শনিবার, ২২ জুলাই, ২০২৩ ০০:০০ টা

রাধাবতী দেবীর অনন্য কলাবতী শাড়ি

দীপংকর ভট্টাচার্য লিটন, শ্রীমঙ্গল

রাধাবতী দেবীর অনন্য কলাবতী শাড়ি

কলা গাছের সুতা দিয়ে শাড়ি বানিয়েছেন রাধাবতী দেবী। শাড়ির নাম দেওয়া হয়েছে কলাবতী। আর এই শাড়ি উপহার হিসেবে দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। শাড়ি দেখে এর প্রথম কারিগরকে দেখতে চান তিনি। গণভবনে যান শাড়ির কারিগর রাধাবতী। দেখা হয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। যা রাধাবতীর জীবনে পরম পাওয়া। এটা তার জন্য পুনর্জন্ম বলে মনে করেন রাধাবতী। তিনি জানান, কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হবে। কিন্তু তাই হলো, প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছি।

রাধাবতী দেবীর বাড়ি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মণিপুরি অধ্যুষিত মাঝেরগাঁও গ্রামে। এ গ্রামে রয়েছে মণিপুরি সম্প্রদায়ের প্রায় ৮০ পরিবার। মণিপুরিদের প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ তাঁতশিল্প। জাতিগতভাবেই মণিপুরি নারীরা তাদের পরিদেহ বস্ত্র নিজেরাই বুনন করে থাকেন। ওই গ্রামেরই মৃত ব্রজবল্লভ সিংহের মেয়ে রাধাবতী। ১৮ বছর বয়সে মায়ের হাত ধরেই তার তাঁতে হাতেখড়ি। পরে ১৯৮৬ সালে ভারতের মণিপুর রাজ্যের ইস্ফলে গিয়ে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর দেশে এসে সিলেটে নরসিংদীর এক তাঁত গুরুর ছাত্রের কাছ থেকে আরও তিন বছর তাঁতশিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। পরে তিনি নিজেই সিলেটে মিরাবাজারে সমবায় শাখা অফিসে তাঁতশিল্পের প্রশিক্ষক হয়ে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেন। এখানে তার কেটে যায় ১৫ বছর। পরে তিনি চলে আসেন কমলগঞ্জে নিজ গ্রামে। ২০১০ সালে কমলগঞ্জের মাধবপুরে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমিতে একাধিকবার প্রশিক্ষণ নেন তিনি।

বাড়িতে পরিদেহ বস্ত্রের পাশাপাশি মাফলার, ওড়না, শাড়ি, গামছা, উত্তরীয় ও থ্রি-পিসসহ বিভিন্ন পোশাক বানান। এসব বস্ত্র তিনি টকটকি (কাঁঠের তাঁত মেশিন) দিয়ে বুনন করেন। এর থেকে যে টুকু অর্থ আয় হয়, তা দিয়েই সংসারের খরচ জোগান। এভাবেই চলছে রাধাবতীর জীবন। এই দীর্ঘ সময়ে এলাকার অনেক মহিলাকে শিখিয়েছেন কাপড় বুনন। তা ছাড়া দেশের যে প্রান্ত থেকে ডাক আসে সেখানে গিয়েই প্রশিক্ষণ দেন। শিখান তাঁতে কাপড় বুননের কাজ। তিনি এখন মণিপুরি তাঁতবস্ত্র বুননে এলাকায় একজন ওস্তাদ (গুরু)। এলাকায় তিনি তাঁতি দেবী ওস্তাদ হিসেবে অধিক পরিচিত।

প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছেন কলাবতী শাড়ির উদ্ভাবক রাধাবতী দেবী (ডানে)

২০২২ সালে রাধাবতীর ডাক আসে বান্দরবান থেকে। বান্দরবান জেলা প্রশাসক কলা গাছের সুতা থেকে কাপড় তৈরি করে দিতে বলেন। প্রথমে একটু ভয়ে ভয়েই তিনি বান্দরবান যান। কিন্তু না, প্রথম চেষ্টাতেই তিনি সফল হন। রাধাবতী দেবী কলা গাছের সুতা দিয়ে শাড়ি বানিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। আর বাংলাদেশে তিনিই প্রথম কলা গাছের সুতা থেকে শাড়ি বুননের কারিগর। তাঁতশিল্পীরা মনে করেন, রাধাবতী কলা গাছের সুতা থেকে শাড়ি তৈরি করে তাঁতশিল্পে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছেন। এখন এটিকে বাণিজ্যিক করতে গবেষণা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। মাত্র ১৫ দিনে তিনি ১২ হাত লম্বা শাড়ি বুনন করেন। এই শাড়ি বুননের জন্য তিনি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থেকে বান্দরবান যান। সেখানে স্থানীয় মহিলাদের ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ দেন। মণিপুরিরা যে তাঁতে শাড়ি বুনন করেন ওখানে তিনি সেই তাঁত বসান। পরে চলতি মার্চ মাসে রাধাবতী দেবী সেই তাঁতে কলা গাছের সুতা দিয়ে শাড়ি বুনন করেন। রাধাবতীকে বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি এই শাড়ি বুননের জন্য নিয়ে যান।

গত ১৭ জুলাই বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি প্রধানমন্ত্রীকে কলা গাছের আঁশ থেকে তৈরি শাড়ি উপহার দেন। এর পরই গণভবনে ডাক পড়ে শাড়ি তৈরির কারিগর রাধাবতীর। পরের দিন ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রাধাবতী দেবী। জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক কলা চাষ হয়। স্থানীয়ভাবে এটি বাংলা কলা নামে পরিচিত। ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি ২০২১ সালে এ জেলায় জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি এ অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে ফেলে দেওয়া কলা গাছের বাকল থেকে সুতা তৈরির পাইলট প্রকল্প হাতে নেন। এই প্রকল্পে সহায়ক হিসেবে ছিল বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ল্ডভিশন, গ্রাউস ও উদ্দীপন। ২০২২ সালে স্থানীয় মহিলারা এই সুতা দিয়ে হস্তশিল্প পণ্য বানাত। ওই বছরের শেষের দিকে জেলা প্রশাসক মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ও বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকাকে সঙ্গে নিয়ে রাধাবতী দেবীর মাধ্যমে কাপড় তৈরির উদ্যোগ নেন। প্রথমে কলা গাছের সুতা দিয়ে যে কাপড় তৈরি করা হয় তা দিয়ে ফাইল ফোল্ডার বানানো হয়। এই কাপড় তৈরির সফলতাই শাড়ি তৈরির চিন্তার জন্ম দেয় জেলা প্রশাসকের মনে। পরে তা সফল হয়।

৬৬ বছর বয়সের রাধাবতী দেবী বলেন, কলা গাছের সুতা দিয়ে শাড়ি বানাতে পেরে আমি খুব খুশি হয়েছি। আর তার থেকেও বেশি খুশি হয়েছি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে। তিনি আমাকে হাতে ধরে নিয়ে ছবি তুলেছেন। উপহার দিয়েছেন। যা আমি কোনোদিন কল্পনাও করিনি।

তিনি বলেন, প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম। পরে নিজের বৃদ্ধিতেই করেছি। এখন ভালো লাগছে। আমিই প্রথম কলা গাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরি করেছি। তিনি আরও বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মৌলভীবাজার জেলাতেও কলা গাছের সুতা দিয়ে শাড়ি বাড়ানো সম্ভব। প্রয়োজনে তিনি প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁতশিল্পী গড়ে তুলবেন। আর এখন তার ইচ্ছা কলা গাছের সুতা দিয়ে পুরুষদের জন্য ফতুয়া বানানো।

রাধাবতীর চাচাতো ভাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রণজিৎ সিংহ বলেন, ‘বোন রাধাবতীর জন্য আমরা গর্বিত। আমার পরিবার অনেক খুশি। এলাকার মানুষও উৎফুল্ল। উপজেলা প্রশাসন থেকে বোনকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেও সম্মানিত করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিদিনই বাড়িতে এসে বা মোবাইলে মানুষজন শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। সত্যিই মানুষের এত ভালোবাসায় আমরা আপ্লুত।’বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের প্রভাষক ও স্থানীয় পিস মহিলা কল্যাণ সমিতির সভানেত্রী সান সান উ বলেন, ‘রাধাবতী দেবী কলা গাছের সুতা দিয়ে শাড়ি বুনন করে নতুন ধরনের শিল্পবিপ্লবের সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছেন। এখন এর প্রসার ঘটাতে পারলে জেলার কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারণ হবে।’ বান্দরবান জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের উপপরিচালক আতিয়া চৌধুরী বলেন, কলা গাছের সুতা থেকে শাড়ি বানানো এটি আমাদের একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই চ্যালেঞ্চে আমরা সফল হয়েছি রাধাবতী দেবীর জন্য। তিনিই প্রথম শাড়ি বুনন করে দেখিয়ে দিয়েছেন, কলা গাছের সুতা থেকেও শাড়ি তৈরি করা যায়।

সর্বশেষ খবর