শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ মে, ২০২০ ২৩:৫৬

আমলাতন্ত্র বড় বাধা

তিন মন্ত্রীর কনফারেন্সে অভিমত, বিদেশি বিনিয়োগ টানতে হবে টাস্কফোর্স

নিজস্ব প্রতিবেদক

আমলাতন্ত্র বড় বাধা

দেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র যে বড় বাধা সেটি খোদ মন্ত্রী-আমলাদের মুখ থেকেই উঠে এলো এবার। গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বাণিজ্য সহায়ক পরামর্শক কমিটির সভায় তারা তুলে ধরলেন, জমি রেজিস্ট্রেশনে অতিরিক্ত করারোপ, ট্রেড লাইসেন্সে দীর্ঘসূত্রতা, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতির বৈষম্য, ডাবল টেক্সেশনের মতো বিষয়গুলো।

করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ও শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন সভায় উপস্থিত থাকলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, শিল্প সচিব মো. আবদুল হালিম, এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, বেজা ও বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানসহ বেশিরভাগই ডিজিটাল প্লাটফর্মে অংশগ্রহণ করেন। বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দিন সভা পরিচালনা করেন। সভাপতির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি স্বীকার করেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিশেষ করে চীন থেকে যেসব দেশ শিল্প-কারখানা স্থানান্তর করতে চাইছে তাদের বাংলাদেশে আনার কৌশল নির্ধারণের লক্ষ্যে সভাটি ডাকা হলেও এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের সমস্যাগুলো নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে ঈদের পর টাস্কফোর্স গঠন করা হবে বলে জানান তিনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, অনেক বিনিয়োগ প্রস্তাব দেশে এনেছি। কিন্তু এগুলো চূড়ান্ত হয় না। এ ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র একটি বড় বাধা। বিদেশিরা স্বচ্ছতার বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেন, গার্মেন্ট সেক্টরে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ বিদেশি বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করবে। এক্ষেত্রে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। তিনি বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় বিনিয়োগেও গুরুত্বারোপ করেন। অনলাইনে যুক্ত হয়ে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নানামুখী সমস্যার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ নীতিমালা। এখানে বৈষম্য আছে। বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশে  বিদেশিরা বিনিয়োগ করলেও এখান থেকে তাদের বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ নাই। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ের জন্য অনেক কিছু করা হচ্ছে। অনেকে আমাকে বলেছেন, তাদের কাছ থেকে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কেটে রাখা হচ্ছে। অথচ করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির। তিনি মিটিং-আলোচনায় সময় নষ্ট না করে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা জমি। গত অর্থবছরের বাজেটে জমি রেজিস্ট্রেশনে ৫৮ শতাংশ ট্যাক্স আরোপ করা হয়েছে। এটা প্রত্যাহারের জন্য এনবিআর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করার পরও এখনো সেটি হয়নি বলে হতাশা প্রকাশ করেন বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, আমাদের শুধু ব্যবসা সহজ করার পরিকল্পনা করলে হবে না। একটা বড় ধরনের ঝাঁকুনি দরকার। করোনা পরবর্তী বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন সংস্থাগুলো কাজ করছে উল্লেখ করে পবন চৌধুরী বলেন, জাপানি কোম্পানিগুলো স্থানান্তর করে যাতে বাংলাদেশে আসে, সেজন্য তাদের দুই হাজার একর জমি দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দেশটির কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম অনলাইনে অংশ নিয়ে সভায় বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ডিজিটাল সেবার জন্য ১১টি সংস্থার সঙ্গে এমওইউ (সমঝোতা স্মারক) করার পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও এর মধ্যে মাত্র চারটি কোম্পানি অনলাইনে সেবা দিচ্ছে। বাকিগুলো এখনো সার্ভিসে যুক্ত হতে পারেনি। তিনি বাণিজ্য শুরুর ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে এক দিনে যে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া যায়, সেটি দিতে এক মাস সময় নেওয়া হয়। একটি কাজ যেখানে ২৪ ঘণ্টায় হয়, সেটি করতে এক মাস লাগলে আর উৎসাহ থাকে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সৌদি আরবের বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, দীর্ঘসূত্রতার কারণে এখনো ১৫/২০টি প্রস্তাব আটকে আছে। গত ৩/৪ মাস ধরে শুধু এগুলোর বিষয়ে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে জট নিয়ে যে খবর শোনা যায়, সেটি শুনেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আসতে চায় না। এ বিষয়ে এনবিআর ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে সমন্বয় করে কাজ করার তাগিদ দেন তিনি।

এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম অনলাইনে যোগ দিয়ে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য যত ধরনের সহায়তা দরকার, করে দেব। তবে একটি বিষয় দেখতে হবে। কোনো ধরনের চুক্তির আগে যেন এনবিআর-এর ভেটিং নেওয়া হয়। তিনি বলেন, অনেক সময় দেখা যায় চুক্তির পর বলা হয়, এখন আর ফিরে আসা যাবে না। এটি যেন না হয়। কারণ রাজস্বের বিষয়টি আমাদের দেখতে হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, স্থানীয় শিল্প রক্ষায় কৌশল এখন রাজস্ব আদায় নয়, শিল্প রক্ষার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। তবে আমাদের কিছু সমস্যা আছে। এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান হতাশা প্রকাশ করে বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা আমাদের কেউ ভালো বলে না। কারণ আমরা টাকা চাই, টাকা দেই। এমন কি অর্থমন্ত্রী, অর্থ সচিব আমাদের ভালো বলেন না। এ জন্য রাজস্ব আয়ের সব উৎস বন্ধ করা যাবে না। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মধ্যে এফবিসিআই প্রেসিডেন্ট শেখ ফজলে ফাহিম, বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট রুবানা হক, শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন প্রমুখও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সরকারের দীর্ঘসূত্রতার কথাগুলো উল্লেখ করেন।


আপনার মন্তব্য