শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২১:৪৩

সরকারি তহবিল এখনো না পাওয়ায় ক্ষোভ

ঠেকানো যাচ্ছে না সিনেমা হল ভাঙা

আলাউদ্দীন মাজিদ

ঠেকানো যাচ্ছে না সিনেমা হল ভাঙা
এবার হাতুড়ি পড়ল বগুড়ার ‘সিকতা’য়

সিনেমা হলের উন্নয়নের জন্য সরকারি তহবিল গঠনের ঘোষণার পরও থামছে না সিনেমা হল বন্ধ হওয়া। সবশেষ এখন ভাঙার কাজ চলছে বগুড়ার ধুনটের ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল ‘সিকতা’। এর আগে গত ডিসেম্বরে বন্ধ হয় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল ‘আলমাস’ ও ‘দিনার’। গত বছরের অক্টোবরে ভাঙার কাজ শুরু হয় রাজধানীর ‘রাজমণি’ সিনেমা হল। এভাবে সারা দেশেই দুঃখজনকভাবে সিনেমা হল ভাঙা চলছেই। প্রদর্শক সমিতির হিসেবে দেশে বর্তমানে সিনেমা হলের সংখ্যা মাত্র ৬০টির মতো। ২০০০ সালের দিকেও এই সংখ্যা ছিল ১৪০০।

কেন সিনেমা হল ভাঙছেন, সিনেমা হল মালিকদের কাছে এমন প্রশ্ন রাখতেই তাদের ক্ষোভ ঝরা জবাব, আর কত লোকসান গুনব? আমরা তো পথে বসে গেছি। মানসম্মত ও পর্যাপ্ত ছবির অভাবে দর্শক নেই। অথচ প্রতি মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ট্যাক্স, বিদ্যুৎ ও পানির বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। ব্যাংকের লোনও অনেককে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এভাবে আর কতদিন চালানো যায়। সরকার তো শুধু ঘোষণা দিয়েই শেষ। এর আগে সিনেমা হলে সরকারি উদ্যোগে প্রজেক্টর স্থাপনের কথা বলা হলেও দীর্ঘ কয়েক বছর কেটে গেছে, প্রজেক্টরের দেখা নেই।

৬৪ জেলায় সরকারি উদ্যোগে সিনেপ্লেক্স স্থাপনের কথা থাকলেও সেটি কয়েক বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। সবশেষ গত বছরের অক্টোবরে বন্ধ সিনেমা হল চালু, সংস্কার ও নতুন সিনেমা হল তৈরিতে স্বল্প সুদে দীঘমেয়াদে এক হাজার কোটি টাকার ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার। অথচ পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও সেই ঘোষণা বস্তবায়নের দেখা নেই। গত বছরের ৪ অক্টোবর সচিবালয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা, গবেষক ও প্রশিক্ষকদের সঙ্গে এক বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সিনেমা হলের জন্য সরকারি এ তহবিলের কথা জানান।

বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা আশা করছি, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সিনেমা শিল্পে বিরাট পরিবর্তন আসবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হল চালু, চালু হলগুলো সংস্কার ও আধুনিকায়ন করাসহ অনেক নতুন সিনেমা হল গড়ে উঠবে দেশে।

এরপর গত ২৬ জানুয়ারি একনেকের বৈঠকে বলা হয়, সিনেমা হল বাঁচাতে বিশেষ তহবিল গঠন করতে চায় সরকার। এ তহবিল থেকে ঋণ পাবেন সিনেমা হল মালিকরা। বিশেষ তহবিল গঠনের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এ কথা জানান। একনেক সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, দেশের বহু সিনেমা হল পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সিনেমা হলের মালিকরা হলগুলো পুনর্বাসনে ঋণ চান। সিনেমা হলগুলো পুনরায় বাঁচাতে আর্থিক সহায়তা দিতে বিশেষ তহবিল গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে প্রদর্শক সমিতির কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত এ ঘোষণা বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ এখনো দেখতে পাচ্ছি না। এতে সিনেমা হল মালিকরা চরম হতাশ। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মিয়া আলাউদ্দীন বলেন, তহবিলের বিষয়টি ঝুলে আছে। এ ব্যাপারে ক্লিয়ার কনসেপ্ট সরকারের পক্ষ থেকে না পাওয়ায় সিনেমা হল মালিকদের আশ্বস্ত করে বলতে পারছি না যে, আপনারা সিনেমা হল বন্ধ  করবেন না। অন্যদিকে, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত দেশীয় ছবির অভাব পূরণে ভারতীয় হিন্দি ও বাংলা ছবি একসঙ্গে এ দেশে মুক্তির অনুমতি দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা হয়নি। গত বছর চলচ্চিত্রকারদের তথ্যমন্ত্রী এক বৈঠকে বলেন, চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক ও প্রদর্শক সমিতি একমত হয়ে যদি আবেদন করে তাহলে অবশ্যই এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দেবে সরকার। মন্ত্রীর এই আশ্বাসের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত তিন সমিতি কোনো যৌথ আবেদন জমা দিতে পারেনি। মিয়া আলাউদ্দীন বলেন, প্রদর্শক ও প্রযোজক সমিতি আবেদনপত্র তৈরি করলেও পরিচালক সমিতি এখনো আবেদনপত্র দেয়নি। জানা গেছে, আগামী সোমবারের মধ্যে পরিচালক সমিতি আবেদনপত্র জমা দিতে পারে। মিয়া আলাউদ্দীন বলেন, বিদেশি ছবি পেলেও সিনেমা হল মালিকদের অনুরোধ করতে পারতাম সিনেমা হল বন্ধ বা না ভাঙার জন্য।

এদিকে বগুড়ার ধুনটের ঐতিহ্যবাহী সিকতা সিনেমা হল ভেঙে ফেলা হচ্ছে, আর্থিক সংকটের কারণেই ভাঙা হচ্ছে ২৮ বছরের পুরনো এই সিকতা। একসময় বগুড়া জেলায় সিনেমা হল ছিল ৩৮টি। বর্তমানে আছে ৭টি। মিয়া আলাউদ্দীন জানান, সর্বশেষ এখানে ৩টি সিনেমা হল ক্লিওপেট্রা, ঝংকার ও সিকতার অস্তিত্ব ছিল, এখন নেই। সিনেমা হলগুলো বন্ধ। সিকতাসহ গত ১০ বছরে বগুড়া জেলায় বন্ধ হয়ে গেছে ৩১টি সিনেমা হল। গত মঙ্গলবার থেকে ২৮ বছরের পুরনো সিকতা হল ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে বিপণিবিতান গড়ে তোলা হবে। শুধু বগুড়া শহরেই ছিল ১০টি সিনেমা হল। এখন জেলায় সিনেমা হলের সংখ্যা ৭। তবে এগুলো বন্ধ। জেলা শহরে আছে দুটি সিনেমা হল। তা-ও চালু নেই। সিকতার যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৩ সালে। অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য এস এম শাহাদৎ হোসেন ধুনট শহরের অফিসারপাড়ায় ১০ শতক জায়গার ওপর সিকতা সিনেমা হল চালু করেন। এই হলে প্রথম প্রদর্শিত হয় সালমান শাহ-শাবনূর অভিনীত ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ চলচ্চিত্রটি। ৬৫০ আসনের এ সিনেমা হলটি একসময় হাউসফুল থাকত।

সিকতা সিনেমা হলের বর্তমান মালিক জাকির হোসেন বলেন, সিনেমা হল ব্যবসায় দর্শক-খরার শুরু ২০০৮ সালে। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাধ্য হয়ে হল ভেঙে বিপণিবিতান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ভালো গল্পের ছবি নেই, ছবিতে নেই ভালো সংলাপ, নেই ভালো গান ও অভিনয়। ২০১৮ সাল থেকে শুধু ঈদ উৎসবে চালু রাখা সম্ভব হয় সিনেমা হলটি। সর্বশেষ ২০১৯ সালের পবিত্র ঈদুল ফিতরে প্রদর্শিত হয় বেপরোয়া ছায়াছবি।

এতে তাকে প্রায় আড়াই লাখ টাকা লোকসান

গুনতে হয়েছে। সিনেমা হলের পুরনো মাল নিলামে বিক্রির জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলেন। মাত্র চার লাখ টাকায় তা বিক্রি করতে পেরেছেন। সিকতার অনেক আগে থেকেই বন্ধ ক্লিওপেট্রা ও ঝংকার। ঝংকার সিনেমা হলের মালিক মো. ঈসা খান বলেন, ১৯৮৪ সালে উজ্জ্বল-শাবানা অভিনীত ‘নসিব’

ছায়াছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে ঝংকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ৬৫০ আসনের এই সিনেমা হলটিও হাউসফুল ব্যবসা করত। ২০১২ সালের পর টানা দর্শক-খরা চলে। এরপর শুধু ঈদ উৎসবকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে এটিতে ছায়াছবি প্রদর্শন। করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরের মার্চ থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে

যায় সিনেমা হলটি।

 


আপনার মন্তব্য