শিরোনাম
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর, ২০২০ ১৮:০৫
আপডেট : ৩১ অক্টোবর, ২০২০ ১৮:০৮

এক অপার বন্ধুর প্রস্থান!

হাসান ইবনে হামিদ

এক অপার বন্ধুর প্রস্থান!
ইন্দিরা গান্ধী

“আজ আমি বেঁচে আছি। কাল আমি নাও থাকতে পারি। আমি অনেকদিন বেঁচে আছি। আমি আমার দেশের মানুষদের সেবা করতে পেরেছি, এটা আমার জন্য অনেক বড় সান্ত্বনা। আমি যদি মারা যাই, আমার রক্তের প্রতিটি ফোঁটা ভারতকে শক্তিশালী করবে।”-

উড়িষ্যায় এই বক্তব্য প্রদানকালে ইন্দিরা গান্ধী জানতেনও না এটাই জনতার সামনে তার শেষ বক্তব্য। এই জনসভার ঠিক একদিন পর ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪ সালে দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ভারতের প্রথম ও আজ পর্যন্ত একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ব্যক্তি ইন্দিরা গান্ধীর জীবনাবসনের সাথে সাথেই ভারতীয় রাজনীতিতে একটি অধ্যায়ের যবনিকা ঘটলো। তিনি চলে গেলেন কিন্তু বিশ্ববাসীর কাছে রেখে গেলেন পথ চলার বার্তা। ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা ও কূটনৈতিক বিচক্ষণতা বিশ্বের সকল রাজনীতিকের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তার মহানুভবতা শুধুমাত্র ভারতবাসীর কাছেই নয় বরং বিশ্ববাসীর কাছে তা ছিল সমাদৃত। ইন্দিরা গান্ধীর মহানুভবতা ও সহযোগিতার গল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে ত্রাণকর্তা রূপে আবির্ভূত হওয়া ইন্দিরা গান্ধী হলেন মহাকালের মহানায়ক। হত্যা করে তার আদর্শকে বিলুপ্ত করা যায়নি।

ইন্দিরা গান্ধী নামটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে আজীবন শ্রদ্ধেয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে যে নামটি ওতপ্রোতোভাবে জড়িত তা হল শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামটির সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন বন্ধু রাষ্ট্রগুলো বা রাষ্ট্রনায়কদের নামের তালিকায় যার নামটি কৃতজ্ঞচিত্তে বেশি স্মরণ করা হয়, তিনি হলেন ভারতের মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। স্বাধীন বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধী নামগুলো খুবই অবিচ্ছেদ্য। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক ভোট পেয়ে ইন্দিরা গান্ধী দ্বিতীয় বারের মত প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। শপথ গ্রহণের আগেই এই উপমহাদেশের ভয়াবহ গণহত্যা প্রত্যক্ষ করতে হয় ইন্দিরা গান্ধীকে। রক্তের হোলিখেলার মাঝে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে হয়নি কোন পক্ষে যাবেন তিনি। একটি উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সরকার প্রধান হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেন এবং নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ান। মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে গোটা বিশ্বে আমাদের গণহত্যার চিত্র তুলে ধরেন তিনি। 

মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতার সংগ্রাম বিফলে পর্যবসিত হয় যদি আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় না করা যায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট ছিল ভারতের পক্ষে সোভিয়েত রাশিয়ার সরাসরি সমর্থন প্রদান। ইন্দিরা গান্ধী সোভিয়েত রাশিয়া সফর করে তাদের সঙ্গে ২২ বছরের শান্তি চুক্তি করেন, সেই চুক্তির জের টেনে চমৎকার কূটনৈতিক দক্ষতায় বাংলাদেশ ও তার স্বাধীনতার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি সোভিয়েত সরকারকে বোঝাতে সমর্থ হন যে, ভারতের মতই বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবে একটি সমাজতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। পৃথিবীর সেসময়ের শীর্ষশক্তি সোভিয়েত সরকার ইন্দিরা গান্ধীর বুদ্ধিদীপ্ত কূটনৈতিক দাবিকে অগ্রাহ্য করতে পারেননি, এখানেই ইন্দিরা গান্ধী তার বুদ্ধি দিয়ে পুরো যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেন। রুশ ছত্রছায়ার ফলেই ভারত চীনের হুমকি থেকে মুক্ত হয়ে আমাদেরকে সক্রিয়ভাবে সামরিক সাহায্য দেওয়া শুরু করেন। রাশিয়ার এই সমর্থন আমাদের মুক্তি সংগ্রামকে বিশ্ব পরিমণ্ডলে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলো, আর তা সম্ভব হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর মাধ্যমেই। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর কূটনৈতিক বিচক্ষণতা ছিল অসাধারণ। এক্ষেত্রে একটি ঘটনা উল্লেখ করা দরকার। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সাল, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকার গঠন হয়, ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আনুষ্ঠানিক শপথ নেয়। এর আগে ২৭ মার্চ ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় এক প্রস্তাবে অবিলম্বে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। এরপর ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানায়। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী তখন বিচক্ষণতার সঙ্গে ধীরে চলো নীতি ও কূটনৈতিক কৌশলের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি ১৩ এপ্রিল বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘পূর্ববাংলায় যা ঘটেছে, তাতে ভারত সরকার নীরব থাকবে না।’ 

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার পাশাপাশি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য একটি ট্রান্সমিটার বরাদ্দ করেন। পরে ১৭ মে ইন্দিরা গান্ধী যান পশ্চিমবঙ্গে। সবচেয়ে বেশি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল সেখানেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারকে এই বলে আশ্বস্ত করেন, শরণার্থী বিষয়ে কেন্দ্র তাদের পাশে আছে ও থাকবে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতে শরণার্থী আশ্রয় নেয় প্রায় ১ কোটি। ভারতীয় কমান্ডারদের প্রতি ইন্দিরার আদেশ ছিল, ‘আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তানি কামানগুলো নিস্তব্ধ না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের অভিযান চলবে।’ 

আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে সমর্থন দেবার পক্ষে জোরালো পদক্ষেপ নেবার পাশাপাশি অস্থায়ী সরকারকে ভারতের অভ্যন্তরে স্থান দেন। সর্বোপরি শরণার্থীদের সহায়তার পাশাপাশি মুক্তিবাহিনী গঠনে সার্বিক সহায়তা দিয়েছেন ইন্দিরা গান্ধী। বাংলাদেশের লাখ লাখ শরণার্থীকে সেবাযত্ন করায় ইন্দিরা গান্ধীর এ কাজকে যীশু খৃষ্টের কাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন নোবেলজয়ী মাদার তেরেসা। ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের শরণার্থীদের শুধু আশ্রয় ও লালন পালনের দায়িত্ব পালন করেই যে চুপ ছিলেন তা কিন্তু নয়। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, মেঘালয় এবং ত্রিপুরার সরকারদের স্ব স্ব স্থানে রিফিউজি ক্যাম্প এবং গেরিলা ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দশ দেন। রিফিউজির পাশাপাশি মুক্তিবাহিনী গেরিলাদের রিক্রুট করে নিয়ে এসে ট্রেনিং দেওয়া হয়। সবাই পায় গেরিলা প্রশিক্ষণ, ঘুরে দাঁড়ায় বাঙ্গালি, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ পেয়ে তারা সশস্ত্র অবস্থায় বাংলাদেশে প্রবেশ করতো এবং একের পর এক অপারেশন চালাতো। 

ইন্দিরা গান্ধী বিএসএফকে আনঅফিশিয়ালি নির্দেশ দেন বাংলাদেশি গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তি সংগ্রামে যতটুকু সম্ভব সাহায্য করতে এবং তাদেরকে এ ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়, সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কমান্ডো রেইড/ডেমোলিশনে দক্ষ ১০০ জন ব্যক্তি এবং কতিপয় অফিসার নিয়ে বিএসএফ কমান্ডো বাহিনী গঠন করে, যারা পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথেই পাকিস্তান বাহিনীর ওপর অতর্কিতে হামলা চালাতো এবং পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কার্যক্রমকে শ্লথ ও নস্যাত করে দিতো।

ভুটানের পর ভারতের পার্লামেন্টে বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সাথে সাথেই একদিকে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে সব ধরণের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে, অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সকল ধরণের সাহায্য সহযোগিতা বন্ধের ঘোষণা দেয়। এই প্রতিকূল অবস্থাতে থেকেও সময়োপযোগী সাহসী সিদ্ধান্তে অটল থাকা এবং বাংলাদেশকে আকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ তৎকালীন ইন্দিরা গান্ধী সরকারকে চিরজীবন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

বাংলাদেশের পক্ষে ইন্দিরা গান্ধীর এই কাজ মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হলেও নিজ দলের অনেক সংসদ সদস্য ও বিরোধীদের অনেক চাপ অগ্রাহ্য করে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিক্সন-কিসিঞ্জারের হুমকি ও রূঢ় আচরণের মুখেও তিনি ছিলেন অনড়। একটি তথ্য হয়তো আমার জানিনা, ১৯৭১ সালে ভারত প্রায় এক কোটির উপর শরণার্থীকে ভরণ পোষণ এবং আশ্রয় দেয়ার পর ভারতে যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয় তা কাটিয়ে উঠার জন্য ভারত সরকার একাত্তরের পর প্রায় বিশ বছর তার নিজ দেশের সরকারি কর্মচারি-কর্মকর্তাদের বেতন থেকে একটা নির্দিষ্ট অংশ কেটে নেয়। এই তথ্য জানার পর একটা প্রশ্ন অজান্তেই এসে যায়, ইন্দিরা গান্ধী যদি তখন প্রধানমন্ত্রী না থাকতেন তবে কতো সময় লাগতো এই স্বাধীনতা অর্জনের সে প্রশ্নের উত্তর আমাদের অজানা। 

১৯৭১ সালে আমাদের জাতীয় জীবনের এক ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য-সহযোগিতাকারী বিদেশি সব বন্ধু রাষ্ট্রের তালিকায় সবার ওপরে ভারতের স্থান। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা বন্ধ করা, স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি আদায় এবং পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির লক্ষ্যে বিশ্বজনমত গঠনে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দূতিয়ালি ও নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা কোনো দিনই ভোলার নয়। ভোলা যাবে না ভারতের বিভিন্ন জায়গায় শরণার্থী হিসেবে প্রায় এক কোটি উদ্বাস্তু অস্থিকঙ্কালসার মানুষের আশ্রয় প্রদান এবং চিকিৎসাসহ ১০ মাসব্যাপী তাদের ভরণপোষণের কথা। তাই দীর্ঘ সাড়ে ৯ মাস পর পাকিস্তানি বন্দিদশা থেকে মুক্তিলাভ করে স্বদেশের পথে পা বাড়িয়ে এ দেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে লন্ডনে যান। লন্ডন থেকে তিনি প্রথমে স্বাধীন দেশে স্বজনদের সঙ্গে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এই কৃতজ্ঞতা শুধু ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল না, এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ছিল গোটা বাঙালি জাতির, বাংলাদেশের। তেরঙ্গা-লাল সবুজ সম্পর্কের যে যাত্রা তারা শুরু করেছিলেন তা আজো বিদ্যমান। 

ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরে ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুতার সূচনা। তিনি শুধু বড় মাপের রাজনীতিক ছিলেন না বরং প্রকৃত অর্থেই তাকে স্টেটসম্যান বলা যায়। তার সহৃদয়তা এবং আগ্রাসী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ ১৯৭১ সালে আমাদের বিজয়কে অনেকাংশে ত্বরান্বিত করেছিল। আজকের এই দিনে বাংলাদেশ গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে তার অকৃত্রিম বন্ধুকে। 

লেখক: রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক। 

বিডি-প্রতিদিন/বাজিত হোসেন


আপনার মন্তব্য