১৬ নভেম্বর, ২০২১ ২০:২৭

কুড়িগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে আঞ্চলিক উন্নয়ন স্তম্ভ

ড. মো. ফরহাদ হোসেন

কুড়িগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে আঞ্চলিক উন্নয়ন স্তম্ভ

ড. মো. ফরহাদ হোসেন

জন্মভূমি কুড়িগ্রাম জেলার প্রতি আর দশজনের মতো আমারও অক্ষয় ভালোবাসা থেকে বলছি, এখানে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণার মধ্য দিয়ে আমাদের আজন্ম লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সূচিত হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন; কুড়িগ্রাম জেলাবাসীর জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয় তারই স্মারক। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২০ সালের ৪ মে বাংলাদেশের দরিদ্রতম জেলা কুড়িগ্রামে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেন। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন এবং আরও কিছু প্রক্রিয়া শেষে ২০২১ সালের ২৮ জুন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বিলটি একাদশ জাতীয় সংসদের ১৪তম অধিবেশনে উপস্থাপন করেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে 'কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়' বিলটি উত্থাপিত ও গৃহীত হয় এবং ১৫ সেপ্টেম্বর আইনটি পাস হয়। 

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কৃষি খাতে উদ্ভাবনী সুযোগ সৃষ্টি, সহায়তা ও উৎসাহ প্রদান, টেকসই কৃষি প্রযুক্তি, উচ্চ ফলনশীল কৃষিজ দ্রব্যের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এ বিশ্ববিদ্যালয়েও চ্যান্সেলর, ভাইস চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর এবং অন্যান্য কর্মকর্তা থাকবেন। সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল ও অন্যান্য সংস্থা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। আইনে বিশেষায়িত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভিজিটিং অধ্যাপক, ইমেরিটাস অধ্যাপক, পরামর্শক, গবেষণা সহকারী বা অন্যান্য ব্যক্তিকে বিভিন্ন বাছাই বোর্ডের মাধ্যমে নিয়োগ করা যাবে।
কুড়িগ্রাম বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া জনপদগুলোর অন্যতম। দারিদ্রের হার ২০১৪ সালে ৬৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ৭০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কৃষকরত্ন শেখ হাসিনার পরপর তিনবারের শাসনামলে কিছু সুদূরপ্রসারী উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়ায় কুড়িগ্রাম থেকে দরিদ্রতা কিছুটা হলেও দূরীভূত হয়েছে। তবুও বাস্তবতা হলো, কুড়িগ্রাম জেলার মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এখনও লক্ষ্য থেকে বহু দূরে। এর কারণ- বন্যা, হঠাৎ বন্যা, নদীভাঙন এবং আগের সরকারগুলোর শাসনামলে কুড়িগ্রাম জেলার উন্নয়নে তেমন নজর না দেওয়া। 

অতীতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কুড়িগ্রামের উন্নয়নে টেকসই কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে দায়সারা গোছের দায়িত্ব পালন করেছে। ৪২০টি মতো চর এবং ১৬টি নদীর এক যুগলবন্দির বেড়াজালে যেন আটকে আছে কুড়িগ্রাম জেলার উন্নয়ন। প্রতি বছর বন্যার শুরু এবং শেষে এসব চরাঞ্চলের মানুষ তাদের বাড়িঘর, গবাদি পশু-পাখি এক চর থেকে অন্য চরে স্থানান্তর করে। কয়েক বছর পর আবার বাড়িঘর, গবাদি পশুসহ অন্য চরে বসতি গড়ে। এভাবেই যুগ যুগ ধরে চলে তাদের ভাঙা-গড়ার জীবন। এ নিবন্ধকারের বাড়ি পাঁচবার ভাঙার পর এ-চর ও-চর করে এখন ষষ্ঠতম আবাসে বসতি। 

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে শিক্ষার গুণগত মান বাড়বে এবং জেলাটি অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনেক ধাপ এগিয়ে যাবে। যে কোনো নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত এবং একাডেমিক রূপরেখায় মূলত দুটি বিষয় থাকে। একটি, এর ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, অন্যটি দক্ষ জনবল নিয়োগ। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও দুটি বৈশিষ্ট্য আছে যেমন- স্থান নির্বাচন এবং ছাত্রছাত্রী ভর্তির যোগ্যতা। যেহেতু এটি একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়; এর অবকাঠামো নির্মাণশৈলী এবং ল্যান্ডস্কেপিং সুন্দর এবং ঐতিহাসিক না হলে দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানীদের নজর কাড়বে না। সুতরাং শুরুতেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ, ভবনগুলোর রং, পর্যাপ্ত রাস্তা, পরিকল্পিত গবেষণা মাঠ, মৎস্য গবেষণার পুকুর, প্রাণী গবেষণা ও উন্নয়নের পর্যাপ্ত চারণভূমি, ছাত্রছাত্রীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও খেলাধুলার পর্যাপ্ত সুযোগ এবং দেশি-বিদেশি গবেষক ও ছাত্রছাত্রীর আকর্ষণে প্রস্তাবিত সুযোগ-সুবিধা আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। সব ভবন হবে একই রঙের এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে এমন কিছু ভবন নির্মাণ করতে হবে, যাতে শতবছর পরও এর নির্মাণশৈলী দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। ভূমি অধিগ্রহণের পরপর ভূমি উন্নয়নে কাজ করতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে একটি অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান দিয়ে এর ল্যান্ডস্কেপিংয়ের কাজ করে ভবন ও রাস্তা নির্মাণ শুরু করতে হবে। মোটকথা, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগুলোর নির্মাণশৈলীতে নান্দনিকতার ছোঁয়া থাকবে, যা হবে ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া ও গবেষণার মানোন্নয়নে সহায়ক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো দক্ষ ও যোগ্য জনবল নিয়োগ। বিশেষ করে মেধাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ করলে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই একদিন দেশ-বিদেশে সুনাম কুড়াবে। এসব মেধাবী শিক্ষকের মেধার সঠিক বিকাশে পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি এবং ভালো আবাসনও নিশ্চিত করতে হবে। মেধাসম্পন্ন শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে। 

এটা ঠিক, দেশের প্রতিষ্ঠিত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ ও এর পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত চরিত্র ও স্বাতন্ত্র্যও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। কুড়িগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে আঞ্চলিক উন্নয়ন স্তম্ভ। যেমন একটি বিশেষায়িত অনুষদ হতে পারে 'জলবায়ু পরিবর্তন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদ'। কারণ কুড়িগ্রামসহ রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি এবং কৃষক, যার প্রভাব পড়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায়। অনুন্নত দেশ এবং অনুন্নত দেশের দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলগুলোর জন্য বিশেষায়িত কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। যার ফলে ওই অঞ্চলের মানুষ কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েই এ ধরনের বা এ নামে কোনো অনুষদ নেই। কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের একটি অনুষদ থাকলে যে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে, তারা দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়ক অনুষঙ্গ নিয়ে কাজ করবে; মানুষকে সচেতন করবে এবং আগাম সতর্কতা বা দুর্যোগ-পরবর্তী মোটিভেশন বিষয়ে কৃষক বা ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরামর্শ দিতে পারবে। 

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদেও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু নতুন বিষয় পাঠ্যক্রমে থাকতে পারে। কৃষকরত্ন শেখ হাসিনার পরপর কয়েকবারের শাসনামলে তার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবুও বাংলাদেশে কৃষির গড় উৎপাদন অন্যান্য যে কোনো দেশের তুলনায় কম। নতুন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধির এ চ্যালেঞ্জ নিতে পারবে। পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক ফসলের ফলন বৃদ্ধিতেও অবদান রাখার সুযোগ আছে। কুড়িগ্রাম জেলা চরবেষ্টিত এক দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। চরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কৃষি অনুষদের পাঠ্যক্রম সাজানো যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর কুড়িগ্রাম জেলার প্রতি বিশেষ নজর আছে বলেই এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। সুতরাং এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও ছাত্রছাত্রীদের এ বিষয়টি সব সময় মনে রেখে গবেষণার মাধ্যমে এ দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখতে হবে।

কুড়িগ্রাম ছোট শহর হলেও এখানে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ গৃহস্থালি এবং শহরের বর্জ্য জমে, যা ব্যবস্থাপনা করার মতো জায়গার যেমন অভাব, তেমনি বিপুল পরিমাণ এসব বর্জ্য যত্রতত্র পড়ে থেকে পরিবেশ দূষণ করে এবং জনজীবনে দুর্ভোগ ছড়ায়। কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রজেক্টের মাধ্যমে এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে দক্ষ জনবল দিয়ে ট্রিটমেন্ট করে একদিকে জৈব সার তৈরি; অন্যদিকে গ্যাস উৎপাদন করে গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করা যায়। কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা এবং আবাসিক হলগুলোতেও এ ধরনের বর্জ্য তৈরি হবে, যা এই ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে আইসোলেশন করে জৈব সার ও গ্যাস তৈরি করা যাবে। এতে কুড়িগ্রাম শহর এবং এর আশপাশের পরিবেশের উন্নয়ন হবে।
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আকর্ষণীয় করতে হলে যেমন পরিকল্পিত গাছপালা লাগাতে হবে, তেমনি দেশি-বিদেশি গাছ, ফুল-ফলের এক বোটানিক্যাল গার্ডেন তৈরি করতে হবে। 'শেখ রাসেল বোটানিক্যাল গার্ডেন' নামে এ উদ্যান হতে পারে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গাছপালায় সমৃদ্ধ, যা দেখতে স্কুল-কলেজ এবং গ্রামগঞ্জের মানুষ আসবে। উচ্চশিক্ষার একটা তাড়না ওইসব ছেলেমেয়ের মাঝে ছোটবেলা থেকেই তৈরি হবে। কুড়িগ্রামে শিক্ষার হার বাড়বে এবং এ অঞ্চল অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনেক এগিয়ে যাবে।

লেখক: অধ্যাপক এবং ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনাবিষয়ক পরিচালক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

বিডি প্রতিদিন/হিমেল

সর্বশেষ খবর