Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৯ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৮ জুন, ২০১৯ ২১:২৩

রূপে অনন্য কার্ডিফ

রূপে অনন্য কার্ডিফ

NOSDA (নোসদা) মানে হচ্ছে শুভ রাত্রি। ওয়েলস ভাষার শব্দ এই ‘নোসদা’ নামে একটি দারুণ হোটেল আছে রাজধানী শহর কার্ডিফে। নামের সঙ্গে হোটেলের দারুণ মিল। এই হোটেল দিনের চেয়ে রাতেই বেশি জাঁকজমক। শুক্রবার ও শনিবার গ্রাউন্ড ফ্লোরে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে লাইভ কনসার্ট। শহরে বড় কোনো খেলার আসর কিংবা অন্য কোনো অনুষ্ঠান হলে নোসদা হলের রুম হয়ে যায় সোনার হরিণ। তখন সারারাত চলে

বিভিন্ন মিউজিক। ওয়েলসের মানুষ যে কতটা উৎসব মুখর তা এখানে না এলে বোঝা কঠিন। নোসদার লোকেশনটাও অসাধারণ। ঠিক নদীর ওপরেই। ওপারে ওয়েলসের বিখ্যাত মিলেনিয়াম স্টেডিয়াম। কার্ডিফের এই বিখ্যাত হোটেলেই সৌভাগ্য ক্রমে পেয়ে গেছি একটি রুম। সারা দিন ক্রিকেট নিয়ে ব্যস্ত থাকার পর সন্ধ্যায় রুমে ফিরলে মনে হয়, স্বপ্নপুরীতে প্রবেশ করলাম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে চোখ ফেরানো দায়। এমনিতেই পুরো কার্ডিফ শহরকেই মনে হয় যেন

মায়াপুরী। সকালে হাঁটবেন যেন মিষ্টি সুবাস এসে আপনার দেহমনে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। যেদিকে তাকাবেন চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। আকাশের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, মেঘের বিভাজন। এত পরিষ্কার আকাশ বুঝি আর কোথাও দেখা যায় না!

কার্ডিফ শহরের ভিতর দিয়ে বয়ে গেছে টাফ নদী। খুবই ছোট্ট একটা নদী। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে এটি একটি লেক মাত্র। কিন্তু না, এটাই ওয়েলসের প্রধান নদী টাফ। স্রোত খুব একটা নেই। তবে পানি খুবই স্বচ্ছ। পাথর দিয়ে বাঁধানো দুই পাড়। তবে পাথরের ফাঁকফোকর দিয়ে ঘাস এমনভাবে বড় হয়েছে যে মনে হবে মাটির পাড়। টাফে আবার নিয়মিত লঞ্চও চলে। ছোট্ট এই নদীকে ঘিরেই ইউরোপের খুদে দেশ ওয়েলসের আধুনিকতার বিকাশ! কার্ডিফ হচ্ছে যুক্তরাজ্যের শান্ত শহরের মধ্যে একটি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। চারদিকে সবুজে সমারোহ। শহরের প্রাণকেন্দ্রেও সারি সারি গাছ। তবে বিউট পার্কে প্রবেশ করলে বোঝাই যাবে না আসল সৌন্দর্য। বাংলাদেশের বোটানিক্যাল গার্ডেন কিংবা রমনা পার্কের মতো এমন এলোপাতাড়ি গাছ নেই। যে গাছ আছে তা দেখার মতো। যেন পরিবেশের সঙ্গে কম্বিনেশন করে পার্কটি সাজানো হয়েছে।

ওয়েলসে ছেলে-মেয়ে মেলামিশায় অবাধ স্বাধীনতা। তাই শুধুমাত্র প্রেয়সীর হাত ধরে বসে থাকার জন্য কেউ এখানে পার্কে আসে না। রাস্তা-বাসে-ট্রেনে যে কোনো জায়গায় চাইলেই প্রেমিকাকে জড়িয়ে ধরা যায়। তবে এখানকার আইনও বেশ কড়া। কেউ যদি কারও নামে থাকায় অভিযোগ করে তবে খবর আছে? রূঢ়ভাবে কারও দিকে তাকালেই যে কোনো অভিযোগ করতে পারে। তবে কারও দিকে তাকিকে মিষ্টি হাসি দিলে সাতখুন মাপ। বরং এমন চাহুনিতে মেয়ে বা ছেলে উভয়েই গর্ব বোধ করেন।

সিটি সেন্টারে হওয়ায় বিউট পার্কে পর্যটকই বেশি দেখা যায়। তবে সময় পেলে বাবা-মায়েরাও তাদের সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে আসেন এই পার্কে।

স্বভাবে-আচরণে চমৎকার কার্ডিফের মানুষগুলোও। দারুণ সহযোগিতা পরায়ণ। আপনি কোনো সমস্যায় পড়েছেন, কাউকে বলার সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে সাহায্য করার  জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়বে। আর সবার মুখে যেন হাসি লেগেই আছে। এ কারণেই পর্যটকদের দারুণ পছন্দ এই শহরটি। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিনের তথ্যানুযায়ী ২০১৯ সালে ইউরোপে ষষ্ঠ পর্যটন শহরের খেতাব পেয়েছে এই কার্ডিফ। শহরের খাবার দোকানগুলো প্রায় ২৪ ঘণ্টাই থাকে খোলা। নিরাপত্তার অভাবে ভুগতে হয়না কোনো পর্যটককে। কার্ডিফে শুক্র ও শনিবারের রাত যেন মহনীয় রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়। সপ্তাহের বাকি পাঁচ দিন কঠোর পরিশ্রম করার পর এই দুই রাত প্রাণ ভরে আনন্দ করে কার্ডিফবাসী। ইউরোপের অন্যান্য শহরের চেয়ে কার্ডিফবাসীর উইকেন্ড সেলিব্রেশনের ধরন খানিকটা ভিন্ন। এমনিতে কার্ডিফ শহরটি বেশ ফাঁকা ফাঁকা। কর্ম ব্যস্ত দিনে কারও কারও জন-মানবহীন নগরীও মনে হতে পারে! কারণ যে কজন লোক থাকে তারাও নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। তার পরও যাদের দেখতে পাবেন তারা কিন্তু কেউ কার্ডিফের না। সবাই দেখবেন অন্য কোনো দেশ থেকে ঘুরতে এসেছেন। পড়ন্ত বিকালে খানিকটা জমজমাট হয়। তবে এটা ভাবার প্রশ্নই উঠে না যে, ঢাকার ফার্মগেট কিংবা শাহবাগের ৫০ ভাগের একভাগ লোক দেখা যায়! তবে ছুটির দিনের কার্ডিফ অন্যরকম। বিশেষ করে শুক্রবারের রাত কার্ডিফ যেন এক উন্মত্ত নগরী।

আপনি যদি কার্ডিফ এসে এখানে শুক্রবারের কোনো রাত না কাটান তাহলে এক কথা বলতেই হবে আমি কার্ডিফের আসল সৌন্দর্যই মিস করেছি। অবশ্য শুক্রবার ছোট্ট এই শহরে আবাসনের ব্যবস্থা করাও খুব কঠিন। ছুটির দিনের জন্য হোটেলগুলো অনেক আগে থেকেই বুক হয়ে থাকে। এই দিনে হোটেলের ভাড়াও বাড়িয়ে দেওয়া হয় কোনো কোনো হোটেলে।

শুক্রবারের রাতে যেন কেউ ঘুমায় না। সারারাত চলে আনন্দ উৎসব। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখবেন কেউ গিটারসহ আরও নানা সংগীত যন্ত্র নিয়ে বাজাতে শুরু করেছে। কোথাও দেখবেন ড্রাম বাজছে। সেই সঙ্গে চলছে তালে তালে গান ও বাহারি নৃত্য। এখানে পরিচিত অপরিচিত কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই যেন একে অপরের বন্ধু। কার্ডিফের মানুষ খুবই উৎসব প্রিয়। তারা যেন আয় করেন সপ্তাহের এই একটি দিন আনন্দ করার জন্য। সপ্তাহের দিনটা তাদের কাছে বিশেষ কিছু।

এই দিনে শহরের বিখ্যাত নাইট ক্লাবগুলো খুলেই দেওয়া হয় রাত ১০টার পর। প্রতিটি ক্লাবেই থাকে লম্বা লাইন। তা ছাড়া শহরের আনাচে কানাচেও চলে পার্টি। ছোট ছোট রাস্তাও লোকেলোকারণ্য হয়ে যায়। রাস্তার কয়েক শোগজ পর পর লাউড স্পিনার বাজিয়ে লাইফ কনসার্ট চলে। উইকেন্ডে পুরো কার্ডিফ হয়ে যায় এক উন্মত্ত নগরী। স্থানীয়দের সঙ্গে এই আনন্দ উৎসবে সমান তালে যোগ দেন পর্যটকরাও। এ জন্যই বুঝি পর্যটকদের কাছে কার্ডিফ এক জাদুর শহর।

ক্রীড়া ক্ষেত্রে ওয়েলসের ইতিহাস বর্ণাঢ্য। ক্রিকেটে তারা ইংল্যান্ডের সঙ্গে এক দল হয়ে খেলে। কিন্তু ফুটবলে ওয়েলস জাতীয় দল আলাদা। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়েও রয়েছে তাদের দাপট। এখন ওয়েলসের অবস্থান ১৯তম। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, এখানকার এক নম্বর ক্রীড়া কিন্তু ফুটবল নয়, রাগবি। টাফ নদীর পাড়ে অবস্থিত অপূর্ব সুন্দর মিলেনিয়াম স্টেডিয়ামকে ঘিরেই কার্ডিফের রাগবি চলে। এই স্টেডিয়াম হচ্ছে ওয়েলস জাতীয় রাগবি ইউনিয়ন দলের হোম ভেন্যু। রাজধানী শহর কার্ডিফের সিটি সেন্টারে টাফ নদীর তীরেই অবস্থান। ১৯৯৯ সালে এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে রাগবি বিশ্বকাপ। ওয়েলস জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান ভেন্যুও এই মিলেনিয়াম স্টেডিয়াম। ইউরোপের অন্যান্য শহরের মতো এখানেও ফুটবলের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের সেরা তারকা গ্যারেথ বেলের শহর কিন্তু এই কার্ডিফ। ২০১৭ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই মিলেনিয়াম স্টেডিয়ামে। যে ম্যাচে বেলের রিয়াল মাদ্রিদ জুভেন্টাসকে উড়িয়ে দিয়ে শিরোপা জেতে। আর বিশ্ব দেখেছে কার্ডিফের ফুটবল উন্মাদনা।

ওয়েলসের ফুটবল ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯২৭ সালে আর্সেনালকে হারিয়ে প্রথম নন-ইংলিশ দল হিসেবে এফএ কাপের শিরোপা জিতেছিল কার্ডিফ সিটি ফুটবল ক্লাব। ২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকের সময়ও কার্ডিফে ফুটবলের ১২টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ক্রিকেট সোফিয়া গার্ডেন কেন্দ্রিক। যেটির বর্তমান নাম কার্ডিফ ওয়েলস স্টেডিয়াম। ২০০৯ সালে অ্যাসেজ সিরিজের একটি ম্যাচও অনুষ্ঠিত হয় এই স্টেডিয়ামে। সোফিয়া গার্ডেন তো বাংলাদেশের এক লাকি ভেন্যু। এই কার্ডিফে ২০০৫ সালে মোহাম্মদ আশরাফুলের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ওয়ানডে জয়ের স্বাদ পেয়েছিল বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে খাদের কিনারে গিয়েও দুর্দান্তভাবে কামব্যাক করে জিতে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছিল টাইগাররা। মাশরাফিদের কাছেও কার্ডিফ এক জাদুর শহর।

ওয়েলসের গ্রামগুলো দেখতে ছবির মতো। আমার সৌভাগ্য, আমি মন্টিপ্রীত নামে একটি গ্রামে গিয়েছিলাম। গ্রাম যে কত সুন্দর হতে পারে তা মন্টিপ্রীতে না গেলে বুঝতে পারতাম না। কার্ডিফের সিটি সেন্টার থেকে বেশ কিছুটা দূরে। ট্রেনে যেতে হয়। সব মিলে ঘণ্টা খানেকের পথ। গ্রামেও কোথাও ধুলাবালি খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে শহরের মতো দোকান নেই। কয়েক কিলোমিটার দূরে দূরে একটি করে সুপার স্টোর। বিশাল এলাকা জুড়ে। মজার বিষয় হচ্ছে, সুপার স্টোর যতটুকু এলাকা জুড়ে তার চেয়েও বেশি জায়গা রাখা হয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য। এখানে প্রাইভেট কার বেশ সস্তা। সে কারণে ঘরে ঘরে গাড়ি। তবে গাড়ী মেইনটেইন্স করা অনেক কঠিন। ট্র্রাফিক আইন একটুখানি অমান্য করলেই গুনতে হয় বড় অঙ্কের জরিমানা। আর এক্সিডেন্ট করলে তো অনেক সময় গাড়ি বিক্রি করে যে টাকা হবে তার কয়েকগুণ ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।

কার্ডিফকে কেউ কেউ বলে থাকেন প্রাসাদের শহর। সিটি সেন্টারেই পাবেন সবচেয়ে বড় প্রাসাদটি। তা ছাড়া যে দিকে তাকাবেন আপনার প্রাসাদ চোখে পড়বেই। তবে সিটি সেন্টারের প্রাসাদটির একটা বিশেষত্ব আছে। এই প্রাসাদের পাশের সীমানা প্রাচীর প্রায় তৃতীয় তলার মতো উঁচু। সিটি হলটি দেখতে অসাধারণ। তা ছাড়া এখানে বিল্ডিংগুলোই তো যেন এক একটি প্রাসাদ।

কার্ডিফের সৌন্দর্য পরিপূর্ণতা দান করেছে সমুদ্র সৈকত। ঝকঝকে তকতকে। কার্ডিফের সমুদ্র সৈকতে একটা ঘুরে না আসলে ওয়েলসের রাজধানী শহর নিয়ে পর্যটকের কিছুটা অপূর্ণতা থেকেই যাবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী, ঐতিহাসিক স্থাপনা, সমুদ্র সৈকত সব কিছু মিলেই আজকের আধুনিক কার্ডিফ।


আপনার মন্তব্য