শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৩ মে, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ মে, ২০২০ ০০:০১

আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু

ফুটবলে সোনালি দিনের যত কথা

আমি ভাগ্যবান যে কামাল ভাইয়ের অফারে আবাহনীতে যোগ দিই এবং এ ক্লাবের নেতৃত্ব দিয়েছি। তারকা খ্যাতি পেয়েছি আবাহনীতে খেলে

ফুটবলে সোনালি দিনের যত কথা

সত্তর/আশির দশকের ফুটবল ছিল মানুষের হৃদয়ের খেলা। সে সময় মানুষ ফুটবল খেলা দেখে নির্মল আনন্দ পেত, ঠিক তেমনই খেলা শেষে মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বাসায় যেতেন ফুটবলাররা। স্বাধীনতার আগেও ফুটবল খেলা বেশ জনপ্রিয় ছিল। ষাটের শতকে মোহামেডান-ওয়ান্ডারার্স ক্লাব একে অন্যের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে স্থান করে নিয়েছিল। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি অধ্যুষিত মাকরানি খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণে পাকিস্তান ফুটবলের তীর্থস্থান ঢাকা (বঙ্গবন্ধু) স্টেডিয়াম মুখরিত হয়ে উঠত। সে সময়ে মোহামেডান, ওয়ান্ডারার্স, ভিক্টোরিয়া, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব দলে ভিড়িয়ে ছিল অনেক নামিদামি মাকরানি খেলোয়াড়। তাদের মধ্যে অন্যতম তোরাব আলী, ওমর, গফুর, মুসা, আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ রাহী, মাওলা বক্স, আমির বক্স, আব্বাস, আলী নেওয়াজ, আলী আকবর, গফুর বেলুচ, আইয়ুবদার, কাদের বক্স, রসুল বক্স, গাজী, ইউসুফ, ইউসুফ জুনিয়র, টারজেনসহ আরও অনেকে। মাকরানিদের এত দাপটের মধ্যেও বাঙালি খেলোয়াড়রা তাদের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দিয়ে মাতিয়ে রেখেছিল পাকিস্তানের ফুটবল।

সেসময় বাঙালি বিখ্যাত খেলোয়াড় ছিলেন গজনবী, নবী চৌধুরী, কবির, মারী, আশরাফ, রহিম, মান্না, বশির, রঞ্জিত, হাফিজ, জাকারিয়া পিন্টু, সাহেব আলী, প্রতাপ, টিপু, সামাদ, আইনুলসহ আরও অনেক নামি খেলোয়াড় আলো ছড়িয়ে ছিলেন মাঠে। লেফট আউট টিপু ভাই ছিলেন আমার আদর্শ।

কিন্তু দুঃখের বিষয় যখনই পাকিস্তানের জাতীয় ফুটবল দল গঠন করা হতো তখনই বাঙালি খেলোয়াড়দের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হতো। ভালো পারফরম্যান্স হওয়া সত্ত্বেও ২/৩ জনের বেশি জাতীয় দলে সুযোগ দেওয়া হতো না। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হয়। ’৪৭ থেকে ’৭০ সাল এই ২৩ বছরে মাত্র ২৩ জন বাঙালি ফুটবলার জাতীয় দলে স্থান পেয়েছিলেন। এখানেই প্রমাণ হয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঙালিদের কীভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল।

১৯৬৯/৭০ সালের কথা, তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি, ঢাকায় আসছে তুরস্ক ও ইরানের ফুটবল দল ত্রিদেশীয় ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলতে। আমার বাবা ছিলেন ফুটবলার ও মোহামেডানের একনিষ্ঠ সমর্থক। মোহামেডানের খেলা হলেই সবকিছু ফেলে রেখে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় চলে আসতেন খেলা দেখতে। সেদিন ছিল পাকিস্তান বনাম ইরানের খেলা। বাবা বাসা থেকে খেলা দেখতে যাওয়ার মুহূর্তে আবদার করলাম আমিও যাব খেলা দেখতে। প্রথমে রাজি না হলেও আমার কান্নায় মা বাবাকে রাজি করালেন। শেষতক প্রথমবারের মতো ঢাকা (বঙ্গবন্ধু) স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে এলাম। বিকাল ৪টায় খেলা, স্টেডিয়ামে ঢুকতে হয়েছিল দুপুর ১২টায়। পুরো স্টেডিয়াম কানায় কানায় ভরে গেল ২টার মধ্যে। এবার অপেক্ষার পালা কখন শুরু হবে খেলা। বিকাল ৪টায় খেলা শুরু হলো। কি যে আনন্দ মনের মধ্যে বয়ে যাচ্ছে। খেলা দেখছি আর জেগে জেগেই যেন স্বপ্ন দেখছিলাম, কী সুন্দর মাঠ, বিখ্যাত বিখ্যাত সব খেলোয়াড়, হাজার হাজার দর্শক, আহ! আমি যদি ওদের মতো কোনো দিন এই মাঠে খেলতে পারতাম- এ রকম স্বপ্ন আর চিন্তা করতে করতে কখন যে খেলা শেষ হয়ে গেল বুঝলাম না। পরবর্তীতে বুঝতে পেরেছিলাম সেদিনই সেই বীজটি বপন করে আসছিলাম।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শুধু বাঙালি খেলোয়াড়দের নিয়ে শুরু হয় ঢাকা ফুটবল লিগ। সেখানে আবাহনী ক্রীড়া চক্র নামে নতুন একটি দল লিগে অংশগ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শহীদ শেখ কামাল ভাই ও এলাকার কয়েকজন তরুণকে নিয়ে গঠন করেন দলটি। অনিবার্য কারণবশত মাঝপথে বাতিল হয়ে যায় ’৭২-এর লিগ। ১৯৭৩ সালে আবাহনী ভালো ফলাফল না করতে পারলেও ’৭৪ সালে লিগে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়। আমি ভাগ্যবান যে কামাল ভাইয়ের অফারে আবাহনীতে যোগ দিই এবং এ ক্লাবের নেতৃত্ব দিয়েছি। তারকা খ্যাতি পেয়েছি আবাহনীতে খেলে। এজন্য বড় অবদান শেখ কামাল ভাইয়ের।


আপনার মন্তব্য