শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৯ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ মে, ২০২১ ২২:০৮

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শত বছরের সংকট

১৮৯৭ সালে আত্মপ্রকাশ করে বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থা ওয়ার্ল্ড জায়নিস্ট অর্গানাইজেশন। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে বলপূর্বক প্রতিষ্ঠা করা হয় জায়নবাদী বা উগ্র ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েল। আর এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠালগ্নে লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাঁদের পিতৃপুরুষের আবাসভূমি থেকে উচ্ছেদ ও বিতাড়ন করা হয় হত্যা, হামলা, ধর্ষণ ও লুটতরাজ চালিয়ে। এতে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি অসহায় অবস্থায় উদ্বাস্তু ও শরণার্থী হয়ে পড়ে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের এই সংকট চলছে শত বছর ধরে...

সাইফ ইমন

 ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শত বছরের সংকট
Google News

আশ্রয় নিয়ে শেষে জমি দখল

ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা

১৯৩০-এর দশকে ফিলিস্তিনিরা বুঝতে পারল যে, তাঁরা ধীরে ধীরে জমি হারাচ্ছে ইহুদিরা দলে দলে সেখানে আসে এবং জমি ক্রয় করতে থাকে...

ইহুদিদের দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়ায় ব্রিটিশ সরকার। মূলত ইহুদি উপনিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তার হাত বাড়ায় তারা। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে তখনই। ব্রিটিশদের সহযোগিতায় সে সময় প্রায় ৬ লাখ ইহুদি প্রবেশ করে ফিলিস্তিনে। গাজা থেকে দুই মাইল উত্তরে কিবুটস এলাকা। এখানে ইহুদিরা কৃষি খামার গড়ে তুলেছিল। ইহুদিদের পাশেই ছিল ফিলিস্তিনিদের বসবাস। সেখানে ফিলিস্তিনিদের কৃষি খামার ছিল। যারা কয়েক শতাব্দী ধরে সেখানে বসবাস করছিল। শুরুতে ইহুদিরা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই চলছিল। সরল ফিলিস্তিনিরাও তাদের মেনে নিয়ে বসবাস করে আসছিল। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকে ফিলিস্তিনিরা বুঝতে পারল যে, তারা ধীরে ধীরে জমি হারাচ্ছে। ইহুদিরা দলে দলে সেখানে জমি ক্রয় করতে থাকে। এর আগে ১৯১৭ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনের ভূমি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে তুরস্কের সেনাদের হাত থেকে জেরুজালেম দখল করে ব্রিটেন। তখন ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, ফিলিস্তিনের মাটিতে ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের জন্য সহায়তা করবে। ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার সময় প্রায় ৭ লাখের মতো ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ে। তারা ভেবেছিল দ্রুত সমস্যার সমাধান হলে তারা বাড়ি ফিরে আসতে পারবে। কিন্তু ইসরায়েল তাদের আর কখনো বাড়িতে ফিরতে দেয়নি। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে এক ভোটাভুটিতে ফিলিস্তিনকে দুই টুকরো করে দুটি পৃথক ইহুদি এবং আরব রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হলো। জেরুজালেম থাকবে একটি আন্তর্জাতিক নগরী হিসেবে। ইহুদি নেতারা সেই প্রস্তাব মেনে নেন, কিন্তু আরব নেতারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। জাতিসংঘের সেই পরিকল্পনা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি।  ইসরায়েলে যেসব ফিলিস্তিনি বসবাস করে আসছিল তাদের ওপর নেমে আসে সীমাহীন দুর্ভোগ। পদে পদে নিজ ভূমিতেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে তারা।

 

ইসরায়েল লুটেরা দেশ শুরু থেকেই

ইসরায়েলে অবৈধ দখলদার ইহুদিরা লুটতরাজ জাতি হিসেবেই ইমেজ তৈরি করেছে বিশ্বের দরবারে। এ কথা স্বয়ং স্বীকার করেছেন ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ অ্যাডাম রাজ। তিনি তার গবেষণালব্ধ এক বইয়ে বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। এ জন্য তিনি ইসরায়েলের ৩০টি আর্কাইভে গিয়ে দলিলপত্র ঘেঁটেছেন এবং সমসাময়িক পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য লিখিত কাগজপত্র দেখেছেন। সেগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে তিনি হিব্রুতে রচনা করেছেন বই ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আরবদের সহায়-সম্পত্তি লুটপাট’। ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎসে এ নিয়ে একটি দীর্ঘ নিবন্ধও প্রকাশ হয়েছে। ইহুদিদের উদ্দেশ ছিল ফিলিস্তিনি অধিবাসীদের তাড়িয়ে দেওয়া ও ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা। তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়েছে। এই লুটেরারা ফিলিস্তিনিদের নিজভূমে ফিরে আসতে না দেওয়ার জন্য বিভিন্ন নীতি ও বিধি তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। সংঘাতের মধ্যে ফিলিস্তিনি আরবদের পরিত্যক্ত ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পত্তি নির্বিচারে লুটপাটের শিকার হয়। ইসরায়েলি সেনা ও সাধারণ ইহুদিরা যে যেভাবে পেরেছে, লুটপাট করেছে। এই লুটপাট শুরু করেছে ১৯৪৮ সালের মে মাস থেকে আর চলছে কয়েক মাস ধরে। এই সময় লুট করা হয়েছে ফিলিস্তিনিদের সব কিছুই। ফিলিস্তিনিদের হাজার হাজার ঘরবাড়ি, দোকানপাট, গুদাম ও কারখানা। সেখান থেকে যন্ত্রপাতি, কৃষিপণ্য, খাদ্যশস্য, গবাদিপশু, কাপড়চোপড়, অলঙ্কার, আসবাবপত্র, পিয়ানো, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, গাড়ি- যা পাওয়া গেছে, সবই লুটে নিয়েছে ইহুদিরা।

সমরশক্তিতে পিছিয়ে থেকেও এগিয়ে হামাস

২০০৬ সালের পর থেকে ফিলিস্তিনি অংশ দুটি প্রধান দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে- ফাতাহ এবং হামাস। এর ফলে দেশের কেন্দ্রীয় অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক শাসিত মূল ভূমি ব্যবহারিক অর্থে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। তথা পশ্চিম তীরে ফাতাহ এবং গাজা উপত্যকায় হামাস প্রভাব বিস্তার করেছে। ২০০৬-এর নির্বাচনে হামাস সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হলেও তাদের কোনো আন্তর্জাতিক সমঝোতা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেওয়া হয় না। অসম সামরিক শক্তি নিয়ে চলছে এ লড়াই। সামরিক দিক থেকে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বিশে^র অন্যতম শক্তিশালী।

দুর্বল হলেও ইসরায়েলে আক্রমণ করার জন্য হামাস ও অন্যান্য সমমনা  গোষ্ঠীর কাছে যথেষ্ট অস্ত্র রয়েছে। এ ছাড়া তারা হামলা করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে। এ সহিংসতার মধ্যে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি সশস্ত্র ড্রোনকে গুলি করে নামিয়েছে। ড্রোনটি গাজা থেকে ইসরায়েলে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। সুতরাং হামাসের হাতে সশস্ত্র ড্রোন থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, হামাস সামরিক দিক দিয়ে ইসরায়েলের মতো শক্তিশালী না হলেও মনোবলের দিক থেকে হামাস বাহিনী এগিয়ে। নিজের দেশের জন্য পূর্বপুরুষের ভূমির জন্য  তাদের অবস্থান নৈতিকভাবেই শক্ত।

দূতাবাস নিয়ে বিতর্কিত যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

যুক্তরাষ্ট্র যে তাদের দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নিয়ে এসেছে সেটিও খুবই বিতর্কিত একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে এসে এই পদক্ষেপ নেওয়ায় ক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনের জনগণ। ফিলিস্তিনিরা মনে করে পূর্ব জেরুজালেম হবে তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী। অন্যদিকে ইসরায়েল পুরো জেরুজালেম নগরীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নিয়ে কার্যত ইসরায়েলিদের অবস্থানকেই সমর্থন জানাচ্ছে বলে মনে করে ফিলিস্তিনিরা। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিতর্কিত। এবারও ইসরায়েলের নিরাপত্তায় বাইডেন তার সমর্থনে অটল রয়েছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের জনগণের সুরক্ষায় তার আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ইসরায়েল, মিসর, সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনে তারা উদ্যোগ নিচ্ছে।

 

একজন ইয়াসির আরাফাত

২৪ আগস্ট ১৯২৯-এ জন্ম নেওয়া ইয়াসির আরাফাত ছিলেন ফিলিস্তিনি জনগণের পরম প্রিয় নেতা। গোটা বিশ্বের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি। ত্যাগ এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মানবীয় গুণে সম্পূর্ণ একজন মানুষ তিনি। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলওর চেয়ারম্যান হিসেবে আরাফাত ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সারা জীবন সংগ্রাম করেন। তিনি প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। প্রাথমিকভাবে ইসরায়েলের অস্তিত্বের সম্পূর্ণ বিরোধী থাকলেও পরে আরাফাত ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে আরাফাতের ফাতাহ দল জর্ডানের সঙ্গে মতপার্থক্যজনিত কারণে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে তিনি বিতর্কিত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি জর্ডানে আশ্রয় নিলে সেখানে তিনি ও তার ফাতাহ দল ইসরায়েলের ১৯৭৮ ও ১৯৮২ সালের আগ্রাসন ও আক্রমণের শিকার হন। দল-মত-নির্বিশেষে ফিলিস্তিনের অধিকাংশ মানুষ তাঁকে বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে সম্মান করে থাকে। তবে ইসরায়েলিরা তাঁকে সন্ত্রাসবাদী মনে করে। জীবনের শেষদিকে আরাফাত ইসরায়েলি সরকারের সঙ্গে কয়েক দফায় শান্তি আলোচনা শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে আরাফাত ইজহাক রাবিন ও শিমন পেরেজের সঙ্গে অসলো শান্তি চুক্তির জন্য একত্রে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। কিন্তু একই সময় হামাস ও অন্যান্য জঙ্গিবাদী সংগঠন ফিলিস্তিনের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে নেয়। ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের শেষ ভাগ পর্যন্ত আরাফাত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে তাঁর রামাল্লার দফতরে কার্যত গৃহবন্দী হয়ে থাকেন। ২০০৪-এর শেষদিকে আরাফাত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কোমায় চলে যান। আরাফাতের অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণ সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ পায়নি। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, তিনি ইডিওপ্যাথিক থ্রম্বোসাইটোপেনিক পারপুরা এবং সিরোসিসে ভুগছিলেন। তিনি ২০০৪ সালের ১১ নভেম্বর প্যারিসে চিকিৎসারত অবস্থায় ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।  তাঁর মৃত্যু নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক।

 

একশ বছর ধরে চলছে নির্যাতন হামলা বৈষম্য

ফিলিস্তিনিরা চরমভাবে হতভাগ্য জীবনযাপন করছে। এক শতক ধরে নিজেদের ভূখণ্ডে দখলদার ইহুদিদের হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ইসরায়েলের চলমান হামলার প্রেক্ষাপটে এক লাখের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকরে চলছে নানা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১২ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায় ফিলিস্তিন। এর আগে তারা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ‘পর্যবেক্ষক ভূখণ্ড’ হিসেবে যোগ দিত। কিন্তু এখন ‘সদস্য নয় এমন পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এই রায়কে সার্বভৌম ফিলিস্তিনের ‘জন্মসনদ’ বলে অভিহিত করেছেন।

ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে ফিলিস্তিনিদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলছে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জাতীয়ভাবে ইসরায়েলে ফিলিস্তিন ও ইহুদি নাগরিকরা একই সঙ্গে পাশাপাশি কাজ করছেন এমন নজির খুঁজে পাওয়া কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েলি সমাজে সেনাবাহিনীর একটা কেন্দ্রীয় ভূমিকা রয়েছে। ইহুদি নাগরিকদের জন্য সেনাবাহিনীতে কোনো একটা সময় কাজ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেখানকার ফিলিস্তিনিদের জন্য তা বাধ্যতামূলক নয়। তারা বলছেন, তারা তাদের নিজের দেশের মধ্যে নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হন, যা দেশটির পরিচালনা ব্যবস্থার ভিতরেই নিহিত। বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সহমতও। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশানাল বলছে ইসরায়েলে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েল প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে বৈষম্য আরোপ করে রেখেছে।  ইসরায়েল সরকার বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের জায়গাজমি জব্দ করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তাদের অভিযোগ, জাতীয় বাজেটে ইহুদি কর্তৃপক্ষ তাদের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে বৈষম্য করে আসছে। এমনকি ইসরায়েলে নাগরিকত্বের যোগ্যতা পাওয়ার জন্য আইনের যে বিধান রয়েছে তা ইহুদিবান্ধব। ইহুদিদের এমনিতেই ইসরায়েলি পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রয়েছে, তারা কোন দেশ থেকে এসেছেন বা কোথায় থাকেন, তা বিবেচ্য হিসাবে ধরা হয় না। কিন্তু যেসব ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের ও তাদের সন্তানদের সেই অধিকার নেই। ইসরায়েলের সংসদ ২০১৮ সালে একটি বিতর্কিত ‘নেশন-স্টেট আইন’ পাস করে। ওই আইনের বলে দেশটির অন্যতম একটি সরকারি ভাষা হিসেবে আরবি ভাষার মর্যাদা বিলুপ্ত করা হয়। এবং ঘোষণা করা হয় জাতীয় পর্যায়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে ‘শুধু ইহুদি জনগোষ্ঠীর’। যে সময় ‘ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদের’ এই আইন পাস করা হয়, সে সময় সংসদে আরব ইসরায়েলি সদস্য আইমান ওডেন বলেছিলেন ইসরায়েলি আরবরা চিরকালই সে দেশে ‘দ্বিতীয়  শ্রেণির নাগরিক’।

 

হঠা চরম সংকট

এবারের সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে জেরুজালেম। রমজানের সময় পুলিশের বাড়াবাড়ি এবং আদালতের মাধ্যমে কয়েকটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে উৎখাতের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েই শুরু হয় নতুন দফার এই বিরোধ। শেখ জারাহ এবং জেরুজালেমের পুরনো এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ফিলিস্তিনি কিশোর-তরুণদের সঙ্গে লেহাবা এবং আরও কিছু কট্টর ইহুদি সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে হাতাহাতি, গালিগালাজ বিনিময় চলছিল। এরই মধ্যে রমজানের শুরুতে পুলিশ জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের ওপর কিছু বিধিনিষেধ বসালে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল-আকসা মসজিদ চত্বরে ইসরায়েলি পুলিশি অভিযান, ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে গাজা থেকে রকেট ছোড়া এবং গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলার পর সংঘাত বিপজ্জনক  চেহারা নিয়েছে।

 

ফিলিস্তিনিদের যৌক্তিক যত দাবি

ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিরা মোটেই একমত হতে পারছে না। এর মধ্যে আছে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ব্যাপারে কী হবে। পশ্চিম তীরে যেসব ইহুদি বসতি স্থাপন করা হয়েছে সেগুলো থাকবে নাকি সরিয়ে নেওয়া হবে। জেরুজালেম নগরী কি উভয়ের মধ্যে ভাগাভাগি হবে? আর সবচেয়ে জটিল ইস্যু হচ্ছে- ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন। গত ২৫ বছর ধরেই শান্তি আলোচনা চলছে থেমে থেমে। কিন্তু সংঘাতের কোনো সমাধান এখনো মেলেনি। তাদের চলমান মতবিরোধগুলো তুলে ধরা হলো-

 

জেরুজালেম

ইসরায়েল দাবি করে জেরুজালেমের ওপর তাদের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। তারা জেরুজালেমকে তাদের রাজধানী বলে গণ্য করে। কিন্তু এর কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুজালেমকে তাদের রাজধানী হিসেবে চায়। তাদের পক্ষের যুক্তিই সবচেয়ে জোরালো।

 

সীমান্ত এবং এলাকা নিয়ে বিরোধ

ফিলিস্তিনিরা চায় ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের আগে যে সীমান্ত ছিল, সেই সীমানার ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হবে। ইসরায়েল এটা মানতে নারাজ। অথচ ইহুদিরা অসহায় অবস্থায় এখানে এসে বসবাস করার সুযোগ পেয়েছিল। আর ফিলিস্তিনিরা এখানে শত শত বছর ধরেই বসবাস করে আসছিল।

 

ইহুদি বসতি

১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল যেসব ফিলিস্তিনি এলাকা দখল করে নিয়েছিল, সেখানে তারা অনেক ইহুদি বসতি গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ। কেবল পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমেই এখন বসতি গেড়েছে ৫ লাখের বেশি ইহুদি।

 

ফিলিস্তিনি শরণার্থী

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখান থেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল লাখ লাখ ফিলিস্তিনি। তাদের নিজেদের জমি ফিরে পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। তাই যৌক্তিকভাবেই ইসরায়েলের ভিতর তাদের বাড়িঘরে ফিরে যাওয়ার অধিকার দাবি করে আসছে। আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী এই ফিলিস্তিনি এবং তাদের বংশধরদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ। কিন্তু ইসরায়েল এই অধিকারের স্বীকৃতি দিতে চায় না। কারণ তারা মনে করছে এত বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি যদি ইসরায়েলে ফিরে আসে তাহলে তাদের রাষ্ট্রের ইহুদি চরিত্র আর ধরে রাখা যাবে না।

 

চলমান হামলা হত্যার উদ্দেশ্য নিশ্চিহ্ন করা

অধিকৃত বায়তুল মুকাদ্দাস বা জেরুজালেমের রোমান অর্থোডক্স চার্চের আর্চবিশপ আতাউল্লাহ হানা বলেছেন, বায়তুল মুকাদ্দাস মুক্তির সময় ঘনিয়ে আসছে। মুসলমান ও খ্রিস্টানসহ বিশ্বের সব মুক্তকামী মানুষের প্রতি আমার আহ্বান আপনারা বায়তুল মুকাদ্দাসকে একা হতে দেবেন না এবং বায়তুল মুকাদ্দাস ও এর ইতিহাস-ঐতিহ্য-পরিচিতিকে যেসব জল্লাদ টার্গেট করেছে তাদের ওপর আঘাত হানুন। ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানরা এই ভূখণ্ডের একটি অন্যতম প্রধান জাতি এবং ফিলিস্তিনের ভূমির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের কারণে খ্রিস্টানরা গর্বিত। রোমান অর্থোডক্স চার্চের আর্চবিশপ বলেন, ফিলিস্তিনের লক্ষ্য-আদর্শ ও স্বপ্ন মুসলমান ও খ্রিস্টানদের ঐক্যবদ্ধ করেছে। তারা উভয়ই বায়তুল মুকাদ্দাসের সন্তান। অপরদিকে হামাসের সামরিক শক্তি নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে জানিয়ে দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এর আগে ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলের সর্বশেষ স্থল হামলা সাত সপ্তাহ স্থায়ী হয়েছিল। হামাসের শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে হামলা চালানো হলেও সে লক্ষ্য যে অর্জিত হয়নি, এবারের হামলা  থেকে তা স্পষ্ট। ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর দেওয়া হিসাবেই শনিবার পর্যন্ত গাজার ৬৫০টি টার্গেটে বিমান হামলা হয়েছে। অর্থাৎ সোমবার থেকে গড়ে প্রতিদিন একশ থেকে দেড়শ বার ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান গাজায় উড়ে গিয়ে বোমা ফেলছে। সেই সঙ্গে চলছে সীমান্ত থেকে দূরপাল্লার কামানের গোলা। গাজায় স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২০০’র কাছাকাছি, যার মধ্যে ৫২টি শিশু। ফলে গাজার মতো অত্যন্ত ঘনবসতি একটি এলাকায় নির্বিচারে বোমা হামলা নিয়ে জাতিসংঘসহ বহু দেশ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বিশ্বাস করেন, হামাসকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া ইসরায়েলের রাজনৈতিক স্বার্থেরও পরিপন্থী, কারণ হামাসের কারণেই ফিলিস্তিনিরা রাজনৈতিকভাবে এবং ভৌগোলিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত রয়েছে যা রাজনৈতিকভাবে ইসরায়েলকে সুবিধা দিচ্ছে।