Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২৩:৫৮

কলঙ্কিত কারবালার করুণ কাহন

কলঙ্কিত কারবালার করুণ কাহন
আরবি আশারা শব্দের অর্থ ১০। এই আশারা থেকেই জন্ম নেয় আশুরা শব্দটি, যা আজও অশ্রু ঝরায় মুসলমানদের চোখে। মহররমের ১০ তারিখে কারবালার মরুভূমিতে হৃদয়বিদারক ঘটনার সমার্থক হয়ে ওঠে আশুরা শব্দটি। কারবালার সেই  করুণ উপাখ্যান তুলে ধরেছেন মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি

 

শোক নিয়ে শুরু

হিজরি সাল বা আরবি নতুন বছরের প্রথম মাস মহররম। বিভিন্ন জাতি, ধর্ম এবং গোষ্ঠীতে প্রচলিত নতুন বছর ও নতুন মাস সবসময় আনন্দ বার্তা নিয়ে শুরু হয়। অথচ মুসলমানদের মাঝে আরবি বছরের প্রথম মাস ‘মহররম’ আসে শোকের স্মৃতি নিয়ে। এই মাসের ১০ তারিখে হিজরি ৬১ সাল বা ১০ অক্টোবর ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ইরাকের কারবালার মরুভূমিতে হৃদয়বিদারক হত্যাকান্ডের শিকার হন ইসলামের সর্বশেষ নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় নাতি এবং হজরত আলী (রা.) ও মা ফাতেমা (রা.)-এর সন্তান হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)সহ তার পরিবার ও গোত্রের ৭২ সদস্য। তাই নতুন বছরের নতুন মাস মহররম আজও আবর্তিত হয় শোকের ছায়া নিয়ে।

 

বিষের যন্ত্রণায় হজরত আলী (রা.) ও ইমাম হাসান (রা.)-এর মৃত্যু

হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর পর মুসলমানদের নেতৃত্ব দেন চার খলিফা। চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) হিজরি ৪০ সালের ১৯ রমজান (২৯ জানুয়ারি ৬৬১ সাল) সকালে ফজর নামাজ পড়ার সময় ইরাকের কুফা মসজিদে ইবনে মুলজামের বিষ মাখানো তরবারির আঘাতে মারাত্মক জখমের শিকার হন এবং দুইদিন যন্ত্রণাভোগের পর মৃত্যুবরণ করেন। কুফাবাসীর মধ্যে একটি অংশ তখন হজরত আলী (রা.)-এর বড় পুত্র ইমাম হাসান (রা.)-কে মুসলমানদের নেতা ঘোষণা করে। পক্ষান্তরে মিসর, সিরিয়া, সাইপ্রাস, তুরস্কসহ একটি বিরাট অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ তখন সেনাপতি মুয়াবিয়ার হাতে। তিনি ইমাম হাসান (রা.)-এর নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেননি। ফলে নিজেকে মুসলমানদের নেতা ঘোষণা করে মুয়াবিয়া বিশাল সৈন্যদল নিয়ে ইরাকে চলে আসেন। পরবর্তীতে কূটরাজনীতি, অর্থের প্রলোভন এবং বল প্রয়োগ করে মুয়াবিয়া ইমাম হাসান (রা.)-এর পক্ষের একটি বড় অংশের আনুগত্য লাভ করেন। পরিস্থিতির শিকার হয়ে এবং মুসলমানদের ঐক্যের কথা বিবেচনা করে ইমাম হাসান (রা.) মুয়াবিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি করেন। এই চুক্তির আলোকে ধারণা করা হয়েছিল যে, আরববিশ্ব একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিময় অঞ্চলে পরিণত হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এই চুক্তি পরবর্তীতে রাজতন্ত্রের সূচনা করে। চুক্তির শর্তানুসারে মুয়াবিয়া কেবল একজন শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন কিন্তু কোনো পরিবারতন্ত্র করবেন না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় এই চুক্তির ফলে ইমাম হাসান ক্ষমতা, রাজনীতি এমনকি সামাজিক অবস্থান থেকে অনেক দূরে সরে যান এবং ৯ বছর একপ্রকার নীরবে থেকে মৃত্যুবরণ করেন। ইমাম হাসানকে বিষ প্রয়োগে হত্যার বিষয়টি প্রমাণিত হলেও ঠিক কে এই বিষ প্রয়োগ করেছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন লেখা ও গবেষণায় বিষ প্রয়োগকারী হিসেবে তার স্ত্রী, নারী গৃহকর্মী অথবা নিকটাত্মীয় বা নিকটাত্মীয়দের স্ত্রীর নাম প্রকাশিত হয়।

 

দৃশ্যপটে ইমাম হোসাইন (রা.)

ইমাম হাসান (রা.)-এর মৃত্যুর পর তার ছোট ভাই ইমাম হোসাইন (রা.) বানু হাশেম তথা হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর পরিবার বা গোত্রের প্রধান নির্বাচিত হন। এ সময় ইরাকের কুফাবাসীর মধ্যে যারা হজরত আলী (রা.) ও তার পরিবারের প্রতি অনুগত ছিলেন, তারা ইমাম হোসাইন (রা.) কে কুফায় আমন্ত্রণ জানান এবং মুসলিম বিশ্বের হাল ধরার প্রস্তাব দেন। কুফাবাসীর মধ্যে এই অংশটি বিভিন্ন কারণে মুয়াবিয়ার ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু ইমাম হোসাইন (রা.) তার ভাইয়ের সময়ের সম্পাদিত চুক্তির কথা উল্লেখ করে মুয়াবিয়া জীবিত থাকা অবস্থায় এই প্রস্তাবে সম্মত ছিলেন না।

 

এজিদের উত্থান

৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে মুয়াবিয়া তার অবর্তমানে তারই পুত্র ইয়াজিদকে কুফা তথা মুসলিম বিশ্বের নেতা ঘোষণা করেন। এ ধরনের পরিবারতন্ত্র ইসলাম ও চুক্তিবিরোধী ছিল বিধায় অনেকেই তা মেনে নিতে পারেননি। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন চার খলিফার বংশধর। মুয়ারিয়া এ সময় সিরিয়ার দামেস্কে এক সম্মেলন ডেকে মুসলমান বিশ্বের সমর্থন কামনা করেন। কিন্তু অনেকেই এ ধরনের পরিবারতন্ত্র মেনে নিতে অস্বীকার করেন। এরপর মুয়াবিয়া মদিনা গেলে মদিনাবাসী তাকে ফিরিয়ে দেন। কিন্তু ভয়, আর্থিক লোভ এবং কূটকৌশল প্রয়োগ করে মুয়াবিয়া মক্কাবাসীর সমর্থন আদায় করেন। পরবর্তীতে মদিনাবাসীর একটি বড় অংশও মুয়াবিয়ার পক্ষ অবলম্বন করে এবং এজিদকে মুয়াবিয়ার উত্তরসূরি তথা মুসলমানদের পরবর্তী নেতা মেনে নেয়।

ইংরেজি ৬৮০ সালে (হিজরি ৬১ সাল) অসুস্থতার কারণে মুয়াবিয়ার মৃত্যু ঘটে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী এপ্রিলের ৭ অথবা ২১ তারিখে তার পুত্র এজিদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। মৃত্যুর আগে মুয়াবিয়া হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর নাতি, হজরত আলী (রা.)-এর পুত্র এবং ইমাম হাসানের ভাই ইমাম হোসাইন (রা.) সম্পর্কে এজিদকে সতর্ক করেন। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই পিতার আদেশ মোতাবেক এজিদ তার আনুগত্য স্বীকারের জন্য ইমাম হোসাইন (রা.)-কে বার্তা পাঠান। তৎকালীন মদিনার শাসক ওয়ালিদ ইবনে উতাবের মাধ্যমে এই বার্তা পেলেও ইমাম হোসাইন (রা.)এই আনুগত্য মেনে নিতে অস্বীকার করেন। কারণ ইমাম হোসাইন (রা.)  মনে করেন, আগে চুক্তি ছিল তার ভাই ইমাম হাসান (রা.) এবং এজিদের পিতা মুয়াবিয়ার মধ্যে। সুতরাং উভয়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই চুক্তির কার্যকারিতার সমাপ্তি ঘটেছে। ইমাম হোসাইন (রা.) এর এমন মনোভাবের কারণে মদিনার আরেক নেতা তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এর ফলে ইমাম হোসাইন (রা.) ৬৭৫ সালের রজব মাসে মদিনা ছেড়ে মক্কায় চলে যান।

কুফাবাসীর আমন্ত্রণ

ইমাম হোসাইন (রা.) এ সময় ইরাকের কুফা থেকে ক্রমাগত আনুগত্য ও সমর্থন পেতে থাকেন। কুফাবাসীর এই অংশ নানা কারণে এজিদের ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইমাম হোসাইন (রা.) বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার জন্য তার বিশ্বাসভাজন চাচাত ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে ইরাকের কুফায় পাঠান। মুসলিমের আগমনকে কুফাবাসীর একটি অংশ স্বাগত জানায় এবং সমর্থন প্রদান করে। ফলে মুসলিম ইমাম হোসাইন (রা.) কে কুফায় আগমনের সবুজ সংকেত পাঠান। এই খবর এজিদের কাছে পৌঁছলে তিনি ক্রোধে ফেটে পড়েন এবং কুফার শাসক নোমান বিন বাশিরকে তাৎক্ষণিক ক্ষমতাচ্যুত করে তার স্থলে বসরার শাসক ওবায়েদউল্লা ইবনে জিয়াদকে নিয়োগ দেন। নিয়োগ পেয়ে ওবায়েদ কুফায় বসবাসরত এজিদবিরোধীদের নিষ্ঠুরভাবে দমন করেন এবং ইমাম হোসাইন (রা.) এর প্রতিনিধি মুসলিমকে হত্যা করেন। বসরায় প্রেরিত ইমাম হোসাইন (রা.) এর আরেক বার্তাবাহককেও এ সময় হত্যা করা হয়। কুফা ও বসরার এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে ইমাম হোসাইন (রা.) অবহিত ছিলেন না। তাই তিনি পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও অনুসারীদের নিয়ে কুফায় গমনের পরিকল্পনা করেন।

 

কুফার পথে ইমাম হোসাইন (রা.)এর কাফেলা

ইমাম হোসাইন (রা.) মক্কায় প্রায় পাঁচ মাস অবস্থান করে হজের ঠিক একদিন আগে অর্থাৎ হিজরি ৬০ সালের ৮ জিলহজ তারিখে (৯ সেপ্টেম্বর ৬৮০) তার পরিবার ও প্রায় ৫০ জন সঙ্গী নিয়ে ইরাকের কুফার দিকে যাত্রা করেন। পথে তামিন নামক স্থানে ইয়েমেনের শাসকের পক্ষ থেকে এজিদের জন্য পাঠানো প্রাকৃতিক রং ও কাপড় বহনকারী একটি কাফেলা আটকে দেয় ইমাম হোসাইন (রা.) এর দল। আরেকটু এগিয়ে তালাবিয়া নামক স্থানে ইমাম হোসাইন (রা.) পৌঁছলে কুফায় প্রেরিত দূত ও চাচাত ভাই মুসলিমকে হত্যার খবর পান এবং কুফাবাসীর গৃহবিবাদের বিষয়টি অনুধাবন করেন। ইমাম হোসাইন (রা.) এ অবস্থায় ফেরত যাওয়ার কথা ভাবলেও প্রাণ হারানো মুসলিমের হত্যার  প্রতিশোধ নেওয়ার অদম্য প্রত্যয়ে কুফার দিকে এগিয়ে যান। আরও এগিয়ে জুবালা নামক স্থানে পৌঁছলে ইমাম হোসাইন (রা.) প্রেরিত  আরেকজন দূতকে হত্যার খবর আসে। এ অবস্থায় ইমাম হোসাইন (রা.) তার সঙ্গীদের নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার আদেশ দেন। রাস্তায় তার সঙ্গে যোগ দেওয়া কিছু মুসলমান এ সময় দলত্যাগ করলেও মক্কা থেকে আসা সঙ্গীরা তার সঙ্গে থেকে যায়। কুফার দিকে এগোতে থাকা ইমাম হোসাইন (রা.) এ কাফেলা এজিদের অগ্রবর্তী দলে থাকা প্রায় ১০০০ সৈন্যের সামনে পড়েন কুফার দক্ষিণে কুদসিয়া নামক স্থানে। এখানে সৈন্যদের ইমাম হোসাইন (রা.) তার কাছে পাঠানো কুফাবাসীর আমন্ত্রণপত্র দেখালে সৈন্যরা তা প্রত্যাখ্যান করে এবং ইমাম হোসাইন (রা.)-কে তাদের সঙ্গে ওই অঞ্চলের শাসক ইবনে জিয়াদের কাছে যেতে বলে। ইমাম হোসাইন (রা.) তা অস্বীকার করলে এজিদ বাহিনী তাকে কুফা বা মক্কা বাদে অন্য কোথায় যেতে অনুমতি দেয়। ইমাম হোসাইন (রা.) তখন কুদসিয়ার দিকে যাত্রা করেন। তাকে অনুসরণ করা এজিদ বাহিনী তখন স্থানীয় শাসক ইবনে জিয়াদের আদেশে জনবসতি থেকে দূরে এবং পানির উৎসবিহীন স্থানে সরে যেতে বাধ্য করে। এর ফলে তিনি কুফা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে এক নির্জন মরুভূমিতে তাঁবু স্থাপনে বাধ্য হন। ইতিহাসের পাতায় এই স্থানটি ‘কারবালা’ নামে বহুল পরিচিত।

 

কারবালার যুদ্ধ

মহররমের ৩ তারিখে (৬১ হিজরি) তথা ৩ অক্টোবর ৬৮০ সালে ইবনে জিয়াদের আদেশে এবং ওমর বিন সাদের নেতৃত্বে ৪০০০ সৈন্য কারবালা এলাকা ঘিরে ফেলে। প্রথমে দ্বিধা করলেও ইবনে জিয়াদের ভয়ে ওমর ও তার দল ইমাম হোসাইন (রা.) যুদ্ধের বদলে সমঝোতার চেষ্টা চালাতে থাকেন। সমঝোতার এক পর্যায়ে ওমর ইবনে জিয়াদকে জানান যে, ইমাম হোসাইন (রা.) ফেরত যাবেন। প্রতি উত্তরে ইবনে জিয়াদ ইমাম হোসাইন (রা.) কে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করতে বলেন, অন্যথায় বল প্রয়োগের আদেশ দেন। এ সময় পার্শ্ববর্তী ইউফ্রেটিস নদী তীরে যাওয়ার রাস্তায় ৫০০ সৈন্য বসিয়ে এজিদ বাহিনী ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার পরিবার ও সঙ্গী ৫০ জনকে তিন দিন পানিবিহীন অবস্থায় থাকতে বাধ্য করেন। এতেও ইমাম হোসাইন (রা.) আত্মসমর্পণে অসম্মত থাকায় এজিদ আরেক নেতা সিমার ইবনে জিল জাওশানকে (সংক্ষেপে সীমার) পাঠান ইমাম হোসাইন (রা.) কে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা, হত্যা করা অথবা তার দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করার জন্য। ইবনে জিয়াদের ভয়ে তখন ইবনে সাদও সিমারের সঙ্গে যোগ দেন এবং ৯ অক্টোবর ৬৮০ সাল তথা ৯ মহররম ৬১ হিজরিতে বিশাল সৈন্যদল নিয়ে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর কাফেলার কাছে অবস্থান নেন।

পরদিন ১০ অক্টোবর ৬৮০ সাল (১০ মহররম ৬১ সাল) সকালে ফজর নামাজের পর মুখোমুখি অবস্থান নেয় উভয় বাহিনী। অধিকাংশের মতে, এ সময় ইমাম হোসাইনের (রা.) পক্ষে ছিল মাত্র ৩২টি ঘোড়া ও ৪০ জন পদাতিক যোদ্ধা। এ সংখ্যা আরও বেশি ছিল বলে অনেকের ধারণা। এ সময় ইমাম হোসাইন (রা.) এক আবেগঘন বক্তৃতা দেন এবং এজিদ বাহিনীকে তার সঙ্গে নানা হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তখন এজিদ বাহিনীর অনেকে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর দলে যোগ দেন।

অবস্থা ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পক্ষে যেতে পারে ধারণা করে এজিদ বাহিনী তখন শত শত তীর নিক্ষেপ শুরু করে। এরপরই শুরু হয় সরাসরি তরবারি যুদ্ধ। যেখানে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর অনেক সৈন্যকে হত্যা করা হয়। থেমে থেমে চলতে থাকে আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণ। বাদ যায়নি হাতাহাতি লড়াইও। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর দুই প্রান্তের সৈন্যরা শত্রুর আক্রমণ ঠেকিয়ে দিতে সমর্থ হয়। অশ্বারোহী শত্রুদেরও সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর অশ্বারোহী বাহিনী। এ সময় ইবনে জিয়াদ ৫০০ তীরন্দাজকে আদেশ দেন ইমাম হোসাইন (রা.)-এর অশ্বারোহী বাহিনীকে আক্রমণ করার। এই তীরের আঘাতে আহত হয় অনেক ঘোড়া। সৈন্যরা তখন ঘোড়া থেকে নেমে পায়ে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যান। অন্যদিকে ইবনে জিয়াদ সব তাঁবুতে আগুন লাগানোর আদেশ দিলেও এজিদ বাহিনী ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার পরিবারের জন্য স্থাপিত তাঁবু বাদে বাকি সব তাঁবুতে আগুন লাগিয়ে দেয়। দিনভর যুদ্ধের শেষভাগে এজিদ বাহিনী সিমারের নেতৃত্বে সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। এতে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পুত্র আলী আকবরসহ তার সঙ্গী, সাথী, আত্মীয়দের মধ্যে প্রায় সবাই শাহাদতবরণ করেন। এ সময় ইমাম হোসাইন (রা.)-এর ছোট্ট সন্তান (আজগর) পানির জন্য অস্থির হয়ে উঠলে ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তার সৎ ভাই আব্বাস পানির জন্য ছুটে যান নদীর দিকে। পথে তাদের পৃথক করে ফেলে এজিদ বাহিনী। এ সময় আব্বাসের কোলে থাকা ছোট্ট আজগরের গায়ে একটি তীর বিদ্ধ হলে তিনিও শাহাদতবরণ করেন।

 

ইমাম হোসাইন (রা.)-এর জীবনাবসান

শিশুপুত্র আজগরের জন্য পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন ইমাম হোসাইন (রা.)। এ সময় এজিদের বিশাল বাহিনীকে মোকাবিলার তেমন শক্তি ছিল না ইমাম হোসাইন (রা.) বাহিনীর। তারপরও এজিদ বাহিনী ইমাম হোসাইন (রা.)-কে সরাসরি আক্রমণের ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল এবং প্রত্যক্ষভাবে কেউই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত বা রাজি ছিল না। এমন সময় ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মুখে একটি তীর বিদ্ধ হয়। মুখ থেকে ঝরতে থাকে রক্ত। দুই হাতের তালুতে জমিয়ে ইমাম হোসাইন (রা.) তা আকাশের দিকে ছুড়ে দেন এবং আল্লাহর দরবারে এই নৃশংসতার বিচার দাবি করেন। এতে বিরোধী সৈন্যরা আরও বিচলিত হয়ে যায়, এমতাবস্থায় এগিয়ে আসে এজিদের বিশেষ ভক্ত মালিক ইবনে নুসাইয়ার। এরপর ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মাথায় সরাসরি আঘাত করে নুসাইয়ার। এতে তার মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে এবং মাথায় বাঁধার জন্য ব্যবহৃত কাপড় (স্কার্ফ) কেটে যায়। রক্তমাখা সেই কাপড় নিয়ে পিছিয়ে যায় মালিক ইবনে নুসাইয়ার। এ সময় সিমার এগিয়ে যায় এবং তার সৈন্যদের আঘাত হানার আদেশ দেয়। ইমাম হোসাইন (রা.)-কে বাঁচাতে তার সঙ্গী নারী ও শিশুরাও এগিয়ে আসে এবং একটি শিশু তরবারির আঘাতে হাত হারায়। এতে সৈন্যরা আরও বিচলিত হলে ক্রুদ্ধ সিমার তার বিশেষ দল নিয়ে এগিয়ে যায় এবং ইমাম হোসাইন (রা.)-কে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে। এতে উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে যান ইমাম হোসাইন (রা.)। এই সুযোগে সিমারের নির্দেশে সিনান ইবনে আনাস নামের এক সৈন্য ছুরি দিয়ে ইমাম হোসাইন (রা.)-কে আঘাত করে এবং তার মাথা শরীর থেকে আলাদা করে ফেলে।

 

মাথা নিয়ে মাতামাতি

হত্যা ও মাথা বিচ্ছিন্ন করার পরও উন্মত্ত সিমার ও তার দল ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শরীরের ওপর ঘোড়া চালিয়ে দেয় এবং ঘোড়ার খুরের আঘাতে মৃতদেহ ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে। ইমাম হোসাইন (রা.)এর বেঁচে থাকা অল্প সংখ্যক সদস্যকে তখন স্থানীয় শাসক ইবনে জিয়াদের কাছে পাঠানো হয়। আরও পাঠানো হয় ইমাম হোসাইন (রা.)এর বিচ্ছিন্ন মাথা। এই বিচ্ছিন্ন মাথার মুখে লাঠি ঢুকিয়ে দেয় ইবনে জিয়াদ। এরপর এই মাথা এবং অন্য সবাইকে এজিদের কাছে পাঠিয়ে দেন। এজিদও ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বিচ্ছিন্ন মাথার মুখে লাঠি ঢুকিয়ে দেয়। পরবর্তীতে আটকদের মদিনায় ফেরত পাঠানো হয়।

 

কারবালায় শহীদদের ভাগ্যে ঠিক কী জুটেছিল, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। একদল ইতিহাস রচয়িতার মতে, পার্শ্ববর্তী গ্রামবাসী ইমাম হোসাইন (রা.)সহ অন্যদের মৃতদেহ কারবালাতেই কবরস্থ করেন। এখানে কবরস্থ অধিকাংশের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ইতিহাস রচয়িতাদের একদল মনে করেন, এজিদ ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বিচ্ছিন্ন মাথা কারবালায় ফেরত পাঠালে তা শরীরের সঙ্গে কবরস্থ করা হয়। অন্যদের মতে, এই মাথা মদিনাসহ অন্তত সাতটি পৃথক স্থানে কবরস্থ করার ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। শিয়া সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, মহররমের ১০ তারিখে শাহাদতবরণকারী ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পবিত্র মাথা ৪০ দিন পর কারবালায় ফেরত আনা হয় এবং দেহের সঙ্গে সংযুক্ত করে পুনরায় কবরস্থ করা হয়। তাই শিয়া সম্প্রদায় আশুরা উপলক্ষে এই ৪০ দিন শোক পালন করে থাকে। তবে ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়সহ অন্যান্য বহু সম্প্রদায় এই বিচ্ছিন্ন মাথা নিয়ে বিভিন্ন মত বিশ্বাস করেন। দামেস্কের একটি মসজিদে দীর্ঘদিন এই মাথা ঝুলানা ছিল বা দেয়ালে আবদ্ধ ছিল বলেও তথ্য পাওয়া যায়। 

                (তথ্য সূত্র : উইকিপিডিয়া)।

লেখক : প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা, বর্তমানে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষক।

 

 

কারবালায় শহীদ হজরত আলী (রা.) এর বংশধর

১। নাম ইমাম হোসাইন (রা.), পরিচয় হজরত আলী (রা.) এর পুত্র ২। আব্দুল্লাহ ইবনে আলী, পরিচয় হজরত আলী (রা.) এর পুত্র ৩। উসমান ইবনে আলী, পরিচয় হজরত আলী (রা.) এর পুত্র ৪। জাফর ইবনে আলী,  পরিচয় হজরত আলী (রা) এর পুত্র ৫। আবু বকর ইবনে আলী, পরিচয় হজরত আলী (রা.) এর পুত্র ৬। মুহাম্মদ ইবনে আলী, পরিচয় হজরত আলী (রা.) এর পুত্র। ৭। কাসিম ইবনে হাসান, পরিচয় ইমাম হাসান (রা.) এর পুত্র ৮। আবু বকর ইবনে হাসান, পরিচয় ইমাম হাসান (রা.) এর পুত্র ৯। আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান, পরিচয় ইমাম হাসান (রা.) এর পুত্র ১০। আলী আকবর, পরিচয় ইমাম হোসাইন (রা.) এর পুত্র ১১। আলী আসগর (আব্দুল্লাহ) পরিচয়, ইমাম হোসাইন (রা.) এর পুত্র।

                                তথ্য সূত্র : উইকিপিডিয়া


আপনার মন্তব্য