Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:১০

ভবন ভাঙা দৃষ্টান্ত

জিন্নাতুন নূর

ভবন ভাঙা দৃষ্টান্ত
স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন

রাজধানীর হাতিরঝিলে বিজিএমইএর অবৈধ ভবনটি ভাঙার মধ্যে এক ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে যাচ্ছে। আর এ কাজের মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হবে যে, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় এ ধরনের অন্যায় কাজের প্রতিবাদ জানিয়ে তার বিচার পাওয়া যায়। দেশের দুই প্রধানমন্ত্রী এ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ও ফাউন্ডেশন কাজের উদ্বোধনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। অথচ এ ভবনটির নির্মাণ বেআইনি ঘোষণা করে বিচারালয় তা ভাঙার নির্দেশ দিয়েছে এবং তা কার্যকর করছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বিরাট কাজ। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গতকাল স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন এসব কথা বলেন। তবে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন হতে যাচ্ছে তা এই স্থপতির কাছে অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, পোশাকশিল্প মালিকরা এ ভবনটি হারানোর মধ্য দিয়ে নিজেদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করছেন কিন্তু এ ভবনটি অবৈধভাবে হাতিরঝিলে নির্মাণে যারা বিজিএমইএর সহযোগী ছিলেন, যারা বিভিন্নভাবে অসত্য তথ্য দিয়ে এ ভবনটি নির্মাণের জন্য সহযোগিতা করেছেন, আমি ধরে নিতে পারি সেই সহযোগীদের মধ্যে রাজউকের কিছু কর্মকর্তা ছিলেন। এ ভবনটি নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে ভুল হয়েছিল তা কোনো বিচার-বিবেচনায় আনা হয়নি। কারণ রাষ্ট্রের দুই প্রধানমন্ত্রীকে এ অবৈধ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও ফাউন্ডেশন কাজ উদ্বোধনের সময় নিয়ে আসা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কিছু লোক অসত্য, অসম্পূর্ণ ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীকে এ স্থানে নিয়ে আসেন। এ লোকগুলোর কিন্তু বিচার হয়নি। এমনকি উচ্চ আদালত, সুপ্রিম কোর্ট কোথাও রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীকে যে মিথ্যা তথ্য দিয়ে এ স্থানে নিয়ে এসে একটি অবৈধ স্থাপনার উদ্বোধন করালেন তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে বিচারের কোনো জায়গায় বলা হয়নি। আমি মনে করি এ কাজগুলো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। বিজিএমইএকে নিজেদের ভুলের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে কিন্তু এ ভুল কাজের সঙ্গে তথ্য গোপন করে এবং মিথ্যা বলে দুই প্রধানমন্ত্রীকে যারা সম্পৃক্ত করেছিলেন তাদের বিচার এখনো হয়নি। আবার এ ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী, রাজউকের চেয়ারম্যান ও মন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তারা কেউই প্রধানমন্ত্রীদের এ তথ্যটি জানাননি যে, রাজউকের দৃষ্টিতে এটি একটি অবৈধ ভবন আর এর উদ্বোধন করা ঠিক হবে না। এই যে অসম্পূর্ণ বিচারকাজ, একতরফাভাবে বিজিএমইএ শুধু শাস্তি পেল কিন্তু অবৈধ এ স্থাপনার নির্মাণকাজ যারা শুরুতেই বন্ধ করতে পারতেন তারা কিন্তু বেঁচে গেলেন। তাই এ অসম্পূর্ণ বিচার আমাকে কষ্ট দেয়। কারণ ভুল করেও বেঁচে যাওয়া এই মানুষগুলো ভবিষ্যতেও একই ধরনের কাজ করতে থাকবেন। কারণ তারা ক্ষমতা রাখেন রাষ্ট্রের দুই প্রধানমন্ত্রীকে প্রতারিত করার। এজন্য আমি মনে করি এই ব্যক্তিদের বিচারও শুরু করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে কর্মরত সরকারি বেতনভুক যে কর্মকর্তারা মিথ্যা বলে সেখানে প্রধানমন্ত্রীদের নিয়ে গিয়েছিলেন এবার তাদের বিচার শুরু করা হোক। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রীকে এ ধরনের কাজে সম্পৃক্ত করার আগে সংশ্লিষ্টরা সে সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে বাধ্য থাকবেন। আর এই ব্যক্তিদের আমরা যদি বিচার না করি তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। মোবাশ্বের হোসেন বলেন, এ ভবনটি ম্যানুয়ালি ভাঙা যেতে পারে আবার বিস্ফোরক ব্যবহার করেও ভাঙা যেতে পারে। দুনিয়ার উন্নত দেশে অল্প সময়ের মধ্যে ভবন ভাঙার জন্য বিস্ফোরক অর্থাৎ ডিনামাইট ব্যবহার করা হয়। সাধারণত যখন বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটানো হয় তখন একটি ভবন এক জায়গা থেকেই ভাঙতে শুরু করে। কিন্তু বিস্ফোরক যদি সঠিক স্থানে স্থাপন করা না হয় তাহলে ভবনটি একপাশ বরাবর বা রাস্তার ওপর পড়তে পারে। আর যদি ম্যানুয়ালি ভাঙা হয় তাহলে ভবন তৈরির জন্য যেমন প্রকৌশলীর প্রয়োজন হয়েছিল একইভাবে এটি ভাঙার ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীর প্রয়োজন পড়বে। এর আগে যখন তেজগাঁওয়ের র‌্যাংগস ভবন ভাঙা হয় সস্তায় কাজ করানোর জন্য জাহাজভাঙা শ্রমিকদের দিয়ে তা ভাঙা হয়েছিল। তবে জাহাজ ভাঙা, গাছ কাটা ও ভবন ভাঙা কিন্তু এক নয়। এটি বুঝতে হবে যে এক তলা ভবন ভাঙা আর ১৫ তলা ভবন ভাঙা এক বিষয় নয়। যদি সাধারণ কন্ট্রাক্টরকে দিয়ে এ ভবন ভাঙা হয় সে ক্ষেত্রে র‌্যাংগস ভবনের মতো আবারও দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকবে।

তিনি আরও বলেন, এ ভবনটি ভাঙা হয়ে গেলে সেখানে ভবিষ্যতে আর কোনো স্থাপনা তৈরির প্রশ্ন আসে না। কারণ এ ভবন নির্মাণের পর হাতিরঝিলের পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। যার জন্য পরে এ ভবনের সামনে দিয়েই পানিপ্রবাহের জন্য কালভার্ট তৈরি করা হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের জলাশয় ও উন্মুক্ত খেলার মাঠ সংরক্ষণ বিষয়ে যে আইন রয়েছে সে আইনের আলোকে জায়গাটি বিজিএমইএর নিজস্ব জায়গা হলেও তারা এর কোনো পরিবর্তন করতে পারেন না। কিন্তু স্থাপনাটি তৈরির মাধ্যমে হাতিরঝিলের পানিপ্রবাহ ঠিকই পরিবর্তন করা হয়। আমি মনে করি হাতিরঝিলের এ অংশটিকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর করে গড়ে তুলে সেখানে সাধারণের বসার ব্যবস্থা করে দেওয়া উচিত।


আপনার মন্তব্য