বুধবার, ৪ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

চার মামলায় আরও ১৪ দিনের রিমান্ডে হেলেনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

অনলাইন প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির সম্মানহানির চেষ্টার অভিযোগে বহুল আলোচিত হেলেনা জাহাঙ্গীরের দুই সহযোগীকে সোমবার গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। তারা হলেন হাজেরা খাতুন ও সানাউল্লাহ নূরী। রাজধানীর গাবতলী থেকে রাতে তাদের গ্রেফতারের পর গতকাল দুপুরে কুর্মিটোলায় র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানায় র‌্যাব। র‌্যাব জানিয়েছে, জয়যাত্রা টিভির জিএম (অ্যাডমিন) হিসেবে কাজ করেন হাজেরা খাতুন আর প্রতিনিধি সমন্বয়ক সানাউল্লাহ নূরী।

র‌্যাব তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, আইপিটিভির নামে স্যাটেলাইটে সম্প্রচার চালাচ্ছিল জয়যাত্রা টিভি। ২০১৮ সাল থেকে হংকংয়ের একটি ডাউনলিঙ্ক চ্যানেল হিসেবে চ্যানেলটির সম্প্রচার চলছিল। যার তরঙ্গ বরাদ্দ হয় হংকং থেকে। এজন্য হংকংয়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে মাসে ৬ লাখ টাকা দিতে হতো জয়যাত্রা কর্তৃপক্ষকে।

সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, জয়যাত্রা টিভি দেশে সম্প্রচারের জন্য ক্যাবল ব্যবসায়ীদের কাছে রিসিভার সরবরাহ করে। প্রতিনিধিরা ক্যাবল ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে নিজ এলাকায় জয়যাত্রা টিভির সম্প্রচার নিশ্চিত করতে না পারলে তাদের চাকরিচ্যুত করা হতো।

র‌্যাব পরিচালক বলেন, অবৈধভাবে দেশের প্রায় ৫০টি জেলায় সম্প্রচার হয় জয়যাত্রা টিভির। চ্যানেলটি রাজধানী ও জেলা পর্যায়ের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়েছে। এসব প্রতিনিধির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে তা আত্মসাৎ করে।

আল মঈন আরও বলেন, গ্রেফতার হাজেরা খাতুন ২০০৯ সালে কুমিল্লার একটি কলেজ থেকে মাস্টার্স করে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন মিরপুরের এক পোশাক কারখানায় অ্যাডমিন (এইচআর) পদে চাকরি শুরু করেন। তিনি হেলেনার আত্মীয়। কর্মদক্ষতা গুণে হেলেনার অত্যন্ত আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন হাজেরা।

র‌্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, ২০১৬ সালে হাজেরা ‘জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন’-এর ডিজিএম হন। ২০১৮ সালে জয়যাত্রা টিভি চালুর পর অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জিএম (অ্যাডমিন) পদে নিয়োগ পান। হাজেরা দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও হেলেনার আর্থিক বিষয়াদি দেখাশোনা করতেন বলে র‌্যাবের জেরায় জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, অর্থ লেনদেনের মাধ্যম অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি এ টিভিতে নিয়োগ পেয়েছেন। হেলেনার পরিকল্পনা, উৎসাহে বা চাপে এবং নির্দেশে অনেক প্রতিনিধি নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যক্তির প্রচার, প্রার্থিতা প্রচার, সাক্ষাৎকার ইত্যাদির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ হাজেরা ও সানাউল্লাহর মাধ্যমে তুলে নিতেন হেলেনা। যে বিজ্ঞাপন মূলধারার গণমাধ্যমে প্রচার হয় না সেগুলো জয়যাত্রা টিভিতে প্রচার করা হতো। তাবিজ-কবজ, টোটকা-ফাটকা, ভাগ্য বলে দিতে পারে, জিনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, গোপন সমস্যার সমাধান এসব বিজ্ঞাপন প্রচার করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন হেলেনা চক্র।

হাজেরা খাতুন জানান, হেলেনা জাহাঙ্গীর জয়যাত্রা টিভিকে নিজ প্রচার ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ব্যবহার করতেন। বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে জয়যাত্রা টিভি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচার চালানো হতো। নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুতদের তিনি একইভাবে হেনস্তা করতেন। মূলধারার গণমাধ্যমের বিপরীতে তিনি একটি সংগঠন তৈরির পরিকল্পনা করেন, যেখানে ৫ হাজার সংবাদকর্মীর একটি বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা করেন হেলেনা।

র‌্যাব আরও জানায়, জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনে দাতা, সাধারণ সদস্য, আজীবন সদস্য ইত্যাদি ক্যাটাগরিতে অর্থ সংগ্রহ করা হতো। তার প্রায় ২০০ সদস্য আছে। যাদের কাছ থেকে সদস্যপদ বাবদ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন হেলেনা। যার অল্প কিছু মানবিক কাজে সহায়তা দিলেও অবশিষ্ট অর্থ তার সন্তানদের নামে সঞ্চয় করেন হেলেনা।

সানাউল্লাহ নূরীকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব জানিয়েছে, হেলেনার নির্দেশে প্রতিনিধিদের সমন্বয় করার দায়িত্ব ছিল তার। প্রতিনিধিদের কেউ মাসিক টাকা দিতে ব্যর্থ হলে বা গড়িমসি করলে ভয়ভীতি দেখাতেন। এলাকায় তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে বা বিভিন্ন সেক্টরে ব্যাপক চাঁদাবাজি করে কিছু অর্থ জয়যাত্রা টিভির ফান্ডে জমা দিতেন সানাউল্লাহ।

চার মামলায় ১৪ দিন রিমান্ড : আদালত প্রতিবেদক জানান, হেলেনা জাহাঙ্গীরকে পৃথক চার মামলায় ১৪ দিন রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে আদালত। গতকাল ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত রিমান্ডের এ আদেশ দেয়। এর আগে রাজধানীর গুলশান থানার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় তিন দিনের রিমান্ড শেষে আসামিকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। পরে নতুন করে এ মামলায় ফের ১০ দিন রিামন্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসামি হেলেনা জাহাঙ্গীর অনলাইনে ভার্চুয়াল জগতে ডিজিটাল প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে বিভিন্ন মন্ত্রী ও সংস্থাকে কটূক্তি করে দেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের ভাবমূর্তি ক্ষুণœসহ মিথ্যা তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটান। আসামি গোপনে সরকারবিরোধী কার্যকলাপ ও পরিকল্পনায় লিপ্ত। এ ছাড়া আসামি জিজ্ঞাসাবাদে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিকারী দল ও সংস্থার সঙ্গে তার জড়িত থাকার বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিকারী দল ও সংস্থা এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে শনাক্ত করার জন্য এ আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।

চার মামলার মধ্যে রাজধানীর পল্লবীতে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় সাত দিন এবং প্রতারণা মামলায় সাত দিন মোট ১৪ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম শাহিনুর রহমান আসামির জামিন আবেদন নাকচ করে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় চার দিন ও প্রতারণা মামলায় চার দিন মোট আট দিন রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন।

এ ছাড়া গুলশান থানার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় ১০ দিন এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় পাঁচ দিন মোট ১৫ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম নিভানা খায়ের জেসি আসামির জামিন আবেদন নাকচ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় তিন দিন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় তিন দিন মোট ছয় দিন রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন। এর আগে ৩০ জুলাই আসামি হেলেনা জাহাঙ্গীরকে তিন দিন রিমান্ডে পাঠায় আদালত। ওই রিমান্ড শেষে গতকাল তাকে আদালতে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

২৯ জুলাই রাতে রাজধানীর গুলশান-২-এর ৩৬ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়ি থেকে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে (৪৯) গ্রেফতার করে র‌্যাব।