শিরোনাম
প্রকাশ : ২৩ মার্চ, ২০২১ ০৮:৫০
আপডেট : ২৩ মার্চ, ২০২১ ১১:০৬
প্রিন্ট করুন printer

নিজের বায়োগ্রাফি নিজে লেখাটা খুব কঠিন

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

নিজের বায়োগ্রাফি নিজে লেখাটা খুব কঠিন
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
Google News

একটা মানুষ তার বায়োগ্রাফি তৈরিতে বসেছে। মাথায় কারুকাজ খচিত এতো দিনের ঘুমন্ত স্নায়ুগুলো একটু একটু করে নড়েচড়ে উঠেছে। মানুষটা স্মৃতিকে পাগলের মতো হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছে। মানুষটা খুব অবাক হলো। বিস্ময়ে কপালের ভাঁজটা আরও কুঁচকে গেলো। মানুষ অনেকের জন্মটা দেখতে পেলেও নিজের জন্মটা মানুষ নিজের চোখে দেখতে পায় না। বায়োগ্রাফি তৈরির এ জায়গাটাতে এসে কলমটা যেন থেমে গেলো। হাতটা যেন থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে পাথর হলো। 

আসলে মানুষ কোথাও কোথাও খুব অসহায়। যেখানে মানুষের  করার কিছুই থাকে না। মানুষ জন্মটা যেমন দেখতে পায় না, নিজের মৃত্যুটাও মানুষ দেখতে পায় না। মানুষ কত কি করতে পারে। তবে নিজের বায়োগ্রাফি লিখতে গিয়ে নিজের জন্ম তারিখটা লিখলেও নিজের মৃত্যুর তারিখটা লিখতে পারে না। মানুষের মৃত্যুটা যে খুব অনিশ্চিত। মানুষ যতই বড় হোক না কেন এখানটাতে তার কোনো হাত নেই। তাহলে মানুষ কখনো কি তার পূর্ণাঙ্গ বায়োগ্রাফি লিখতে পারে। বোধ হয় না। 

কবি সুকান্তের কথা মনে পড়ে গেলো। তিনি ছিলেন মানুষের কবি। তার কবিতাগুলো রোদে ঝলসিত আগুনের মতো। মাত্র একুশ বছর বয়সে অসাধারণ এই প্রতিভার মৃত্যু হয়। তাও সেটা যক্ষা রোগে। ১৯৪৭ সাল, তখন যক্ষা হলে মৃত্যু ছিল অবধারিত। কারণ তখনও যক্ষার ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। খুব কষ্ট হয়, কষ্টে বুকটা বিদীর্ণ হয়। এই আধুনিক সময় যক্ষাকে নির্মূল করতে পারে কিন্তু সে সাদাকালো সময় যক্ষার কাছে হেরেছিল। হয়তো কোনো কোনো মানুষের জন্য সময়টাও অসহায় হয়। আর্তনাদ আর হাহাকারের যন্ত্রনায় দগ্ধ হয়। সে সময়টাকে যদি হাতে পায়ে ধরে হলেও এ সময়ে নিয়ে আসা যেত তবে সুকান্তের মতো শক্তিধর কবির মৃত্যু ঠেকানো যেত। 

আমি মানুষ হয়ে নিজের বায়োগ্রাফি লিখছি নাকি আমার হাতের অনিয়ন্ত্রিত কলমটা অন্যের বায়োগ্রাফি লিখছে। বোঝাটা বোধ হয় খুব কঠিন। মানুষের শক্তি কতটুকু। উত্তর হয়তো এর নেই। যদি থাকে তবে যতটুকু সময় তাকে বোঝা টানার মতো টেনে নিয়ে যায় মৃত্যুর কাছাকাছি ততটুকু। তবে বায়োগ্রাফি এখানটায় খুব অসহায়। কারণ সময় মানুষকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যেতেই থাকে তবে কোথায়, কখন থামতে হবে তাতো সময়ও জানে না। সময়টাও হয়তো কখনো কখনো খুব অসহায় হয়। অথচ সময়কে কেন্দ্র করেই মানুষের বায়োগ্রাফিটা তৈরি হয়। এখন মনে হচ্ছে আমি কি লিখছি আমি নিজেও জানি না, হয়তো কেউ আমাকে লেখাচ্ছে। সে কেউ টাকে হয়তো কোনোদিনও খুঁজে পাব না। যেমন বায়োগ্রাফি লিখতে গিয়ে মানুষকে একটা ঠিকানা লিখতে হয়। সেটা কখনো কি মানুষের আসল ঠিকানা হয়ে উঠতে পারে। কে জানে। কারণ মানুষ যা জানে সেটাই তো অজানা আর যেটা অজানা সেটাই হয়তো জানা। যে ঠিকানাটা মানুষ লিখে সেটা একটা অস্থায়ী বসতি হতে পারে, স্থায়ী ঠিকানা হতে পারে না হয়তোবা। মানুষের দেহ মাটিতে থাকে, যে দেহ জীবনকে দেখতে দেখতে একদিন মাটিতে মিলিয়ে যায়। সে মাটির কোনো ঠিকানা থাকে না। তবে মানুষের মনের ঠিকানা থাকে। কারণ মন মানুষকে মানুষ বানায়। মানুষকে চেনায়। মনের মানুষ হয়ে মন মানুষের চিন্তাকে জানিয়ে দেয় তার পৃথিবীতে কতটা মূল্য। আমরা সময় থাকতে বুঝি না কোনটা মূল্যবান কোনটা মূল্যহীন। মূল্যহীনকে মূল্যবান বানিয়ে আমরা মূল্যবানকে মূল্যহীনের অপবাদ দেই। তাই বায়োগ্রাফি যার লেখার কথা সে লিখেনা বরং যার লেখার কথা ছিলনা সে লিখে। একসময় কয়লা পুড়িয়ে পুড়িয়ে স্টিম ইঞ্জিন দিয়ে রেলগাড়ি চলতো। সে পোড়া কয়লাটার দহন জ্বালা মানুষ ভুলে গিয়ে এখন বলছে ম্যাগনেটিক ট্রেনটাই ভালো। অথচ সে সময় কয়লা পোড়ানো রেল গাড়িটাই ভালো ছিল। হয়তো অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। সে সময়ের মানুষগুলো হয়তো নেই, তবে সেই সময়ের মানুষ থেকেই তো এই সময়ের মানুষের জন্ম হয়েছে ক্রমাগত জীবনের উত্থান পতনে।

নিজের বায়োগ্রাফি লেখার সময় মানুষ একদিন কি ছিল, কোথায় ছিল, এখন সে কোনো অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে সেটা মনে রাখাটা খুব দরকার। যেমন কয়লা পোড়ানো রেলগাড়িটা যদি মানুষ হয়, সেই মানুষটাই যখন ম্যাগনেটিক ট্রেন হয়ে যায় তখন তার শেকড়কে ভোলা ঠিক নয়। যে নিজের শেকড়কে চিনে সে কৃতজ্ঞ হয়। বিনম্র হয়। অবনত হয়। তখন বায়োগ্রাফিটা লিখতে কলম আর যান্ত্রিকতা লাগে না। মানুষের অলৌকিক শক্তি থেকে উত্থিত অদৃশ্য চিন্তার একটা মূল্যবোধ মানুষকে ধাক্কা দেয়। সেখানটায় মায়ের ছেঁড়া আঁচলের কষ্টটা শক্তি হয়ে তর তরিয়ে মানুষের বায়োগ্রাফিটা লিখে যায়। মানুষ যা লিখে তা তো বায়োগ্রাফি নয়। খুব বেশি হলে সেটা একটা কাগজে লেখা নিজের বড়াই, দম্ভ কিংবা অহংকার। তবে অহংকারের পতন ঘটে। এখন মানুষ বায়োগ্রাফি মানুষের কল্যাণে লিখে না, নিজের স্বার্থে লিখে। বড় বড় পদ পদবীর লোভে লিখে। ধন-সম্পদের পাহাড় বানাতে বাড়িয়ে চড়িয়ে নিজের গুণকীর্তন লিখে। মানুষ জানে সে যা লিখছে তা সত্য নয়, সে যা লিখছেনা হয়তো সেটাই সত্য। মানুষ যেটা কাগজে লিখছে   সেটা যখন মানুষ মন থেকে দেখছে তখন বুঝতে পারছে তার ভিতর আর বাহিরে যোজন যোজন পার্থক্য। মিথ্যেরা এখন খুব নড়েচড়ে বসেছে আর সত্যরা নাকি এখন ঘুমোতে খুব ভালোবাসে। 

বায়োগ্রাফি একটা কাগজ মাত্র। একটা কল্পনা মাত্র। যেটা আমি বায়োগ্রাফি বলেছি সেটা একটা উপমা মাত্র। যেটা আমি বলতে চাই সেটা বায়োগ্রাফির পিছনের একটা গল্প মাত্র। কারণ নিজের বায়োগ্রাফি নিজে লেখাটা খুব কঠিন। সেটা সবাই পারে না। যারা পারে তারাই পৃথিবী  বদলে দেয়। 

কোথায় যেন শুনেছিলাম পৃথিবীতে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটলে মানুষ সেটার বিষক্রিয়ায় মারা যাবে। তবে তেলাপোকারা নাকি তখনও বেঁচে থাকবে। কারণ তাদের দেহ পারমাণবিক বিষক্রিয়ার সাথে লড়ে জিততে জানে। এখানে তেলাপোকারা মানুষের চেয়ে শক্তিশালী। মানুষরা এখানেও অসহায়। একটা একটা অসহায়ত্বের অক্ষর দিয়ে মানুষের বায়োগ্রাফিটা লেখা হলে তা সব পরীক্ষায় পাশ করতে পারে। তবে যারা ফেল করে তারাও তো মানুষ। আর পাশ-ফেল নিয়েই তো জীবন। ফেলের বায়োগ্রাফিটা তাই ফেলে দেবার মতো নয়। যারা পৃথিবীতে একদিন ফেল করেছিল তারাই একদিন পৃথিবীর জীবন্ত ইতিহাস হয়েছে। খণ্ডিত-অখন্ডিত সময় তাই বায়োগ্রাফির অটোগ্রাফ নেবে বলে বসে আছে। যেখানে সব মানুষ, মানুষ নয়। যেখানে মানুষের অপেক্ষায় বসে আছে জয় কিংবা পরাজয়।

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন

এই বিভাগের আরও খবর