ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছে এই ধরায় নুরের রশ্মি নিয়ে। নুরের আলোয় আলোকিত করে রহমতের নবীর শুভ আগমন। নুরানি হয়ে আগমন করায় পুরো জাহান ধন্য। তাঁরই শুভ আগমনে আকাশ ও বাতাসে ধ্বনিত হলো আহলান ছাহলান, মারহাবান। মা আমেনার কোল আলোকিত করেন রহমাতুল্লিল আলামিন। সারা জাহানের জন্য রহমত প্রিয় মুহাম্মদ (সা.)। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে নবী আমি আপনাকে রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি।’ সুরা আম্বিয়া : ১০৭।
ঘুম ভাঙেনি কুরাইশদের, মরুর বুকে সূর্যও জেগে ওঠেনি, ভোরের বাতাস বইছে আমেনার ঘরে। সুবহে সাদিকের সময় রূপের নুরানি চেহারায় আগমন প্রিয় নবীর। নবীজির মা আমেনা বলেন, ‘তার আগমনের পরমুহূর্তে একটা নুর প্রকাশিত হলো। সেই আলোতে পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের সবকিছু আলোকিত হয়ে যায় এবং এই আলোতে সিরিয়ার শাহি মহল আমি দেখতে পাই।’ (বায়হাকি ও দালায়েলুন নবুয়ত)
সৃষ্টিকুলের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, আল্লাহর প্রিয় হাবিব, সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবীর শুভ পা মোবারক প্রথম পৃথিবীর জমিনে স্পর্শ করায় পুরো জমিন পবিত্র করেছেন স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। জমিনে সিজদাহর সঙ্গে সঙ্গেই প্রিয় নবীর অসিলায় কবুল করবেন বান্দাহর মনের বাসনা। নবীজির আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহর পবিত্র ঘর কাবা শরিফ মাকামে ইবরাহিমের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। এই দৃশ্য দাদা আবদুল মুত্তালিব দেখতে পেয়েছিলেন। নবীজি খুব সম্মানিত হওয়া খতনা অবস্থায় আগমন করেছেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমি আমার রবের কাছ থেকে সম্মানিত যে আমি খতনা অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছি। আমার লজ্জাস্থান কেউ দেখেনি।’ (তাবারানি আওসাত)
জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূরীভূত করে নুরের আলো নিয়ে অন্যকে ক্ষমা, মেহমানদারি, ত্যাগ, আন্তরিকতা ও সততা দেখিয়ে, সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার ও ওয়াদা পালন করে, ধার্মিকতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সংযম হয়ে, নম্রতা, বিনয়, দয়া, সহমর্মিতার মধ্যমে সব ধরনের অপরাধ নির্মূল, কুসংস্কার, গোঁড়ামি, অন্যায়, অবিচার ও দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়ার জন্যই তাঁর আগমনের মূল কারণ। প্রিয় নবীজির শুভ আগমন সম্পর্কে আলোচনার মাধ্যমে সওয়াব অর্জন ও ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রিয় নবীর আগমনে খুশি হলে নবীও খুশি হবেন। কঠিন বিপদেও সুপারিশ করবেন। আল্লামা জালালুদ্দিন সূয়ুতী তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হজরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত। একদা রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু আমের (রা.)-এর বাসায় উপস্থিত হয়ে দেখলেন, তিনি তাঁর সন্তানাদি, আত্মীয়স্বজন, জাতি-গোষ্ঠী, পাড়া-প্রতিবেশীদের রসুলের মিকাদের ঘটনাসমূহ শোনাচ্ছিলেন এবং বলছিলেন, এদিন প্রিয় নবী আগমন করেছেন। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ রহমতের দরজা তোমাদের জন্য খুলে দিয়েছেন ও সব ফেরেশতা তোমার জন্য ক্ষমা চাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, যে তোমার মতো এরূপ কাজ করবে, সেও নাজাত পাবে। (সবুলুল হুদা ফি মাওলিদিল মুস্তাফা, আত তানবীর ফি মাওলিদিল বাশির ওয়ান নাজির)
প্রিয় নবীর শুভ আগমনে শয়তান ছাড়া সবাই খুশি। প্রিয় নবীর শুভ আগমনে যেভাবে এই ধরণি সেজে আনন্দে মাতোয়ারা হয়েছিল। আশেকে রসুলরাও নবীর আগমনে আনন্দিত হয়ে রেজামন্দি হাসিলের চেষ্টা করেন। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘বলুন, এটা আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর দয়ায়; কাজেই এতে তারা যেন আনন্দিত হয়। তারা যা পুঞ্জীভূত করে তার চেয়ে এটা উত্তম।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৫৮)
তাফসিরে মাজহারিতে মুসলিম, আবু দাউদ ও নাসায়ির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রবিয়া বিন কাব আসলামীকে (রা.) একদিন রসুল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে রবিয়া! তোমার কোনো ইচ্ছা থাকলে আমাকে বল। আমি দোয়া করব। তুমি যা চাইবে তাই পাবে।’
রবিয়া মনে মনে ভাবলেন, এই তো সুযোগ। পরম কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি চেয়ে ফেলি। ‘ওগো নবী আমার! আমি আপনার পাগল। আপনাকে একমুহূর্ত না দেখে থাকতে পারি না। আপনি দোয়া করেন আমি যেন জান্নাতেও আপনার কদমে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারি।’
নবীজি বলেলেন, ‘হে রবিয়া ভেবে বল এটাই কি তোমার চাওয়া?’
রবিয়া বলল, ‘জি হুজুর! এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো চাওয়া হতে পারে না।’
নবীজি মুচকি হেসে বললেন, ‘তাহলে বেশি বেশি সেজদা কর যেন তোমার জন্য আমি সুপারিশ করতে পারি।’ (তাফসিরে মাজহারি, ৩য় খণ্ড, ১৬৬ পৃষ্ঠা।)
লেখক : ইসলামিক গবেষক