শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ অক্টোবর, ২০২০ ২৩:১৯

নৌ পরিবহন শ্রমিকদের ২ হাজার টাকা করে দেবে তিন শিল্প গ্রুপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

নৌ পরিবহন শ্রমিকদের ২ হাজার টাকা করে দেবে তিন শিল্প গ্রুপ
বেতন-ভাতার সুযোগ-সুবিধাসহ ১১ দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য নৌ ধর্মঘট শুরু করেছে নৌযান শ্রমিকরা। ফলে সার, রড, সিমেন্ট, পাথর, কয়লাসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আটকা পড়েছে অর্ধশতাধিক নৌযান। ছবিটি গতকাল দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ নদী বন্দর থেকে তোলা -বাংলাদেশ প্রতিদিন

নৌ শ্রমিকদের প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা করে খোরাকি ভাতা দেবে দেশের তিন শিল্প গ্রুপ। বসুন্ধরা, সিটি ও আবুল খায়ের গ্রুপের পক্ষ থেকে গতকাল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান। তিনি গতকাল জানান, এই তিন শিল্প গ্রুপ তাদের জাহাজের শ্রমিকদের প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা খোরাকি ভাতা দেবে।

এদিকে ১১ দফা দাবিতে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য পণ্য পরিবহন বন্ধ রেখেছেন নৌযান শ্রমিকরা। ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের বহির্নোঙর এবং বিভিন্ন ঘাটে অবস্থানরত জাহাজ থেকেও পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ধর্মঘট পালন করার ওপর নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও রিট মামলায় খোরাকি ভাতার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সব পক্ষকে মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে। শ্রমিকরা তা উপেক্ষা করে ধর্মঘট করছে।

এদিকে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক বলেছেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আমাকে জানিয়েছেন, জাহাজের শ্রমিকদের জন্য মাসে দুই হাজার টাকা খোরাকি ভাতা দিতে তারা রাজি আছেন। সিটি গ্রুপ ও আবুল খায়ের গ্রুপও একইভাবে মাসিক খোরাকি ভাতা দুই হাজার টাকা করে দেবে বলে জানিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘শ্রমিকরা তো চাইছিল সব জাহাজের জন্য। কিন্তু তারা জানিয়েছেন, আমরা আমাদের জাহাজের শ্রমিকদের খোরাকি ভাতা দিয়ে দেব।’

বিআইডব্লিটিএর চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, ঠিক আছে শ্রমিকরা চাইছে আমরা এটা দিয়ে দিই।’ তিনি বলেন, ‘এটা একান্তই তাদের কোম্পানির সিদ্ধান্ত। কারণ আন্দোলন হলে তো তাদের জাহাজও চলতে দেবে না। এ জন্যই আমি তাদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম।’

নৌযান শ্রমিকরা ১১ দফা দাবিতে সোমবার মধ্যরাত থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডাকায় পণ্য পরিবহন বন্ধ রয়েছে। ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের বহির্নোঙর এবং বিভিন্ন ঘাটে অবস্থানরত জাহাজ থেকেও পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহ আলম জানিয়েছেন, মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে সমাধান না আসায় পূর্বঘোষণা অনুযায়ী সোমবার মধ্যরাত থেকে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, মোংলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট-বড় মিলিয়ে ২০টি পণ্যবাহী নৌযান এই ধর্মঘটের আওতায় রয়েছে। প্রায় দুই লাখ শ্রমিক আমাদের এ ধর্মঘটে রয়েছেন। সকাল থেকে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও স্লোগানে স্লোগানে তারা কর্মসূচি পালন করছেন।’

এদিকে দেশের তিনটি বড় শিল্প গ্রুপের বাইরে অন্য মালিকদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ধরনের আশ্বাস পাননি নৌযান শ্রমিকরা। জানা গেছে, ১৩ অক্টোবর রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম অধিদফতরের সামনে নৌ শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ ঐক্য পরিষদের মানববন্ধন থেকে ১১ দফা দাবিতে এই ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছিল। তাদের ১১ দফা দাবি হচ্ছে, বাল্কহেডসহ সব নৌযান ও নৌপথে চাঁদাবাজি-ডাকাতি বন্ধ করা; ২০১৬ সালে ঘোষিত গেজেট অনুযায়ী নৌযানের সর্বস্তরের শ্রমিকদের বেতন প্রদান; ভারতগামী শ্রমিকদের ল্যান্ডিং পাস এবং মালিক কর্তৃক খোরাকি ভাতা প্রদান; সব নৌযান শ্রমিকের সমুদ্র ও রাত্রিকালীন ভাতা নির্ধারণ; এনডোর্স, ইনচার্জ, টেকনিক্যাল ভাতা পুনর্নির্ধারণ; কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ; প্রত্যেক নৌ শ্রমিককে মালিক কর্তৃক নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র ও সার্ভিস বুক প্রদান; নদীর নাব্য রক্ষা ও প্রয়োজনীয় মার্কা, বয়া ও বাতি স্থাপন; মাস্টার-চালক পরীক্ষা, সনদ বিতরণ ও নবায়ন, বেআইনি নৌ চলাচল বন্ধ করা; নৌপরিবহন অধিদফতরে সব ধরনের অনিয়ম ও শ্রমিক হয়রানি বন্ধ এবং নৌযান শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এসব দাবির বিষয়ে আলোচনার জন্য সোমবার শ্রমিক প্রতিনিধিদের বৈঠকে ডেকেছিলেন মালিকরা।

গভীর রাত পর্যন্ত রাজধানীর মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএ ভবনে ওই বৈঠকে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক, বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান, শ্রম অধিদফতরের পরিচালক, নৌ-পুলিশের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। কিন্তু বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেন শ্রমিকরা।

অন্যদিকে গতকাল বিজয়নগরের আকরাম টাওয়ারে বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সংবাদ সম্মেলনে নৌযান মালিকদের পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, অযৌক্তিক দাবি মেনে জাহাজ চালানো সম্ভব নয়। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল হক বলেছেন, ‘যেখানে করোনাভাইরাসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই করা হচ্ছে, বেতন অর্ধেক করা হচ্ছে, সে সময় এ ধরনের অযৌক্তিক দাবি তুলে ধরে অরাজকতার পেছনে কারও ষড়যন্ত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ধর্মঘট প্রত্যাহার এবং রিট মামলা নিষ্পত্তি করে কমিটির মাধ্যমে আলোচনায় বসতে হবে।

এদিকে চট্টগ্রাম থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাস এবং নৌপথে পণ্য পরিবহন বন্ধ রয়েছে। কর্ণফুলী নদীতে অন্তত দেড় হাজার লাইটার জাহাজ, অয়েল ট্যাঙ্কার, বাল্কহেড অলস বসে আছে। চট্টগ্রাম জেলা নৌ শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ ঐক্য পরিষদের সহ-সভাপতি মো. নবী আলম জানান, তাদের ১১ দফার মধ্যে তৃতীয় দফা দাবিটি হচ্ছে নৌযান শ্রমিকদের খোরাকি ভাতা প্রদান। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বসুন্ধরা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও আবুল খায়ের গ্রুপ একাত্মতা প্রকাশ করে খোরাকি ভাতা বাবদ মাসিক দুই হাজার টাকা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে।

জানা গেছে, বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। বহির্নোঙরে অর্ধশতাধিক বড় জাহাজ রয়েছে। নদীপথে পণ্যবাহী কোনো নৌযান চলাচল করছে না। কিছু লাইটার জাহাজ চলাচল বা পণ্য খালাসের চেষ্টা করলেও শ্রমিকরা জোর করে কাজ বন্ধ করে দেন। কর্ণফুলী নদীসহ বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে অলস বসে আছে লাইটার, ট্যাঙ্কার, বাল্কহেডগুলো। শুধু যাত্রীবাহী নৌযান কর্মবিরতির বাইরে রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজ চলাচল না করলেও বন্দরের মূল জেটি জিসিবি, সিসিটি, এনসিটি, রিভারমুরিং, ডলফিন অয়েল জেটি ও স্পেশাল বার্থে কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের কাজ চলছে। বন্দর থেকে লরি, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানে পণ্য ও কনটেইনার ডেলিভারিও স্বাভাবিক রয়েছে।

সূত্র জানায়, বিদেশ থেকে গম, ভুট্টা, ডাল, সার, চিনি, সিমেন্ট ক্লিঙ্কার, পাথর, কয়লা, ভোজ্য তেলসহ বিভিন্ন খোলা পণ্য বড় কার্গো জাহাজে আমদানি করা হয়। কর্ণফুলী নদীর ড্রাফট কম থাকায় এসব বড় জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারে না। তাই বহির্নোঙরে (সাগরে) অপেক্ষমাণ রেখে ছোট ছোট জাহাজে পণ্য খালাস করা হয়। শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ায় বিভিন্ন শিল্প-কারখানার কাঁচামাল পরিবহন কার্যত বন্ধ রয়েছে। এই ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হলে বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থানকাল বেড়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। বরিশাল থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, নৌযান শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের কারণে পণ্য ও জ্বালানিসহ সব মালবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে দুর্গাপূজার কারণে সাময়িক সময়ের জন্য যাত্রীবাহী নৌযান ধর্মঘটের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।

অনতিবিলম্বে দাবি মেনে না নিলে যাত্রীবাহী জাহাজেও শ্রমিক ধর্মঘট শুরুর হুঁশিয়ারি দেন নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, নৌ ধর্মঘটের কারণে আশুগঞ্জ নৌ বন্দরে সার, রড, সিমেন্ট, পাথর, কয়লাসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আটকা পড়েছে অর্ধশতাধিক জাহাজ। এ ছাড়া পণ্য ওঠানামাও বন্ধ রয়েছে। এতে বন্ধ হয়ে গেছে নদীবন্দরের কার্যক্রম। বেকার হয়ে পড়েছেন বন্দরের শ্রমিকরা।

বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, পণ্যবাহী নৌযানের শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির প্রথম দিনই মোংলা বন্দরে ওঠানামা করা পণ্য নৌপথে পরিবহনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে কর্মবিরতির আওতায় থাকছে না যাত্রীবাহী নৌযান।

জাহাজ শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণ হচ্ছে- শাজাহান খান : গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শাজাহান খান বলেছেন, লাইটার জাহাজ শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অন্যান্য দাবি পূরণ হচ্ছে না বলেই তারা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। সরকারের দায়িত্ব আলাপ-আলোচনা করে এর সমাধান করা। এ ধর্মঘটের দায় যতটা না সরকারের, এর চেয়ে বেশি নৌযান মালিকদের। গতকাল বিকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি এসব কথা বলেন।

শাজাহান খান বলেন, বিএনপি এখন একটি কুঁজোর দলে পরিণত হয়েছে। তারা ‘আন্দোলন, আন্দোলন’ বলে কিন্তু আন্দোলন করতে পারেন না। বিভিন্ন আন্দোলনের ওপর ভর করে তারা সরকারের পতন ঘটাতে চায়। তিনি বলেন, এ সরকার জনগণের রায়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কারও দয়ায় সরকার আসেনি। সরকার তার নিজস্ব গতিতেই পরিচালিত হয়।

শাজাহান খানকে সঙ্গে নিয়ে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ঢাকা মহানগর কমিটির নেতারা বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে তিনি বঙ্গবন্ধু ও পরিবারের নিহত সদস্যদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে ফাতিহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর