শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ২৩:৫০

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট

রণক ইকরাম

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট

প্রাচীন গ্রিসের ম্যাসিডনের রাজা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলেন আলেকজান্ডার। বলিষ্ঠ চেহারায় রূপ আর শক্তির মিশেলে তিনি অন্য সব রাজার থেকে ছিলেন স্বতন্ত্র। সিংহের মতোই  বিক্রম ছিল তার। মাথায় সবসময় সিংহের চামড়া জড়িয়ে রাখতেন। মাত্র ৩০ বছরের মধ্যেই অ্যাড্রিয়াটিক সাগর থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিশ্বর হয়ে ওঠেন আলেকজান্ডার। তাকে নিয়ে প্রতিনিয়ত তৈরি হতে থাকে নানা রোমাঞ্চকর গল্প...

 

যিশু খ্রিস্টের জন্মের ৩০০ বছরেরও বেশি সময় আগের ঘটনা। পৃথিবী দেখেছিল এক বিশাল মাপের রাজাকে। তিনি প্রাচীন গ্রিসের ম্যাসিডনের রাজা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৬ সালে তার জন্ম। মাত্র ২০ বছর বয়সে পিতা দ্বিতীয় ফিলিপের স্থলাভিষিক্ত হন তৃতীয় আলেকজান্ডার। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ছাত্র আলেকজান্ডারকে বলা হতো ‘অর্ধেক পৃথিবীর রাজা’। কারণ গ্রিসের ছোট্ট রাজ্য ম্যাসিডন ছাপিয়ে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী জয় করেছিলেন তিনি। অল্প বয়স হলেও সিংহাসন সামলানো তাঁর পক্ষে কঠিন হয়নি। কারণ, লিওনিদাসের মতো একজন যোগ্য প্রশিক্ষকের কাছ থেকে তিনি শরীর বিষয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করেছিলেন আর মাত্র ১৩ বছর বয়স শিক্ষা পেয়েছিলেন মহান গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের কাছ থেকে। মূলত এই সুশিক্ষার কারণেই আলেকজান্ডার প্রচণ্ড শারীরিক দৃঢ়তা ও মেধার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ছেলেবেলায় আলেকজান্ডারের বাবা ফিলিপ বলেছিলেন, ‘ম্যাসিডন বড়ই ছোট তোমার পক্ষে। একদিন সারা পৃথিবী জয় করবে তুমি।’ বাবার সেই কথাটা সত্যি প্রমাণ করেছিলেন আলেকজান্ডার। তার শাসনামলের বেশিরভাগ সময় তিনি উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়া জুড়ে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। মাত্র ৩০ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি মিসর থেকে শুরু করে উত্তর পশ্চিম ভারত পর্যন্ত ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সেই আমলের মানচিত্রে চোখ বুলালেই অনুমান করা যাবে কত বড় বীর ছিলেন আলেকজান্ডার। সংক্ষিপ্ত রাজত্বকালেই বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলই জয় করেন তিনি। কয়েক হাজার বছর আগে মৃত্যু হলেও এই বীরের সমাধি আজও রহস্য আর নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়ে চলেছে মানুষের মনে।

 

ত্রিশ বছরে অর্ধেক পৃথিবীর অধিশ্বর

অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলেন আলেকজান্ডার। বলিষ্ঠ চেহারায় রূপ আর শক্তির মিশেলে তিনি অন্য সব রাজার থেকে ছিলেন স্বতন্ত্র। সিংহের মতোই  বিক্রম ছিল তার। মাথায় সবসময় সিংহের চামড়া জড়িয়ে রাখতেন। মাত্র ত্রিশ বছরের মধ্যেই অ্যাড্রিয়াটিক সাগর থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিশ্বর হয়ে ওঠেন আলেকজান্ডার। তাকে নিয়ে প্রতিনিয়ত তৈরি হতে থাকে নানা রোমাঞ্চকর গল্প। তিনি নাকি সাক্ষাৎ দেবতা জিউসের বংশধর। আলেকজান্ডার নিজেও ভাবতে শুরু করেন তাই। সেই আমলে গ্রিসের দেবী আর্টেমিসের মন্দির ছিল পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম। আলেকজান্ডারের জন্মের দিন সেটি পুড়ে যায়। কথিত হয়ে যায়, স্বয়ং আর্টেমিস নাকি এসেছিলেন আলেকজান্ডারের জন্মের সাক্ষী থাকতে। এরকম নানা কিংবদন্তিতে ভরপুর সম্রাট আলেকজান্ডারের জীবন।

আলেকজান্ডারের বিশ্ব অভিযান তখন চলতেই থাকল। এর মধ্যেই তিনি পারস্য সাম্রাজ্য জয়ের আশায় দারদানেলিস প্রণালি অতিক্রম করেন। এ প্রণালিটি মরমরা সাগর ও এয়িজিন সাগর (অর্থাৎ গ্রিসের পূর্বাংশে ভূমধ্যসাগরের একটি বর্ধিতাংশকে) যুক্ত করেছে। আলেকজান্ডার তিনটি বড় ধরনের যুদ্ধ করে ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বে পারস্য-নেতা তৃতীয় ডরিয়াসকে হত্যা করেন। আলেকজান্ডার পারস্যবাসীদের পরাজয় ঘটান ৩৩১ খ্রিস্টপূর্বে। এরপর তিনি অগ্রসর হন আরও পূর্ব দিকে। ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিকে। যে বা যারাই আলেকজান্ডারের কর্তৃত্ব মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, আলেকজান্ডার তাকেই পরাভূত করেন। অভিযান চালিয়ে যেতে মুখিয়ে ছিলেন আলেকজান্ডার। কিন্তু সেনাবাহিনী বাদ সাধল। বিশাল সেনাবাহিনীর বাধার মুখে পূর্বমুখী অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য হলেন আলেকজান্ডার।

 

জ্যোতিষী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ব্যাবিলনই আলেকজান্ডারের শেষ গন্তব্য

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দের মে মাস। সারা বিশ্ব কাঁপিয়ে দেওয়া এই বীরের বয়স তখন ৩৩। সিংহাসনে আরোহণের পর এক যুগেরও বেশি সময় কাটিয়ে দিয়েছেন চেনা পৃথিবীর অনেকটা জয় করতে। আলেকজান্ডারের স্বপ্ন ছিল, তার বিশাল এ সাম্রাজ্যের আরও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃতি ঘটাবেন। কিন্তু তার সে স্বপ্ন কখনই বাস্তবে রূপ নেয়নি। সেনাবাহিনীর বাধার মুখে কয়েক বছরের সামরিক অভিযান শেষ করে আলেকজান্ডার ফিরে আসলেন বাগদাদে। এই সুযোগে তিনি বিশ্রামে গেলেন। সেই সঙ্গে তার পরবর্তী অভিযানের ছকও আঁকতে লাগলেন। ২৯ জুন তিনি তার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর আমন্ত্রণে এক ভোজসভায় যোগ দেন। দিনব্যাপী এ আয়োজনে আলেকজান্ডার প্রচুর মদ পান করেন। এক সময় অস্বস্তি বোধ করেন। ‘তার ভালো লাগছে না’, এ কথা বলে ঘুমুতে চলে যান আলেকজান্ডার। এক সময় কাঁপুনি দিয়ে প্রচণ্ড জ্বর ওঠে। দ্রুত স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে তার। তিনি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েন যে, বিছানা থেকে উঠতে পারছিলেন না। বিশ্ব বিজয়ী এই বীর এর দশ দিন পর মারা যান। তবে আলেকজান্ডারের মৃত্যু নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। ভারতবর্ষ জয় করতে এলে সেখানকারই এক জ্যোতিষী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ব্যাবিলনই আলেকজান্ডারের শেষ গন্তব্য। ভারতবর্ষ থেকে ব্যাবিলনে যাওয়ার কোনো পূর্বপরিকল্পনা না থাকলেও নিয়তিই যেন তাঁকে সেখানে নিয়ে যায়।

সাধারণভাবে আলেকজান্ডারের মৃত্যুর ঘটনা এভাবে বলা হলেও তার মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো অজানা।

 

মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার তার বিশাল সাম্রাজ্য

ইতিহাসবিদরা বছরের পর বছর ধরে এ নিয়ে নানা বিতর্ক করে চলেছেন। কারও কারও মতে মদ কিংবা জ্বর নয়, বিষ প্রয়োগে মৃত্যু হয়েছে তার। আবার কেউ বলছেন, ম্যালেরিয়ায় মারা গেছেন আলেকজান্ডার। একদলের দাবি টাইফয়েডে। আবার অনেকেই অন্যান্য রোগের নাম বলছেন। তবে সবাই এ ব্যাপারে একমত, আলেকজান্ডার মারা যান খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দে। আবার অধিকাংশ সূত্র এটাও নিশ্চিত করেছে যে মৃত্যুর আগে তিনি প্রচণ্ড জ্বরে ভুগেছিলেন। টানা দশ দিন চলে এ জ্বর। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্য খণ্ড খণ্ড করে ভাগবাটোয়ারা করে নিলেন তার জেনারেলরা। মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তার গড়া বিশাল সাম্রাজ্য।

গ্রিক ইতিহাসবিদ অ্যারিয়ান আলেকজান্ডারের মৃত্যুর সাড়ে তিনশ বছর পর মহাবীরের মৃত্যুর একটা বর্ণনা দিয়ে গেছেন। অ্যারিয়ান যদিও আলেকজান্ডারের সমসাময়িক ছিলেন না, তবু তার এই বর্ণনার আলাদা একটি গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কারণ তিনি নাকি আলেকজান্ডারের রয়্যাল ডায়েরি অনুসরণ করে লিখেছিলেন। এই রয়েল ডায়েরিতে আলেকজান্ডারের সব অভিযানের সমকালীন কালপঞ্জির পুঙ্খানুপুঙ্খ উল্লেখ রয়েছে। অ্যারিয়ানের সেই লেখা অনুসারে আলেকজান্ডারের মৃত্যুর ঘটনাপঞ্জি এরকম।

বিশ্রামে আসার পর আলেকজান্ডার ডিভাইন সেক্রিফাইস বা ঐশ্বরিক উৎসর্গগুলো শেষ করেন। মূলত সৌভাগ্য অর্জনের লক্ষ্যে যাজকদের পরামর্শে এসব করেন তিনি। রাতে তিনি তার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে প্রচুর মদ পান করেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি চেয়েছিলেন মদের আসর ছেড়ে বিছানায় যেতে। কিন্তু তখন মেডিয়াসের সঙ্গে তার দেখা হয়। মেডিয়াস ছিলেন আলেকজান্ডারের সঙ্গীদের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত। মেডিয়াস তাকে আসর ছেড়ে না যাওয়ার অনুরোধ করেন। কারণ আলেকজান্ডারকে ছাড়া আসর জমবে না।

প্রথম দিন : ‘রয়েল ডায়েরিজ’ থেকে জানা যায়, তিনি প্রচুর মদ পান করেন। এ সময় মেডিয়াসের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করে মদোৎসব পালন করেন। একসময় আসর ভাঙে। উঠে গিয়ে গোসল করে শুতে যান ও ঘুমিয়ে পড়েন। এরপর আবার ফিরে আসেন মেডিয়াসের সঙ্গে রাতের খাবার খেতে। গভীর রাত পর্যন্ত প্রচুর মদ পান করেন। পান শেষে আবার গোসল করে সামান্য খাবার খেয়ে শুতে যান। এরই মধ্যে তার শরীরে জ্বর উঠে গেছে।

দ্বিতীয় দিন : কাস্টমারি সেক্রিফাইসের জন্য আলেকজান্ডারকে প্রতিদিনই কোচে করে বহন করে নেওয়া হতো। এটি সম্পাদনের পর তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত শুয়ে থাকতেন মেনস অ্যাপার্টমেন্টে। এ সময় তিনি তার অফিসারদের আগামী অভিযান ও সমুদ্রযাত্রা সম্পর্কে নির্দেশনা দেন। নির্দেশনার মধ্যে ছিল স্থলবাহিনী প্রস্তুত করা, পরদিন তার সঙ্গে নৌযাত্রা শুরু ইত্যাদি। এরপর আলেকজান্ডারকে কোচে করে নদী তীরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি একটি নৌকায় ওঠেন। এ নৌকা করে চলে যান বাগানে। সেখানে গোসল করে আবার বিশ্রামে যান।

তৃতীয় দিন : পরদিন আবার গোসল করে নির্দেশিত সেক্রিফাইস বা উৎসর্গ সম্পন্ন করেন। এরপর নিজের কক্ষে ঢোকেন। শুয়ে শুয়ে কথা বলেন মেডিয়াসের সঙ্গে। অফিসারদের পরদিন সকালে তার সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দিয়ে সামান্য খাবার খান। তাকে বহন করে নেওয়া হয় তার কক্ষে। সারা রাত শুয়ে থাকেন জ্বর নিয়ে।

চতুর্থ দিন : সকালে গোসল করেন এবং সেক্রিফাইস বা বলিদান সম্পাদন করেন। নিয়ারকাস ও অন্যান্য অফিসারকে নির্দেশ দেন দুই দিন পর সমুদ্র অভিযানের জন্য তৈরি হতে।

পঞ্চম দিন : পরদিন তিনি আবার গোসল সেরে সেক্রিফাইস সম্পন্ন করেন। এরপরও তার দেহে অব্যাহত জ্বর থাকে। তারপরও তিনি অফিসারদের ডেকে আনেন এবং অভিযানে যাওয়ার জন্য সব কিছু তৈরি করতে বলেন। বিকালে গোসলের পর তিনি আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

ষষ্ঠ দিন : পরদিন তাকে ডাইভিং প্লেসের হাউসে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি সেক্রিফাইস সম্পন্ন করেন। শরীর খারাপ সত্ত্বেও ঊর্ধ্বতন অফিসারদের ডেকে আনেন এবং অভিযানের ব্যাপারে নতুন করে নির্দেশনা দেন।

সপ্তম দিন : পর দিন দুর্বল থাকা সত্ত্বেও কোনোমতে সেক্রিফাইস সম্পন্ন করেন। তিনি জেনারেলদের হলে থাকতে বলেন। ব্রিগেডিয়ার ও কর্নেলরা থাকবেন সামনের দরজার কাছে। এবার তিনি খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে বাগান থেকে ফিরিয়ে নেওয়া হয় রয়েল অ্যাপার্টমেন্টে। অফিসাররা যখন প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের চিনতে পারলেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে একটি কথাও বলেননি।

নবম ও দশম দিন : রাতে তার শরীরে খুব বেশি জ্বর। আরেকটা দিন কাটল এভাবেই। পরদিন ও তারও পরদিন জ্বর থামেনি।

 

রয়েল ডায়েরিতে মহাবীরের মৃত্যু

রয়েল ডায়েরিতে উল্লিখিত তথ্যমতে জানা যায়, এই সময় সৈনিকরা তাকে দেখতে চেয়েছিলেন। কারণ অনেকেই ধারণা করতে শুরু করেছিলেন যে আলেকজান্ডার হয়তো আর বাঁচবেন না। কেউ কেউ তার মৃত্যুর আগে তাকে দেখতে চান। আবার কেউ কেউ দেখতে চান এ কারণে যে, এরই মধ্যে রটে গেছে তিনি মারা গেছেন। তারা মনে করছিল, তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা তার মৃত্যুর ব্যাপারটা গোপন করছিলেন কিংবা তেমনি একটা কিছু হয়েছে। সৈনিকদের অনেকেই দুঃখে-ক্ষোভে জোর করে তার কক্ষে ঢুকে পড়েন এবং আলেকজান্ডারকে দেখতে থাকেন। তারা বলেন, সৈন্যরা যখন সারি বেঁধে তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি ছিলেন বাকরুদ্ধ। তবে তিনি সবাইকে স্বাগত জানান কখনো মাথা নেড়ে কিংবা চোখের ইশারায়।

রয়েল ডায়েরির তথ্য মতে— পিথন, অ্যাটালাস, ডেমোফোন, পিউসেন্টাস, ক্লিওমেনসেস, মেনডিয়াস ও সেলিউকাস রাত কাটান সেবাপিস মন্দিরে। তারা ঈশ্বরের কাছে প্রশ্ন রাখেন আলেকজান্ডারকে তার রোগ নিরাময়ের প্রার্থনার জন্য মন্দিরে আনলে ভালো হবে কি না। বলা হয়, ঈশ্বরের জবাব ছিল আলেকজান্ডারকে মন্দিরে আনা ঠিক হবে না। বরং তিনি যেখানে আছেন, তাকে সেখানে রাখাই ভালো। সঙ্গীরা এ খবর নিয়ে এলো এবং অল্প সময় পর আলেকজান্ডার মারা যান। রয়েল ডায়েরিতে টলেমি ও অ্যারিস্টো বোলাসের দেওয়া তার মৃত্যু কাহিনীর এখানেই শেষ। আরেকটি বর্ণনা মতে শয্যাশায়ী আলেকজান্ডার কথা বলার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছিলেন। তখন সিলমোহর বসানো আংটি তাঁর কোনো এক সেনাপতির হাতে পরিয়ে দেওয়ার মতো শক্তি তাঁর শরীরে ঠিকই ছিল। ওই আংটি তিনি কাকে পরাতে চান, তা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি নাকি ফিসফিস করে বলতে সক্ষম হয়েছিলেন। আলেকজান্ডার উত্তরে বলেছিলেন, ‘যে সবচেয়ে শক্তিশালী।’ তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিকাল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে কোনো এক সময়ে। তারিখটা খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সালের ১১ জুন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৩। তাঁর মৃত্যুশয্যায় উপস্থিত ছিলেন তাঁর সেনাদলের সদস্যরা, স্ত্রী ও খোজারা; মেসিডোনিয়া, গ্রিস, পারস্য ও ব্যাবিলনের মানুষ। আগেই বলা হয়েছে তার মৃত্যু নিয়ে নানা মতের প্রচলন রয়েছে। বলা হচ্ছে—  এখানে এসে তাকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করেছেন অ্যান্টিপাটার। অ্যান্টিপাটার ছিলেন খুব নামকরা একজন অধিনায়ক। আলেকজান্ডার যখন এশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়ের, তখন অ্যান্টিপাটারের হাতে মেসিডোনিয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল।

 

মৃত্যুশয্যায় তিন ইচ্ছা

 মৃত্যুশয্যায় আলেকজান্ডার তাঁর সেনাপতিদের ডেকে বলেছিলেন, ‘আমার মৃত্যুর পর ৩টা ইচ্ছা তোমরা পূরণ করবে। এতে যেন কোনো ব্যত্যয় না ঘটে। প্রথম অভিপ্রায়, শুধু চিকিৎসকরা আমার কফিন বহন করবেন। দ্বিতীয় অভিপ্রায়, আমার কফিন যে পথ দিয়ে গোরস্তানে নিয়ে যাওয়া হবে, সেই পথে কোষাগারে সংরক্ষিত সোনা, রুপা ও অন্যান্য মূল্যবান পাথর ছড়িয়ে দিতে হবে। শেষ ইচ্ছে, কফিন বহনের সময় আমার দুই হাত কফিনের বাইরে ঝুলিয়ে রাখতে হবে।’ তাঁর মৃত্যুশয্যায় উপস্থিত লোকজন মহাবীর আলেকজান্ডারের এই অদ্ভুত অভিপ্রায়ে বিস্মিত হন। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পাচ্ছিলেন না কেউ। তখন আলেকজান্ডারের একজন প্রিয় সেনাপতি তাঁর হাতটা তুলে ধরে চুম্বন করে বলেন, ‘হে মহামান্য, অবশ্যই আপনার সব অভিপ্রায় পূর্ণ করা হবে; কিন্তু আপনি কেন এই বিচিত্র অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন?’ দীর্ঘ একটা শ্বাস গ্রহণ করে আলেকজান্ডার বললেন, ‘আমি দুনিয়ার সামনে তিনটি শিক্ষা রেখে যেতে চাই। আমার চিকিৎসকদের কফিন বহন করতে বলেছি এ কারণে যে, যাতে লোকে অনুধাবন করতে পারে চিকিৎসকরা আসলে কোনো মানুষকে সারিয়ে তুলতে পারেন না। তাঁরা ক্ষমতাহীন আর মৃত্যুর থাবা থেকে কাউকে রক্ষা করতে অক্ষম। গোরস্তানের পথে সোনা-দানা ছড়িয়ে রাখতে বলেছি কারণ মানুষকে এটা বোঝাতে যে ওই সোনা-দানার একটা কণাও আমার সঙ্গে যাবে না। আমি এগুলো পাওয়ার জন্য সারাটা জীবন ব্যয় করেছি, কিন্তু নিজের সঙ্গে কিছুই নিয়ে যেতে পারছি না। মানুষ বুঝুক ধন-সম্পদের পেছনে ছোটা সময়ের অপচয় মাত্র। কফিনের বাইরে আমার হাত ছড়িয়ে রাখতে বলেছি মানুষকে এটা জানাতে যে খালি হাতে আমি এই পৃথিবীতে এসেছিলাম, আবার খালি হাতেই পৃথিবী থেকে চলে যাচ্ছি।’

 

কোথায় আলেকজান্ডারের প্রকৃত সমাধি?

(৩৭৯-৩৯৫) সময়কালে আলেকজান্দ্রিয়ায় ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়। পঞ্চদশ শতকে এ শহরের গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এর পাঁচ দশক পরই হঠাৎ আলেকজান্ডারের সমাধি অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু বিখ্যাত এ গ্রিক সম্রাটের দেহাবশেষ কোথায় রাখা আছে— তার উত্তর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অনেকের দাবি গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডারের দেহাবশেষ চলে যায় বহুদূরে বেনিসের সেন্ট মার্ক গোরস্তানে। কিন্তু কেন? ইতিহাস তার উত্তর পায়নি। অসংখ্য অনুসন্ধান চালিয়েও মিসরের পুরাতত্ত্ববিদরা বলতে পারেননি, কোথায় রয়েছে রাজার শেষ স্মৃতি।

তবে মাঝে মধ্যে হঠাৎই একআধটা আবিষ্কারে চমকে ওঠে সবাই। সম্প্রতি যেমন হলো এক সময় যেখানে ম্যাসিডন ছিল, সেখানে প্রাচীন শহর অ্যামপিফোলিসের কাস্তা সমাধিক্ষেত্রে পাওযা গেল মার্বেলে মোড়া এক রাজকীয় সমাধির খোঁজ। সবাই বলাবলি করতে লাগল পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে! টির সঙ্গে আলেকজান্ডারের সম্পর্ক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন এখন তাঁরা। ধারণা করা হচ্ছে, এই সমাধিমন্দিরটি নির্মাণ করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩২৫ থেকে ৩০০ সালের মধ্যবর্তী কোনো একসময়ে। তবে অনেকেই এখন মনে করছেন, সমাধিমন্দিরটি আলেকজান্ডারের মা অলিম্পিয়াসের। সমাধিমন্দিরের ভিতর পাওয়া মার্বেল পাথর দিয়ে বানানো স্ত্রী-মূর্তিটি সে কথাই বলে। তখনকার অভিজাত নারীদের কবরে পাওয়া যেত এই মূর্তি।

একই সমাধি নিয়ে রয়েছে আরও মত। বলা হয়, রোমান সম্রাট ক্যালিগুলা ছিলেন আলেকজান্ডারের শৌর্যবীর্যের খুব ভক্ত। তিনি মিসরে রাজার সমাধির গল্পে দুঃখ পান। তাই দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সম্মানে তাকে স্বদেশ গ্রিসে এনে সমাধিস্থ করেন। এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়। অনেকেই বলেন, সমাধিটি আলেকজান্ডারের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু টলেমি সোটার সম্রাটের শববাহী গাড়ি নিয়ে কেটে পড়ায় এটি পরিত্যক্ত ছিল। পরে রাজপরিবারেরই কাউকে এখানে সমাধি দেওয়া হয়। ফলে আজও এ কাহিনীর ইতি টানা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানীরা এখনো হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন রাজা আলেজান্ডারের সমাধি।

অবশ্য ১৮৮৭ সালে লেবানন থেকে একটি শিল্পকীর্তি আবিষ্কার হয়। সেটি একটি শবাধার, যা বর্তমানে রাখা আছে ইস্তাম্বুল জাদুঘরে। সেটির নামফলকে লেখা ‘আলেকজান্ডার সারকোফেগাস’। অর্থাৎ আলেকজান্ডারের শবাধার। সেই হিসেবে আলেকজান্ডারের শবাধার মিলেছে বলে স্থাপত্যবিদরা দাবি করলেও ইতিহাসবিদরা একমত নন। তাদের মতে এটি সম্ভবত সিডন এর রাজা ‘আবদালোনিমাস’এর। সম্ভবত শবাধারটির গায়ে আলেকজান্ডার ও তাঁর সেনাবাহিনীর ছবি খোদাই থাকায় এটি জাদুঘরে ঠাঁই পেয়েছে। যাকে সবাই চেনে আলেকজান্ডারের সমাধি হিসেবে।

তাহলে কোথায় আলেকজান্ডারের প্রকৃত সমাধি? ইতিহাসবিদদের ধারণা, গ্রিক বীরের শেষ সমাধিটি সম্ভবত ২৭০ খ্রিস্টাব্দে ভেঙে ফেলে দুষ্কৃতকারীরা। অবশ্য এর পরেও অনেকেই আলেকজান্ডারের সমাধি দেখার দাবি করেছেন। এদের মধ্যে আছেন ইতিহাসবিদ ও পর্যটক ইবনে আবদেল হাকাম, আল মাসুদি, লিও দ্য আফ্রিকানসহ অনেকেই। কিন্তু এরা শুধু দেখার কথাই বলেছিলেন। কোথায় দেখেছিলেন তার স্পষ্ট উল্লেখ নেই। আর এভাবেই এখনো রহস্য হয়ে রয়েছে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সমাধি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহাসিক স্থানসমূহের পরিবর্তন ঘটেছে। বিভিন্ন দেশের মানচিত্রেও এসেছে নানা পরিবর্তন। তাই অনেক ঐতিহাসিক স্থানেরই এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। অনেক স্থানেই তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল অট্টালিকা।

এর ফলে দিন দিন এ রহস্যের উন্মোচন করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। তারপরও বিজ্ঞানীদের মতো আমরাও আশায় আছি এক দিন না এক দিন হয়তো বা এ রহস্যের যবনিকাপাত ঘটবে। আর ততদিন পর্যন্ত এ রাজকাহিনীর শেষটা হয়ে থাকবে এক রহস্যের আধার।


আপনার মন্তব্য