শিরোনাম
প্রকাশ : ১ জানুয়ারি, ২০২০ ১২:৩৭

একজন বৃদ্ধা ও দুপুরের খাবার

নাইম আবদুল্লাহ

একজন বৃদ্ধা ও দুপুরের খাবার
প্রতীকী ছবি

রবিবার ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে সিডনির ডি হুই বীচে গেছি। এবার সামার শুরু হওয়ার আগ থেকেই বীচগুলোতে ভীষণ ভিড়। বীচে গেলে আমার কেন জানি পানিতে নামতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় এই বিশাল সমুদ্রের নিজেরই তো দুঃখ কষ্টের শেষ নেই। পানিতে নেমে আমার সব দুঃখ কষ্ট অবলীলায় সমুদ্রের পানিতে মিশিয়ে দেয়ার কোন মানে হয় না।

স্ত্রী পুত্র হৈ চৈ করে সমুদের পানির দিকে ছুটে গেলো। আমি তাদের ব্যাগ নিয়ে বীচের পাশের একটি বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাম। দেখলাম বেঞ্চিতে একজন কোরিয়ান বৃদ্ধা বসে আছে। আমাকে বসতে দেখে সে জায়গা ছেড়ে ওপাশে গিয়ে বসলো। আমার মোবাইলের চার্জ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। তাই মোবাইল টিপাটিপি করতে পারছি না। কিছুক্ষণ সমুদ্রের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ধরে এলো।

আমি বৃদ্ধার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু সে একেবারেই ইংরেজি বুঝতে পারে না। ইশারা ইঙ্গিতে সে কার সাথে এখানে এসেছে জানতে চাইলাম। সে দূরে বীচের বালুতে বসা তরুণ বয়সী এক পরিবারকে দেখিয়ে দিলো।

সেখানে স্বামী-স্ত্রী ও সাত আট বছর বয়সী একটা ছেলে বসে স্যান্ডউইচ, জুস আর ফল দিয়ে লাঞ্চ করছে। আমি বৃদ্ধাকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম, তুমি লাঞ্চ করবে না?

বৃদ্ধা কি বুঝলো জানি না। সে একটু এগিয়ে গিয়ে ঐ পরিবারকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলল। পরিবারের কেউই প্রথম দিকে তার কথা কানে তুললো না। অবশেষে নিরুপায় হয়ে বাবা মা তার ছেলেটিকে দিয়ে বৃদ্ধার জন্য এক গ্লাস পানি পাঠালো। বৃদ্ধা পানির গ্লাস হাতে নিয়ে আমার দিকে লজ্জিত ভঙ্গিতে তাকালো। কিচ্ছুক্ষণ পর আমার দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখে জুসের মতো অল্প অল্প করে পানি চুমুক দিতে দিতে তার ভাষায় কিছু বললো।

হয়তো লজ্জার হাত থেকে বাঁচার জন্য সে আমাকে বুঝালো, 'আসলে আমার বয়স হয়েছে তো তাই দুপুরের লাঞ্চে পানি ছাড়া কিছু খাইনা।'

আমি সামনের বালুতে বসা পরিবারটির দিকে তাকালাম। দেখলাম বাবা-মা লাঞ্চ শেষ করে সমুদ্রে নামছে আর ছেলেটি আপন মনে আশেপাশের বালু জমা করে বালুর ঢিবি বানাচ্ছে। আমি বেঞ্চি ছেড়ে পায়ে পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেলাম।

ছেলিটি আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে চিনতে পেরে আবার তার খেলায় ব্যস্ত হয়ে গেলো। আমি তার সাথে ভাব জমানোর জন্য তার পাশে বসে বললাম, বাহ! তুমি তো চমৎকার বালুর বাসা বানাও।

সে মাথা নিচু করেই আমাকে জানালো, তার বীচের বালিতে বাড়ি, দোকান, রাস্তা ইত্যাদি বানাতে ভালো লাগে। বড় হয়ে বাস্তবে এসব বানানোর তার খুব ইচ্ছা।

আমরা দুজন পরিচিত হয়ে আমাদের নাম বললাম। কথায় কথায় ঝু জানালো, বেঞ্চে বসা বৃদ্ধা তার দাদী। তার দাদা মারা যাওয়ার পর গত পাঁচ বছর ধরে তাদের সাথেই সিডনিতে থাকে। তার মা বৃদ্ধাকে দুপুরে তেমন কোন খাবার দেয় না। সকালে সিরিয়াল আর রাতে ভাত কিংবা নুডুলস দেয়। এই নিয়ে তার দাদী হৈ চৈ আর খুব মন খারাপ করে।

তার মা বলে, বৃদ্ধাদের দুপুরে খেলে শরীর খারাপ করে। তাই ঝু’ও তার মার মতো দাদীর শরীর খারাপ হবে ভেবে তাকে কিছু খেতে দেয় না।

আমি মন খারাপ নিয়ে বৃদ্ধার পাশের বেঞ্চিতে এসে বসি। দেখি বৃদ্ধা একটা বই খুলে গভীর মনোযোগ দিয়ে কোরিয়ান ভাষায় হয়তো ক্ষুধা তাড়ানোর মন্ত্র পড়ছে।  

দূরে দেখতে পেলাম আমার স্ত্রী-পুত্র সমুদ্র থেকে ফিরে আসছে। আমি বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে ইশারায় বিদায় চাইলাম। বৃদ্ধা বই থেকে মাথা উঠিয়ে আমার দিকে তাকালো। আমি তার ভেজা চোখ দেখতে পেলাম। মনে মনে বললাম, উঠে এসো, চল আমাদের সাথে। আমার ছেলেটা দুপুরে যা খায় তুমিও তাই খাবে।

বিদায় নিয়ে বেশ কিছুটা এগোনোর পর আবার আমি পিছন ফিরে বৃদ্ধার দিকে তাকালাম। বৃদ্ধা করুণ দৃষ্টিতে আমার গমন পথের দিকে তাকিয়ে আছে। তাহলে সে কি আমার কথা বুঝতে পেরেছে?

লেখক: সিডনি প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক

বিডি প্রতিদিন/হিমেল


আপনার মন্তব্য