২ অক্টোবর, ২০২১ ০৯:০৮

মন্ত্রীদের ব্লেইম গেইম

সৈয়দ বোরহান কবীর

মন্ত্রীদের ব্লেইম গেইম

সৈয়দ বোরহান কবীর

২৮ সেপ্টেম্বর উদ্যাপিত হলো আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন। এবার বাংলার দুঃখী মেয়ের জন্মদিন পালিত হলো উৎসবের আমেজে। এমনকি শেখ হাসিনাকে যারা রাজনীতি থেকে বিদায় করতে চেয়েছিলেন তারাও প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে অনেক গভীর আলোচনা করেছেন। যেসব গণমাধ্যম একসময় শেখ হাসিনা রাজনীতিতে কিছুই দিতে পারেননি বলে তীব্র সমালোচনায় পত্রিকার পাতা ভরিয়েছিল, তারাও শেখ হাসিনার বন্দনায় শামিল হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর দেশে এক ঐক্যের আবহ তৈরি হয়েছিল। দল-মতের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দেশের প্রায় সব মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই যে বাংলাদেশ আজকের এ অবস্থানে এসেছে তা স্বীকার করতে কেউ কার্পণ্য করেনি। এ রকম একটি উৎসবমুখর দিনে বিকালে বিনা মেঘে বজ্রপাত ঘটল। হঠাৎ সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা), দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ প্ল্যাটফরম বাংলা নিউজ, বিডি নিউজসহ বেশকটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে গেল। এখন নানা কারণেই মানুষ অনলাইননির্ভর হয়ে পড়েছে। এখনো সকালে ঘুম থেকে উঠে যারা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ছাপা পত্রিকা পড়তে পছন্দ করেন তারাও সারা দিন বিভিন্ন অনলাইনে চোখ বুলিয়ে নেন সর্বশেষ খবরটা সঙ্গে সঙ্গে জানার জন্য। ২৮ সেপ্টেম্বর বিকালে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিপর্যয়ে এক আতঙ্ক তৈরি হলো। এটা কি হ্যাকারদের কাজ? নাকি সরকার এসব নিউজ পোর্টাল বন্ধ করে দিল? এ নিয়ে গুজবের ফ্যাক্টরি চালু হয়ে গেল দ্রুতই। বেশ কিছুক্ষণ পর জানা গেল সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন বিটিআরসি এসব বন্ধ করেছে। হাই কোর্ট ১৪ সেপ্টেম্বর এক আদেশ দিয়েছিল। ওই আদেশে বলা হয়েছিল ‘আগামী সাত দিনের মধ্যে অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল বন্ধ করে দিতে হবে।’ ২৮ সেপ্টেম্বর ছিল সপ্তম দিন। কাজেই বিটিআরসি তাদের ‘নিখুঁত এবং নিপুণ’ কর্মব্যস্ততা শুরু করল সেদিনই। তা-ও আবার বন্ধ করা শুরু হলো নিবন্ধিত নিউজ পোর্টালগুলো। বিটিআরসির কর্মতৎপরতায় গোটা জাতি হতবাক। গণমাধ্যমে যখন এ নিয়ে হুলুস্থূল ঠিক তখনই ত্রাতা হিসেবে আবিভর্‚ত হলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি নিউজ পোর্টাল বন্ধের কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দিলেন। যেগুলো বন্ধ হয়েছে সেগুলো চালুর জন্য বললেন। বিটিআরসি কেন এ রকম অদ্ভুত কান্ড করল এ প্রশ্নের জবাব দিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী অসাধারণ, অদ্ভুত এবং অবিশ্বাস্য অজুহাত দিলেন। তিনি গণমাধ্যমকে বললেন, ‘অনিবন্ধিত ওয়েবসাইটের তালিকা না পাওয়ায় এ রকম ঘটেছে।’ মোস্তাফা জব্বার বললেন, ‘তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে অনিবন্ধিত সাইটের তালিকা চাওয়া হয়েছে তা সময়মতো পাওয়া যায়নি।’ মন্ত্রীর বক্তব্য শুনে আমি ভিরমি খেলাম। ভাবলাম কোথাও ভুল হচ্ছে। একাধিক গণমাধ্যমে দেখলাম তার বক্তব্য একই। তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে অনিবন্ধিত অনলাইনের তালিকা থাকবে কীভাবে? তথ্য মন্ত্রণালয় বিটিআরসির নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালের তালিকা দিতে পারবে। দুই দফায় তথ্য মন্ত্রণালয় ৯২টি অনলাইন নিউজ পোর্টালকে নিবন্ধিত করেছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন আছে হাজারখানেকের বেশি। একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিবন্ধন চলমান আছে। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘অনলাইনে নিউজ পোর্টাল একটি চলমান প্রক্রিয়া।’ তিনি যথার্থই বলেছেন। ছাপা পত্রিকাও যেমন একটি চলমান প্রক্রিয়া। অনেক ধাপ পেরিয়ে একটি পত্রিকাকে ডিক্লারেশন বা প্রকাশনা ছাড়পত্র নিতে হয়। অনেক ধাপ পেরিয়ে একটি টেলিভিশন সম্প্রচার ছাড়পত্র পায়। তেমনি অনলাইন নিউজ পোর্টালের ক্ষেত্রেও একটি নীতিমালা ও নিবন্ধন পদ্ধতি চালু করেছেন তথ্যমন্ত্রী। এ কাজের জন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। যে ৯২টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ছাড়পত্র পেয়েছে সেগুলোই আইনসিদ্ধ এবং বৈধ। ডিক্লারেশন ছাড়া একটি পত্রিকা যেমন এক দিনও প্রকাশিত হতে পারে না, লাইসেন্স ছাড়া একটি টেলিভিশন চ্যানেল যেমন এক সেকেন্ডও সম্প্রচারে যেতে পারে না, তেমনি অনিবন্ধিত নিউজ পোর্টালও চলতে পারে না। অনলাইন নিউজ পোর্টাল বন্ধ করার ক্ষমতা আছে বিটিআরসির। কাজেই নিবন্ধিত ৯২টির বাইরে যা আছে সব বন্ধ করার দায়িত্ব এ সংস্থার। নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালের তালিকা তথ্য মন্ত্রণালয়ে আছে। কিন্তু অবৈধ বা অনিবন্ধিত তালিকা কেন তথ্য মন্ত্রণালয়ে থাকবে? বিটিআরসির কাজ হলো তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে নিবন্ধিত অনলাইনের তালিকা নিয়ে এ তালিকার বাইরে যেগুলো আছে তা বন্ধ করে দেওয়া। মোস্তাফা জব্বার অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টালের তালিকা চাইবেন কেন? ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য মন্ত্রণালয় কত দূর? এ তালিকা তো তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও আছে। মন্ত্রীর অজুহাতে আমি বিস্মিত, হতবাক। হাই কোর্ট ১৪ সেপ্টেম্বর বলেছে। পরদিন বিটিআরসি বৈধ অনলাইনের তালিকা তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে আনবে। তারপর বন্ধ প্রক্রিয়া শুরু হবে। বিটিআরসি কি এতই অজ্ঞ যে তারা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা চেনে না? প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে কেন তাদের এ কাজ করতে হবে? এটা কি অযোগ্যতা, দায়িত্বহীনতা না স্যাবোটাজ। ২৮ সেপ্টেম্বর যখন বাসস, বাংলা নিউজ, বিডি নিউজ বন্ধ করা হলো তখন নেত্র নিউজ, নাগরিক টিভির অনলাইন বহাল তবিয়তে চলছিল। বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিরোধী কিছু চক্র অনলাইন নিউজ পোর্টালের নামে এখন সাইবার সন্ত্রাস চালাচ্ছে। হাই কোর্ট এ নিয়ে কয়েকবার যথার্থভাবেই কঠিন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। কিন্তু বিটিআরসির এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর এসব রাষ্ট্রবিরোধী অনলাইনের ব্যাপারে কেন জানি আলাদা দরদ আছে বলে মনে হয়। এজন্য তিনি এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করেন নিপুণ হাতে। পরম মমতায়। বাংলাদেশবিরোধী, সরকারবিরোধী অপপ্রচার এবং কুৎসিত নোংরা আক্রমণ হয় বিদেশ থেকে। চিহ্নিত কিছু ব্যক্তি লন্ডন, সুইডেন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে বসে এসব গোয়েবলসীয় মিথ্যাচার ছড়াচ্ছে। এখন দেশে ভুঁইফোড়, অনিবন্ধিত এবং অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন গুজব ছড়াচ্ছে। বিদেশে প্রচারিত মিথ্যাচার বাংলাদেশে রিমেক হচ্ছে। নাগরিক টিভি, কনক সরওয়ার, ইলিয়াস হোসেনের নর্দমার আবর্জনা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে এসব অনলাইন সাইট। হাই কোর্ট এর আগেও বিদেশ থেকে প্রচারিত এসব মিথ্যাচার বন্ধে বিটিআরসিকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিল। তখনো মন্ত্রী বললেন, তিনি অসহায়। এবার দায় চাপালেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে। অনেকে বলেন, বাঙালির নাকি তিনটি হাত। ডান হাত, বাঁ হাত আর অজুহাত। সাইবার জগতে নিয়ন্ত্রণহীন স্বেচ্ছাচারিতা শৃঙ্খলায় আনতে ব্যর্থ মন্ত্রী নানা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছেন। অন্যের ওপর অবলীলায় দায় চাপাচ্ছেন। ব্লেইম গেইমে অবশ্য মন্ত্রীরা এখন অনেক পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। বিমানবন্দরে আরটি-পিসিআর ল্যাব বসানোর কথাই ধরা যাক। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ৪১ দিন পর ২৯ সেপ্টেম্বর এ ল্যাব চালু হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী প্রবাসীরা এখন যেতে পারছেন। কিন্তু এ ৪১ দিন যে ‘পিলো পাসিং’ খেলা হলো তার খেসারত দিতে হলো আমাদের প্রবাসীদের। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে ল্যাব বসাতে। এরপর তিন মন্ত্রণালয়ের টানাহেঁচড়া শুরু হলো। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলল, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ল্যাবের নাম দিতে দেরি করছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলল, সিভিল এভিয়েশন জায়গা দিচ্ছে না। মন্ত্রীদের কথার যুদ্ধে সাধারণ মানুষ দিশাহারা। কে সত্য কে মিথ্যা- কে বলবে। মন্ত্রী মানেই মহান। মন্ত্রী মানেই মাননীয়। এভাবে এক মাস চলার পর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব নিজে উদ্যোগ নিয়ে বিমানবন্দরে গেলেন। দুই মন্ত্রীকে নিয়ে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে স্থান চূড়ান্ত করলেন। তা না হলে এ ল্যাব বসতে আরও কত দিন লাগত কে জানে। অনেকেই প্রশ্ন করেন, প্রধানমন্ত্রী কেন সব দেখেন, অন্য মন্ত্রীদের কি কাজ নেই? বিমানবন্দরে ল্যাব বসানোর ঘটনায় প্রমাণ হয়ে গেল প্রধানমন্ত্রী ছাড়া দেশে কিছুই হয় না। মন্ত্রীরা পারেন অজুহাত দিতে, অন্যের ওপর দায় চাপাতে, দায়িত্বহীন কথাবার্তা বলে বিতর্ক ছড়াতে। বিমানবন্দরে ল্যাব বসানো নিয়ে ব্লেইম গেইমের অন্যতম খেলোয়াড় আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি এখন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। সমালোচনায় ডরে না বীরের মত। তিনি কখন কী বলেন তা যদি মনে রাখতেন তাহলে নিজেই নিজের কান্ডে কৌতুক অনুভব করতেন। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। প্রথম দফায় গণটিকা নিয়ে বিশ্রী কান্ড হলো। গণটিকার নামে গণহয়রানি হলো। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনে মনে বললেন, ‘থুক্কু’। ভবিষ্যতে তিনি আর টিকা কর্মসূচিতে ‘গণ’ শব্দটি ব্যবহার করবেন না বলে ঘোষণা দিলেন। গণমাধ্যমকে বললেন, ‘আর গণটিকা কর্মসূচি হবে না।’ কিন্তু কদিন পর সেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে গণটিকা কর্মসূচি হবে। ৮০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হবে।’ ৮০ লাখ কেন, এ নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষ একটু বিভ্রান্তিতে পড়লাম। পরদিন দেখা গেল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞাপন। সে বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য। ২৮ সেপ্টেম্বর বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সারা দেশে ৭৫ লাখ ডোজ কভিড-১৯ ভ্যাকসিন প্রদান করা হবে’। পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় মন্ত্রীর ৮০ লাখ টিকা দেওয়ার ঘোষণা। শেষ পৃষ্ঠায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের ৭৫ লাখ টিকা দেওয়ার বিজ্ঞাপন। কে সত্য? মন্ত্রী না অধিদফতর? মন্ত্রী তাঁর দায় অবশ্যই এড়াতে পারেন। দুই ভাবে তিনি অবলীলায় অন্যের ঘাড়ে দোষটা চাপিয়ে দিতে পারেন। প্রথমত, তিনি বলতে পারেন সাংবাদিকরা তার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি আসলে ৭৫ লাখই বলেছিলেন, সাংবাদিকরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সুনাম নষ্টের জন্য ৮০ লাখ বানিয়েছেন। গণমাধ্যম স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সারাক্ষণ লেগে থাকে। তাই দুষ্টেরা এটা করতেই পারে। অথবা তিনি এটাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারেন। (এ কাজের জন্য তাঁর জুড়ি মেলা ভার)। বলেছি তো কী হয়েছে। মন্ত্রী হয়েছি বলে কি মেপে মেপে কথা বলতে হবে! স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবশ্য এ রকমই। কোনো কিছুতেই যে তাঁর যায় আসে না। জাতীয় সংসদে তিনি সহাস্যবদনে বলেন, ‘সমালোচনা আমাকে শক্তিশালী করে।’ কদিন আগে স্বাস্থ্যের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে সাহেদ কেলেঙ্কারি মামলায় চার্জশিট হলো। প্রথমে দুর্নীতি দমন কমিশন যে এজাহার দিয়েছিল তাতে স্বাস্থ্যের সাবেক মহাপরিচালকের নাম ছিল না। কিন্তু মামলার তদন্তে দুদক আবুল কালাম আজাদের সম্পৃক্ততা পায়। চার্জশিট হওয়ার পর প্রতারক সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্যের মহাপরিচালকের চুক্তি স্বাক্ষরের ছবি অনেক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে যখন স্বাস্থ্য অধিদফতর চুক্তি করে তখন সাহেদের ওই হাসপাতালের অনুমোদনই ছিল না। সেই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের ছবিতে দেখলাম স্বাস্থ্যমন্ত্রী মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন। পরে সাবলীলভাবে অভিযোগের বালিশটা তিনি আবুল কালাম আজাদের হাতে ছুড়ে দিয়েছিলেন। সাহেদ ধরা পড়ার পর মন্ত্রী বললেন, ‘আমি এসবের কিছুই জানি না। স্বাস্থ্য অধিদফতরে একটা অনুষ্ঠানে গেছি। ডিজি সাহেব বললেন একটা চুক্তি স্বাক্ষর হবে। আমি থাকলাম।’ আহারে! মন্ত্রী কিছু না জেনে না বুঝে মাঝের চেয়ারে বসে গেলেন! এ ব্লেইম গেইমে মন্ত্রী জয়ী হয়েছেন। দুদক তা-ও চক্ষুলজ্জার খাতিরে সাবেক সচিব আসাদুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। (তা-ও সচিবের দফতরে গিয়ে)। কিন্তু মন্ত্রী কেন সেখানে বসে ছিলেন সে প্রশ্নের উত্তর জানতে মন্ত্রীর কাছেও যাননি তদন্ত কর্মকর্তা। কাজেই মন্ত্রী হলে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নির্বিঘ্নে পাড় পাওয়া যায়। তবে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর আগে একটু দেখতে হবে ঘাড়টা কার। এটা যদি আবার আরেকজন মন্ত্রী হন তখন ব্লেইম গেইমটা একটু জটিল হয়ে যায়। যেমন ই-কমার্স নিয়ে সম্প্রতি কী হলো। সবার নাকের ডগায় ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা সারা দেশে শোরগোল করল। মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ল। মানুষের পকেট কেটে হাজার কোটি টাকা লোপাট হলো। কেউ কিছু বলল না। এসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কি ঘুমিয়ে ছিল? সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ১১ জন সাংবাদিক নেতার ব্যাংক হিসাব তলব করেছে। কই ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকার ব্যাংক হিসাব তো কখনো তলব করা হয়নি। হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর এখন তাদের ব্যাংকে লাখ টাকা! কোথায় ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের ইনটেলিজেন্স ইউনিট? এত অস্বাভাবিক লেনদেন হওয়ার ঘটনায় তো বাংলাদেশ ব্যাংক এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নজরদারির মধ্যে আনতে পারত। কিন্তু এসব কিছুই করা হয়নি। প্রকাশ্যে লুটপাটের মহোৎসবের পর এখন এ নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হলো। আবারও সেই ব্লেইম গেইম। আবার সেই পিলো পাসিং। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, আমাদের দায়দায়িত্ব নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক দেখেনি কেন? আবার অর্থমন্ত্রী বললেন, ‘দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে। কারণ তারাই ব্যবসার অনুমতি দিয়েছে।’ কার দায় তা নির্ধারণের যে অদ্ভুত খেলা চলছে তাতে গ্রাহকের টাকা প্রাপ্তি অনিশ্চিত হয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এত দিন কোথায় ছিলেন। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা এক দিনে টাকা লোপাট করেনি। প্রতিদিন করেছে। সবার সামনে করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় কি চেয়ে চেয়ে দেখেছে না ঘুমিয়ে ছিল? এখন সব শেষ হওয়ার পর এ অস্থির তৎপরতা কেন।

তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম প্রধান সমস্যা সমন্বয়হীনতা। এক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অন্য মন্ত্রণালয়ের কাজের সমন্বয় নেই। সরকার পরিচালনার রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী মন্ত্রীরা মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী। কাজেই মন্ত্রণালয়ের কাজের দায় তাদেরই। জানি না, বুঝি না, বিষয়টি আমি করিনি ইত্যাদি নানা অজুহাত দিয়ে দায় এড়ানো যাবে না। আবার বাংলাদেশে প্রায় কাজই একাধিক মন্ত্রণালয়কে মিলেমিশে করতে হয়। আমরা করোনাকালে দেখেছি মিলেমিশে একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে সরকারের মন্ত্রীদের কি অনীহা। পোশাক শিল্পকারখানা খোলা হলো। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানেন না। কলকারখানা খোলা হলো, গণপরিবহন বন্ধ। গণপরিবহন চলল, আবার বলা হলো অর্ধেক গাড়ি চলবে। সমন্বয়হীনতার চরম স্বেচ্ছাচারিতা আমরা দেখছি গত প্রায় দুই বছর। যার যেটা কাজ সেটা তিনি করছেন না। সবাই সবকিছুর জন্য তাকিয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রীর দিকে। প্রধানমন্ত্রীকে দিনান্ত পরিশ্রম করে সবকিছু করতে হচ্ছে। বাকি মন্ত্রীদের কেউ কেউ যেন কিছুই জানেন না। কিন্তু যখনই তারা ব্যর্থ হচ্ছেন, অযোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন তখনই দোষ চাপাচ্ছেন অন্যের ঘাড়ে। এতে জনগণের ভোগান্তি হচ্ছে। সবচেয়ে ক্ষতি হচ্ছে সরকারের। জনগণ সরকারের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। মন্ত্রীদের ব্লেইম গেইমে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারই।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।


বিডি প্রতিদিন/ ওয়াসিফ

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর