শিরোনাম
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল, ২০২১ ২১:১২
প্রিন্ট করুন printer

দাম বাড়লে তামাকের, জীবন বাঁচবে তরুণদের

ডা. শেখ মুহাম্মদ মাহবুবুস সোবহান

দাম বাড়লে তামাকের, জীবন বাঁচবে তরুণদের

অর্থনীতির খুব প্রাথমিক একটি সূত্র হচ্ছে, যেকোনো পণ্যের দাম বাড়লে চাহিদা কমবে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তামাকও এই সূত্রের বাইরে নয়। তাই প্রতিবছর বাজেট আসলেই বিভিন্ন তামাকবিরোধী সংগঠন তামাকদ্রব্যের দাম বাড়ানোর দাবি তোলে। সেই দাবি আমলে নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতিবছরই বিড়ি-সিগারেটের দাম কিছু পরিমাণ বাড়ায়। তবে তা কেবল শুভঙ্করের ফাঁকি।

কিন্তু এই দাম বৃদ্ধির পরও বিশ্বে তামাকদ্রব্যের দাম সবচেয়ে কম—এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০১৮ সালের একটি রিপোর্ট অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ায় মিয়ানমারের পরেই বাংলাদেশে সবচেয়ে কম দামে সিগারেট পাওয়া যায়। আর বিড়ি ও জর্দা-গুলের মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যগুলো আরও সস্তা।

তামাকপণ্যের এই সহজলভ্যতা তামাকের ব্যবহার কমানোর পিছনে অন্যতম বড়ো প্রতিবন্ধকতা। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭ অনুসারে এখনো দেশের পৌনে চার কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক সেবন করে। তামাকের এই বহুল ব্যবহার জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। টোব্যাকো এটলাসের রিপোর্ট অনুসারে বাংলাদেশে প্রতিবছর এক লাখ ৬১ হাজারের বেশি মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যায়। তাছাড়া তামাকজনিত রোগের চিকিৎসার পিছনে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন জাতীয়-আন্তর্জাতিক তামাকবিরোধী সংগঠনের গবেষণায় দেখা গেছে, কম দামে তামাকপণ্য কেনার সুযোগ এবং ত্রুটিপূর্ণ কর কাঠামো বিশেষ করে সিগারেটে ৪টি মূল্যস্তর থাকায় বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার কমছে না। তামাকের দাম বেশি হলে তরুণ জনগোষ্ঠী তামাক ব্যবহার শুরু করতে নিরুৎসাহিত হয় এবং তামাক আসক্তরাও বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী তামাক ছাড়তে উৎসাহিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তামাকের দাম বৃদ্ধির হার সেটাকে মানুষের নাগালের বাইরে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। 

প্রতিবছর বাজেটে বিড়ি-সিগারেটের দাম প্যাকেট প্রতি ৫-১০ টাকা বাড়ানো হয়, অর্থাৎ শলাকা প্রতি ৫০ পয়সা থেকে বড়োজোর এক টাকা! এমন প্রহসনমূলক দাম বৃদ্ধির ফলে সরকারের রাজস্ব আয় কিছুটা বাড়লেও মূলত তামাক কোম্পানিই লাভবান হয়। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

দেশের বহুজাতিক একটি তামাক কোম্পানি গত ১০ বছরে তাদের উৎপাদন দ্বিগুণ করেছে। অথচ একই সময়ে তাদের মুনাফা বেড়েছে ৫ গুণ! জটিল ও ত্রুটিপূর্ণ তামাক কর কাঠামোই তামাক কোম্পানিটিকে এই মুনাফা লাভের সুযোগ করে দিয়েছে। বর্তমানে মধ্যম স্তরের সিগারেটের ওপর সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ও সারচার্জ মিলিয়ে কর ভার ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ, সিগারেটের দাম এক টাকা বাড়ানো হলে সরকার পাবে ৮১ পয়সা। বাকি ১৯ পয়সা যাবে তামাক কোম্পানির পকেটে, যার জন্য কোম্পানিকে আলাদা কোনো খরচ করতে হলো না! 

ত্রুটিপূর্ণ এই তামাক কর কাঠামো পরিবর্তনের পরামর্শ ২০১৬ সালেই দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার জন্য তিনি যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেটা বাস্তবায়নের জন্য এই কর কাঠামো পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে তামাকপণ্যের ওপর খুচরা মূল্যের শতাংশ হারে (অ্যাড ভেলোরেম) যে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তার পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ করা দরকার। 

সেই সাথে বিড়ি-সিগারেটের বহুস্তরভিত্তিক মূল্য কাঠামো বাতিল করে সর্বোচ্চ দুই স্তরে নামিয়ে আনতে হবে। তাছাড়া তামাকদ্রব্যের দাম নিয়মিতভাবে মূল্যস্ফীতি ও মাথাপিছু আয়বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে এমনভাবে বাড়ানো দরকার যাতে তা কিনতে গেলে ভোক্তার পকেটে টান পড়ে। ১০ টাকার একটি সিগারেটের দাম ১১ টাকা হলে তাতে ব্যবহার খুব একটা কমবে না।

কিন্তু দামটি যদি ১৫ টাকা বা তারও বেশি করে দেয়া যায়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তামাক সেবনকারীরা ব্যবহার কমাতে বাধ্য হবে। তাছাড়া তামাকদ্রব্যের দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্য শুধু বর্তমান সেবনকারীদের ব্যবহার কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং কার্যকরভাবে দাম বাড়ানো গেলে কিশোর-তরুণরা তামাক ব্যবহার শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে। 

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুসারে, তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে একদিকে বর্তমান তামাক আসক্তদের ব্যবহার কমাতে হবে। অন্যদিকে, নতুন করে কেউ যেন তামাক ব্যবহার শুরু করতে না পারে সেই ব্যবস্থাও নিতে হবে। 
আর তামাকদ্রব্যের দাম যথাযথভাবে বাড়ানো হলে সেটি এক ঢিলে দুই পাখিই মারতে পারবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুসারে, তামাকপণ্যের দাম বাড়ানো হলে প্রায় ১১ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ছেড়ে দিতে উৎসাহিত হবে এবং ৮ লাখের অধিক তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ৩ লাখ ৯০ হাজার বর্তমান ধূমপায়ী এবং ৪ লাখ তরুণের অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব।

লেখক: রেজিস্ট্রার (ক্লিনিকাল রিসার্চ), ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট

বিডি প্রতিদিন/আবু জাফর