্তি মোটেই সঠিক নয়। কেননা যদি ডালের জিকিরের বরকতে আজাব-মুক্তির কথা বলা হয়, তাহলে প্রশ্ন হয় জিকিরের জন্য কাঁচা ডালের প্রয়োজন কি ছিল, শুকনো ডালও তো জিকির করে? ডালের জিকির আর ডালের বরকত কি বিশ্বনবীর মুনাজাত এবং বিশ্বনবীর জাতের তুলনায় অধিক হতে পারে? এরূপ উক্তি নবীর সঙ্গে বেয়াদবি এবং অবমাননা নয় কি?

লেখক : আমির, আল হাইআতুল উলয়া ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ।

সর্বশেষ খবর