Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:১৪

স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য ম্লান যেখানে

সাঈদুর রহমান রিমন

স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য ম্লান যেখানে

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার চিত্রটি বোঝার জন্য শুধু হাসপাতাল, চিকিৎসক, ওষুধ বা হাসপাতালের বেড ও রোগীর অনুপাতের হিসাব দেওয়া যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে গড় আয়ু, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার এবং চিকিৎসা খরচ বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। ১৬ কোটি মানুষের দেশে কতজন চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা তাদের মধ্যে কেমন, তাও জানা জরুরি। দেশে সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সর্বত্র আধুনিক চিকিৎসা সুবিধাদিও নিশ্চিত হয়নি। এদিকে ‘স্বাস্থ্যসেবা অধিকার, শেখ হাসিনার অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে গতকাল শুরু হয়েছে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সপ্তাহ। পাঁচ দিনব্যাপী এ স্বাস্থ্যসেবা সপ্তাহ শেষ হবে আগামী ২০ এপ্রিল শনিবার।

জেলা সদর হাসপাতালে সিসিইউ, আইসিইউ, সিটি স্ক্যান যন্ত্র ও লিফট নেই। নেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা। উপজেলা পর্যায়ে এ সমস্যাটি আরও প্রকট। জেনারেটর থাকলেও তা চালানোর জন্য জ্বালানি তেলের বরাদ্দ পর্যাপ্ত নেই। হাসপাতালে মজুদ ওষুধের তালিকা কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেমন টানানো হয় না, তেমনি নিয়মিত তা হালনাগাদও করা হয় না। অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে যন্ত্র সচল থাকে না। এ ছাড়া আলট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে ফিল্ম ও ইসিজি যন্ত্রের অভাব রয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশেষ করে ডিজিটাল এক্স-রে, ইকো-কার্ডিয়াক, মাইক্রোস্কোপ প্রভৃতির অভাব রয়েছে। হাসপাতালগুলোতে অ্যাম্বুলেন্সও বিকল।

টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে ১০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ দিতে হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগ নির্ণয় কেন্দ্র ও দালালদের কমিশন ভাগাভাগির সম্পর্ক রয়েছে। অ্যাডহক চিকিৎসক নিয়োগে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে জানায় টিআইবি। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হাসপাতালে রোগীর পথ্যের সরবরাহকারী বাছাইয়ে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। এতে সব ঠিকাদারের দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকে না। দরপত্রে উল্লিখিত খাদ্যসহ নানা দ্রব্য সঠিকভাবে সরবরাহ করা হয় না।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক এবং নাক, কান ও গলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মণিলাল আইচ লিটু বলেন, বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, ১৬ কোটি মানুষের দেশে এখনো চিকিৎসাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল। এখানে যেমন চিকিৎসক ও হাসপতালের বেড প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম, তেমনি রোগ নির্ণয়ের জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতিও নেই। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলো চাইলেও রোগীদের ঠিকমতো চিকিৎসা দিতে পারে না। প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে সরকারি হাসপাতালে লম্বা লাইন হয়। তিনি বলেন, এটা সত্য যে এর বিপরীতে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার অনেক দাম। সবার পক্ষে তাই সেই সেবা নেওয়া সম্ভব হয় না। অধ্যাপক মণিলাল আইচ লিটুর প্রস্তাব, ‘সমস্যা সমাধানে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের ডাবল শিফট চালু করা যেতে পারে। এতে কর্মঘণ্টা বেড়ে যাবে এবং বেশি মানুষ চিকিৎসাসেবা পাবে।’ তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা চালু হয়েছে এবং সুফল পাওয়া যাচ্ছে। এ জন্য অবশ্য সরকারের খরচ বাড়বে, তবে গ্রহণযোগ্য ফির বিনিময়েও দ্বিতীয় শিফট চালু করা যায়।’

চিকিৎসকদের সঙ্গে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশনভিত্তিক চুক্তি থাকে। সরকারি চিকিৎসকরা বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালেই সময় দেন বেশি। রোগীদের সেখানেই যেতে বলেন। বেসরকারি হাসপাতালে অনেক ক্ষেত্রে প্যাথলজিস্ট না রেখে তাদের সিল ব্যবহার করে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রতিবেদন তৈরি করে রোগীদের রিপোর্ট দেওয়া হয়। আর সেখানে কোন পরীক্ষার কত খরচ সে নিয়মনীতি পালনের ধার ধারে না তারা। চিকিৎসকরাও মোটা অঙ্কের ফি আদায় করেন। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় অনেক চড়া হলেও মান দেখার যেন কেউ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মো. মোজাহেরুল হক বলেছেন, প্রতিবছর ৬৫ লাখ লোক গরিব হয়ে যায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে, শুধু স্বাস্থ্য-ব্যয়। অন্য কারণেও হয়। তবে ব্যয়ের একটি বড় অংশ শুধু স্বাস্থ্যের জন্য করতে হয়। আমাদের স্বাস্থ্য-ব্যয়ের এই জিনিসটা কমিয়ে আনতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কী চাইছে? তারা বলছে, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য বিষয়, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে অন্য যেসব বিষয় দরকার, সেগুলো সহজপ্রাপ্য হতে হবে। সেটি আবার জনগণের কাছে পৌঁছুতেও হবে। তবে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার নাম টেলিমেডিসিন। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরা মোবাইল ফোন ও ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি সূচক দেশের মানুষের গড় আয়ু। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়ে এখন ৭০ বছর ছাড়িয়ে গেছে। ২০০৯ সালে একজনের গড় আয়ু ছিল ৬৭.২ বছর। এখন মানুষ প্রাণঘাতী রোগের দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। তাই এই প্রাণঘাতী রোগ মহামারী আকার ধারণ করতে পারছে না। বিপরীতে বেড়েছে গড় আয়ু। বাংলাদেশ মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। আর এর স্বীকৃতিও মিলেছে। বাংলাদেশ মা ও নবজাতকের টিটেনাস (এমএনটি) সংক্রমণ নির্মূলে সাফল্যের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জন করেছে। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। এ ক্ষেত্রে সাফল্য প্রায় শতভাগ। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার আরেকটি দিক হলো, এখন প্রায় ৯৭ ভাগ পরিবার নলকূপ বা ট্যাপের পানি পান করেন। আর ৬৩ ভাগ পরিবার স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার করে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা খাতে আমরা টেকসই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করছি। ২০১১ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘ কর্তৃক ‘ডিজিটাল হেলথ ফর ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ পুরস্কারে ভূষিত হয়। এর মধ্যে আরও অনেক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সম্মাননা পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতার হাত ধরে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সুস্থ-সবল জাতি গঠনের উদ্দেশ্যে দেশের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ সেবা অগ্রসর হচ্ছে দ্রুতগতিতে।

এত সব সাফল্যও ম্লান যেখানে : নানা সাফল্য আর উন্নয়ন মডেলে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে নৈরাজ্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। অস্ত্রোপচারের পর পেটের ভেতর ছুরি বা গজ রেখেই সেলাই দেওয়া, বাঁ পায়ের পরিবর্তে সুস্থ ডান পা কেটে ফেলা, প্যাথলজি পুরুষ রোগীর গর্ভধারণ(!) চিহ্নিত করা আর ভুল চিকিৎসায় রোগীর জীবন বিপন্ন করে তোলা যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দাঁত তোলার নামে শিক্ষানবিস চিকিৎসকরা হাত পাকাচ্ছেন। অনেক হাসপাতালে চিকিৎসকের পরিবর্তে ওয়ার্ডবয়ই সর্বেসর্বা। জটিল কঠিন অপারেশন করতেও দ্বিধা করছেন না তারা। সুযোগ-সুবিধাহীন সরকারি হাসপাতালে একশ্রেণির চিকিৎসক, নার্স, আয়া-কর্মচারীর চরম দুর্ব্যবহারের সামনে রোগীরা থাকছেন বড়ই অসহায়।

এদিকে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে উন্নত চিকিৎসা আর ভালো ব্যবহারের নামে চলছে ‘গলাকাটা বাণিজ্য’। স্বাস্থ্যসেবার নামে গজিয়ে ওঠা বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোয় রোগীদের থেকে মাত্রাতিরিক্ত ‘সেবা (!) ফি’ আদায়ের পাগলা ঘোড়া চলছে তো চলছেই। দিনে দিনে, এমনকি প্রতি ঘণ্টার ব্যবধানেও পাল্টে যাচ্ছে বেড ভাড়া, চিকিৎসকের ফি। সকালে যে চিকিৎসক রোগী দেখছেন ৫০০ টাকা ফি নিয়ে, বিকালেই তিনি হয়ে উঠছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক- রোগীপ্রতি ফি নিচ্ছেন দেড় হাজার। পুরোপুরি নিজেদের খেয়াল খুশিমতো যখন যা খুশি ফি বাড়াচ্ছেন, বাড়াচ্ছেন অন্যান্য চিকিৎসাসেবার মূল্য। চিকিৎসাসেবা দেওয়ার নামে চলমান নৈরাজ্য ও নির্মমতা দেখার যেন কেউ নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের খবরদারি আর অধিদফতরের নিয়মনীতি, হুঁশিয়ারির কোনো কিছুতেই পরোয়া নেই গুটিকয় বেসরকারি হাসপাতালের। অভিজাত হাসপাতাল নামের ‘চিকিৎসা বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো’র মালিক কর্তৃপক্ষ অনেক বেশি প্রভাবশালী। নিজেদের হাসপাতাল-ক্লিনিককে আন্তর্জাতিক মানের দাবি করে তারা দেশীয় আইন-নীতিমালাকে পাত্তা দেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একই রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে একেক স্থানে একেক রকম ফি আদায় হচ্ছে। যে যেভাবে পারছে সেভাবেই রোগীর পকেট খালি করে চলেছেন। ঢাকার পাঁচ তারকা খ্যাত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা খরচ পৃথিবীর যে কোনো উন্নত দেশের চিকিৎসা-ব্যয়ের চেয়ে মোটেও কম নয়। কিন্তু উন্নত বিশ্বের আদলে সেবা আর আচরণের ছিটেফোঁটাও নেই। হাসপাতাল-ক্লিনিকে ভর্তি থেকে শুরু করে শয্যা পাওয়া, কেবিন ভাড়া, ডাক্তার-বিশেষজ্ঞ পরিদর্শন ফি, বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষাসহ সব ক্ষেত্রেই চলে ‘গলাকাটা বাণিজ্য’। রোগী ভর্তি করতে হলেই স্পেশালাইজড হাসপাতাল-ক্লিনিকের ক্যাশ-কাউন্টারে কমপক্ষে ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম জমা রাখার নিয়ম জারি রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একাধিক জরিপেও বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোয় অতিরিক্ত ফি আদায়ের প্রসঙ্গ এসেছে।

ভুল চিকিৎসায় একের পর এক রোগী হত্যার অসংখ্য অভিযোগ মাথায় নিয়েও বহাল তবিয়তে থাকছেন চিকিৎসকরা। কি সরকারি কি বেসরকারি, সব হাসপাতালেই অভিন্ন অবস্থা বিদ্যমান। গত পাঁচ বছরে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অজ্ঞতা, অবহেলা ও দায়িত্বহীনতাসহ ভুল চিকিৎসার মাধ্যমে তিন শতাধিক রোগীকে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় নিহতদের স্বজন ও বন্ধুবান্ধব উত্তেজিত হয়ে হাসপাতাল-ক্লিনিক ভাঙচুর করেছেন, চিকিৎসক-কর্মচারীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে উল্টো ঘটনাও ঘটে। সেসব স্থানে চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারীরা জোট বেঁধে উল্টো নিহত রোগীর আত্মীয়স্বজনের ওপরও হামলা চালিয়েছেন। মারধরে আহত হলে তাদের পুলিশে সোপর্দ করার মতো নির্মম ঘটনাও ঘটেছে।


আপনার মন্তব্য