শিরোনাম
প্রকাশ : ২ এপ্রিল, ২০২০ ২৩:৫৪

বৈশ্বিক মহামারী ও রসুল (সা.)-এর নির্দেশনা

মুফতি হেলাল উদ্দীন হাবিবী

বৈশ্বিক মহামারী ও রসুল (সা.)-এর নির্দেশনা

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। চীনের উহান থেকে শুরু এই ভাইরাস অতিদ্রুত বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যপী করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেসব দেশে করোনাভাইরাস বেশি আঘাত করেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো চীন, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন ও ইরান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে  বৈশি^ক মহামারী হিসেবে ঘোষণা করেছে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বেশ কয়েকজন শনাক্ত হয়েছে; যা দেশবাসীর জন্য গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের বিষয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য অবিরাম পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাস ও কোরআন-হাদিস গবেষণা করলে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, যখন পৃথিবীতে অতিমাত্রায় পাপাচার ছড়িয়ে পড়ে, খুন-ধর্ষণ, জুলুম-অত্যাচার বেড়ে যায়, তখন আল্লাহতায়ালা মহামারী আকারে বিভিন্ন ধরনের আজাব প্রেরণ করেন। তাই সমগ্র মানবজাতিকে কালবিলম্ব না করে তওবা-ইস্তিগফার ও ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে মহান আল্লাহতায়ালার দিকে ধাবিত হওয়া একান্ত কাম্য। এ প্রসঙ্গে মহান রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, তোমাদের ওপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গুনাহ ক্ষমা করে দেন। সূরা শূরা, আয়াত ৩০।

মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন, মানুষের কৃতকর্মের জন্য স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে। যাতে করে তাদেরকে কিছু কর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়। যাতে তারা (তাদের কৃতকর্ম থেকে) ফিরে আসে। (সূরা রূম, আয়াত ৪১)

রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেখানে মহামারী আকারে এমন সব রোগের উদ্ভব হয়; যা পূর্বেকার লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি।

(ইবনে মাজাহ)

সম্মানিত পাঠক! এ সংকটময় মুহূর্তে আমাদের জন্য কিছু করণীয় রয়েছে-

১. ধৈর্য, নামাজ, তওবা, ইস্তেগফার, দরুদ ও দোয়ার মাধ্যমে মহান আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ কামনা করা। এ ব্যাপারে মহান রব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য কামনা করো। (সূরা বাকারা, আয়াত ৪৫)। হজরত আনাস (রা.) বলেন, ভয়াবহ রোগ-ব্যাধি থেকে বাঁচার জন্য রসুলুল্লাহ (সা.) পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল বারাসি, ওয়াল জুনুনি, ওয়াল জুজামি, ওয়া মিন সাইয়্যিল আসকাম’। অর্থ- ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি শ্বেত, উন্মাদনা, কুষ্ঠ এবং সব ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে’। (আবু দাউদ)।

২. সুন্দর ব্যবস্থাপনায় হোম কোয়ারেন্টাইন মেনে চলা। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ (সা.) মহামারীর সময়ে কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থার ধারণা সর্বপ্রথম মানব মস্তিষ্কে জন্ম দেন। এ সম্পর্কে রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, কোথাও মহামারী দেখা দিলে এবং তোমরা সেখানে অবস্থানরত থাকলে সেখান থেকে চলে যাবে না। আর সেখানে অবস্থানরত না থাকলে, ওই (আক্রান্ত) এলাকায় প্রবেশ করবে না। (তিরমিজি)।

৩. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, এখানে সেখানে থুথু না ফেলা, সকল প্রকার জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং সম্ভব হলে সর্বদা অজু অবস্থায় থাকা। হজরত আবু মালেক আশআরি (রা.) হতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। (সহিহ মুসলিম)।

৪. মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি পূর্ণ ভরসা রাখা ও যথাসম্ভব বেশি বেশি দান সদকা করা। মহান রব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। (সূরা তালাক, আয়াত : ৩)।

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, নিশ্চয় সদকা আল্লাহর ক্রোধকে প্রশমিত করে এবং খারাপ মৃত্যু থেকে রক্ষা করে। (তিরমিজি)। হজরত আমর ইবনে আওফ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, দান-সদকা হায়াত বৃদ্ধি করে, খারাপ মৃত্যু প্রতিহত করে। (তাবরানি)

৫. ডাক্তার ও চিকিৎসাবিদগণের নির্দেশনা অনুযায়ী সার্বিক সতর্কতা ও সচেতনতা অবলম্বন করা। মনে রাখতে হবে, সচেতনতা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, আল্লাহ ততক্ষণ কোনো জাতির অবস্থার পরিবর্তন ঘটান না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা তাদের অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করে। (সূরা রা’দ, আয়াত : ১১)।

রসুলুল্লাহ (সা.) নিজে অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণ করতেন এবং লোকদেরকে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করতেন। রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো, কেননা মহান আল্লাহতায়ালা এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার প্রতিষেধক নেই। তবে একটি মাত্র রোগের প্রতিষেধক নেই, তা হলো বার্ধক্য। (আবু দাউদ)। মহান আল্লাহ যেন আমাদের করোনাভাইরাস নামক মরণব্যাধি ও সব ধরনের মহামারী থেকে হেফাজত করেন। আমিন।


আপনার মন্তব্য