শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৩১ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ মে, ২০২১ ২২:৪৫

পেডিকিওর তেলেসমাতি

আফরীন সুমু

পেডিকিওর তেলেসমাতি
Google News

আমার জামাইকে বললাম, ‘তোমার পায়ের অবস্থা তো ভয়াবহ। দুই বেলা মাটি কাটলেও তো এমন অবস্থা হয় না।   লকডাউনের বন্ধ এসো, পেডিকিওর করে দিই।’ ও চোখ-মুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা আবার কী?’ ‘একটা বিউটি কেয়ার।’ ‘সেবার যে মুখে কীসব লেপ্টে দিয়ে দু’ঘণ্টা বসিয়ে রেখেছিলে ওইটা?’ ‘দু’ঘণ্টা নয়, বিশ মিনিট।’ ‘ওই হলো। ওসব আমি আর করছি না।’ ‘এটা মুখের নয় পায়ের যত্ন।’ ‘কী হবে এটা করে?’ ‘পা-টা সুন্দর হয়ে যাবে। তাকিয়ে দেখ, তোমার পা কেমন হয়ে আছে।’ ও তাকিয়ে দেখল। আসলেই পায়ের অবস্থা বিচ্ছিরি। ধুলা ময়লা জমে, চামড়া ওঠে রুক্ষ হয়ে আছে। ওকে দোনামনা করতে দেখে বললাম, ‘পেডিকিওর করার পরে দেখ, কেমন চেঞ্জ আসে। পায়ের চেহারাই বদলে যাবে।’

ওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমি মিক্সচার রেডি করতে চলে গেলাম। আধবালতি পানি সামনে রেখে বললাম, ‘নাও এটাতে পা ডুবিয়ে বসে থাক।’ ও পানিতে পা ছোঁয়ানো মাত্র লাফিয়ে উঠল। ‘ওরে বাবা, পানি তো টগবেগ করে ফুটছে। তুমি কি আমার পা সিদ্ধ করে ফেলবে?’ চোখ পাকিয়ে বললাম, ‘মোটেও টগবগ করে ফুটছে না এটা কুসুম গরম। পা ডুবিয়ে দেখ ঠিক হয়ে যাবে।’ ও তবু পা উঁচিয়ে বসে রইল। শেষে পা টেনে পানিতে চুবিয়ে ধরলাম। কয়েক সেকেন্ড যাওয়ার পর ওর মুখ-চোখ স্বাভাবিক হলো। বলল, ‘পানিতে লেবুর খোসা ভাসছে কেন? এতে লেবুর খোসাও দিতে হয়?’ ‘শুধু খোসা নয়, রসও দিতে হয়।’ ও আঁতকে উঠল। ‘কি বল! এই লেবুর দাম জান? আশি টাকা হালি, বিশ টাকা পিস। এত দামের লেবু তুমি জলে গুলে নষ্ট করছ?’ আমি কোনো রকম পাত্তা দিলাম না। সব কথা কানে তুলতে নেই। ও বকে যাচ্ছে। ‘তুমি আমাকে দেউলিয়া বানিয়ে ছাড়বে। ফালতু কাজে জিনিসপত্র নষ্ট করছ। এরকম আরও কত কি তুমি কর কে জানে? শসা, আলু, মসুর ডাল, চাল কিচ্ছু বাদ নেই। সব তোমার রূপচর্চায় লেগে যাচ্ছে। কী হয় এসব না করলে? কতগুলো টাকা বাজার খরচা বেঁচে যেত মাসে। এ জন্যই টাকার কোনো হিসাব পাই না। এত টাকা যায় কই?’ দেখলাম আবহাওয়া ভালো না। অনলাইন শপিংয়ের প্রসঙ্গ চলে এলে বিপদ। আমি ঘাড় না ফিরিয়ে এক ধরনের বিশেষ তির্যক দৃষ্টি হেনে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি যেন কোন ব্র্যান্ডের সিগারেট খাও? তার পুষ্টিগুণ কী? ক’টা করে যেন লাগে ডেইলি? কত খরচা হয় মাসে, হু?’ ও বুদ্ধিমান ছেলে। নিজের ভালো বোঝে। তাই চট করে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে ফেলল। ‘এই যে তুমি আমাকে মেডিকিন করে দিচ্ছ এটা কিন্তু আমার খুব ভালো লাগছে।’ আমি মুচকি হাসলাম। ‘মেডিকিন নয় পেডিকিওর।’ ‘ওই হলো একটা। তা আর কতক্ষণ এভাবে থাকতে হবে?’ আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আরও দশ মিনিট।’ মিনিট দশেক পরে পা-টা মেজে ঘষে পরিষ্কার করে মুছে লোশন লাগিয়ে দিলাম। ও খাটের ওপর পা তুলে অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। তারপর বলল, ‘কী হলো ঘটনাটা, বুঝতে পারছি না।’ ‘কী হবে? পা পরিষ্কার হয়েছে দেখতে পাচ্ছ না?’ ‘হ্যাঁ তা হয়েছে। কিন্তু আমি কোনো একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে যাওয়ার অপেক্ষা করছিলাম। তুমি যেমন করে বললে, আমি পা দেখে চিনতে পারব না। কই সে রকম কিছু তো হলো না।’ ‘তুমি কি ভাবছিলে তোমার পা বদলে তোমার প্রিয় অভিনেতা টম হ্যাঙ্কসের মতো হয়ে যাবে? নাকি দুই পাশে দুটো দুটো করে চারটে আঙুল গজাবে? পা-টা যথেষ্ট ক্লিন হয়েছে এটা তোমার চোখে পড়ছে না?’ ও পায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘পরিষ্কার হয়েছে এটা দেখতে পাচ্ছি। তাহলে মেডিকিন না পেডিকিন এসব বলার দরকার কী ছিল? পা পরিষ্কার করে দেবে বললেই তো হতো।’ আমি আর কিছু বললাম না। পেডিকিওর কথাটার মধ্যে যে একটা আর্ট আছে সেটা ওকে বোঝাতে যাওয়া বৃথা।