শিরোনাম
মঙ্গলবার, ২০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা

ক্রিকেট ফ্যান্টাসি এবং সাকিব

মেজবাহ্-উল-হক

ক্রিকেট ফ্যান্টাসি এবং সাকিব

সাকিব আল হাসান সব সময় আলোচনায় থাকতে ভালোবাসেন! -কথাটার ইতিবাচক-নেতিবাচক দুই রকম অর্থই হতে পারে!

ক্রিকেটারদের স্বার্থ রক্ষার্থে তিনি যেমন আন্দোলনে নামতে পারেন, ঘরোয়া ক্রিকেটের ‘ভঙ্গুর’ অবস্থাকে জাতির সামনে তুলে ধরতে তিনি আবার কখনো খেলার মধ্যে লাথি দিয়ে স্ট্যাম্প ভেঙে আলোচনার সাইক্লোন বইয়ে দেন। সেটা ক্রিকেটের আইন সিদ্ধ হোক বা না হোক সেদিকে খুব একটা পাত্তা দেন না বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার।

বাইশগজের সাকিব তো আরেক চরিত্র। খেলায় যে জয়-পরাজয় আছে এ কথাটি যেন বিশ্বাসই করতে চান না। লাল-সবুজ জার্সিতে তিনি প্রতিটি ম্যাচ জয়ের জন্য যেন ‘পাগল’ হয়ে যান! প্রতিপক্ষ কে, বা কত বড় দল তা ভাবার বিষয় নয়। এমন কি সাকিব যখন ব্যাটিং কিংবা বোলিং করেন তখন যদি তার বিপরীতে কিংবদন্তি তুল্য কোনো ক্রিকেটারও থাকেন সেটাও পাত্তা দেন না।

প্রচলিত আছে, ক্রিকেটে নাকি বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন ৭০ ভাগ, আর ৩০ ভাগ লাগে টেকনিক! এই কথাটা যেন সাকিবের বেলায় শতভাগ সত্য। জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচটির দিকে তাকান!

উইকেটে স্পিনারদের জন্য বলার মতো তেমন কিছুই ছিল না। প্রথম ঘণ্টায় ময়েশ্চারের কারণে পেসাররা বাড়তি সুবিধা পান তারপর পিচ একদমই ফ্ল্যাট হয়ে যায়। এমন উইকেট থেকেও কিনা সাকিব কেবলমাত্র মাথা খাটিয়েই তুলে নেন ৫ উইকেট। ব্যাটসম্যানের দুর্বলতা বিচার-বিশ্লেষণ করে ডেলিভারি দেন। কখনো কখনো ঝুঁকি নিয়ে বল ঝুলিয়ে দেন। তার বল মারতে গিয়ে ফাঁদে পড়ে যান ব্যাটসম্যানরা।

দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও কী দারুণ বোলিং! আবারও তুলে নেন দুই উইকেট। তবে এদিন সাকিব আলোকিত হন তার ব্যাটিং দিয়ে। অপরাজিত ৯৬ রানের ক্যারিশম্যাটিক এক ইনিংস।

অবশ্য খেলা না দেখে থাকলে কেবলমাত্র স্কোর কার্ড দেখে এই ইনিংসের গুরুত্ব বোঝা অনেক কঠিন। এই ৯৬-এর প্রতিটি রানে যে কতটা টেনশন, চাপ আর মানসিক যন্ত্রণা ছিল -তা ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন যারা খেলা দেখেছেন।

ওয়ান ডাউনে নেমে একপ্রান্ত আঁকড়ে পড়েছিলেন। আরেক প্রান্তে একের পর এক উইকেট পড়েছে। ম্যাচের ২৯তম ওভারে যখন ১৩০ রানে ৫ উইকেট হারায় বাংলাদেশ তখন কে ভেবেছিল এই ম্যাচে জিতবে বাংলাদেশ! তামিম ইকবাল, লিটন দাস, মোহাম্মদ মিথুন, মোসাদ্দেক হোসেন ও মাহমুদুল্লাহ আউট হওয়ার পর লোয়ার অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে লড়াই করেই দিলেন দারুণ এক জয় উপহার।

একটুখানি স্বার্থপর হলে সেঞ্চুরিটা হলেও হতে পারত সাকিবের। কিন্তু নিজের সেঞ্চুরির চেয়ে যেন দলের জয় বড় মনে হলো। কেন না সেঞ্চুরি করতে হলে ঝুঁকি নিয়ে শট খেলতে হতো, আউট হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকত। আর ওই সময় সাকিব হলে নিশ্চিত হয়ে যেত দলের হার!

সাকিবের এই এক ইনিংসে একদিকে যেন বাংলাদেশের সিরিজ নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে ¯œায়ূচাপ নিয়ে লড়াই করে জয় পাওয়ার পুরো দলের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে।

আজ জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচ। টাইগাররা জিতলেই জিম্বাবুয়ে হোয়াইটওয়াশ। এর আগেও আফ্রিকার দেশটিকে একাধিকবার হোয়াইটওয়াশ করার অভিজ্ঞতা আছে বাংলাদেশের। তবে এই সিরিজে বড় বিষয় হচ্ছে, সেই ক্ষুধার্ত সাকিবকে ফিরে পাওয়া!

২০১৯ বিশ্বকাপে ক্যারিশমা দেখানোর পর নিজের কৃতকর্মের জন্য সাকিব এক বছর নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। অনেকের ধারণা ছিল, আগের সাকিবকে আর দেখা নাও যেতে পারে! তবে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের দুই গুরু নাজমুল আবেদীন ফাহিম ও মোহাম্মদ সালাউদ্দীন অবশ্য বলেছিলেন সাকিব আরও ভয়ংকর হয়ে ফিরবেন! 

নিষেধাজ্ঞা থেকে ফিরে প্রথম সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সাকিব ‘ম্যান অব দ্য সিরিজ’! তারপরও সাকিবকে ততটা ভয়ংকর মনে হয়নি। আর ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে সাকিবকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। অবশেষে জিম্বাবুতেই দেখা গেল ক্ষুধার্ত সাকিবকে। দুই গুরুর ভবিষ্যৎ বাণীর প্রতিফলন বাইশগজে বাস্তবায়ন করছেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার।

নিষেধাজ্ঞা থেকে ফেরার পর মিডিয়ায় সাক্ষাৎকারে সাকিব বলেছিলেন, অবসর নেওয়ার আগে তার ইচ্ছা বিশ্বকাপ জয় করা।

২০২৩ সালে পরের বিশ্বকাপ পার্শ্ববতী দেশ ভারতে। কন্ডিশন থাকবে পক্ষেই। তা ছাড়া বাংলাদেশ দলে রয়েছেন তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ -সঙ্গে তরুণ ব্রিগেট মুস্তাফিজ, তাসকিন, লিটন-আফিফরা তো থাকছেনই। এর সঙ্গে যদি সাকিব ২০১৯ বিশ্বকাপের ‘আগ্রাসী রূপ’ ২০২৩-এ দেখাতে পারেন তাহলে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখা দোষের কী!

২০২০ সালে তো ছোটরা একটা বিশ্বকাপের শিরোপা (অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ শিরোপা) এনে দিয়েছেই, এখন বড় শিরোপা জিততে পারলে বাংলাদেশের ক্রিকেট ফ্যান্টাসীতে যোগ হবে নতুন মাত্রা!