রবিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

দৃষ্টিনন্দন এয়ারপোর্ট রানওয়ে

সাইফ ইমন

দৃষ্টিনন্দন এয়ারপোর্ট রানওয়ে

আকাশপথে নিরাপদ ও দ্রুত ভ্রমণ, মালামাল পরিবহনে বিমানের ব্যবহার বাড়ছে। কোটি কোটি যাত্রীর কথা বিবেচনা করে দেশে দেশে উন্নত করা হচ্ছে বিমানবন্দরগুলো। কার্গো সার্ভিসের পাশাপাশি বরাবর গুরুত্ব পাচ্ছে যাত্রী সুবিধা ও নিরাপত্তা। সেই সঙ্গে প্রয়োজনের পাশাপাশি মানুষের মনের খোরাকও গুরুত্বপূর্ণ। আর এদিক দিয়ে প্রতিটি বিমানবন্দরকেই সবাই চান সুন্দর ও ব্যতিক্রম করে উপস্থাপন করতে।  দৃষ্টিনন্দন কিছু এয়ারপোর্ট রানওয়ে নিয়ে আজকের রকমারি...

 

মাহো সমুদ্রসৈকতে রাজকুমারী জুলিয়ানার রানওয়ে

রাজকুমারী জুলিয়ানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি বিশ্বের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন রানওয়ের জন্য বিখ্যাত। ৮৭ বর্গকিলোমিটারের নেদারল্যান্ডসের সেন্ট মার্টিন দ্বীপটিতে অবস্থিত এই জুলিয়ানা এয়ারপোর্ট। এই রানওয়েটি দেখার জন্য দর্শনার্থীর ভিড় এখানে সব সময়। প্রিন্সেস জুলিয়ানা বিমানবন্দরটি দ্বীপের ডাচ প্রান্তে অবস্থিত। ২০১৫ সালে এই বিমানবন্দরটি থেকে ১৮ লাখের বেশি যাত্রী এবং ৬০ হাজার বিমান চলাচল করেছিল। বিমানবন্দরটি নেদারল্যান্ডসের রানী জুলিয়ানের নামে নামকরণ করা হয়েছিল। বিমানবন্দরের রানওয়ের একদিকে উঁচু পাহাড় এবং অন্য প্রান্তে বিখ্যাত মাহো সমুদ্রসৈকত। এই সৈকতের কারণে বিমানবন্দরের রানওয়েটিকে অসম্ভব সুন্দর লাগে। তবে বিমানবন্দরটিতে বিমান নামার সময় এবং ওঠার আগে মাহো সমুদ্রসৈকতের দিকে বিমানের ইঞ্জিন থেকে নির্গত দমকা হাওয়ার জন্য সৈকতে মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা খুব কঠিন এবং ভ্রমণকারীরা এ বিষয়টি উপভোগ করেন। যেন মনে হয় বাতাসের তোড়ে সব উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সব সুন্দরেরই কিছু অসুন্দর দিক রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই জেট ব্লাস্টের দমকা হাওয়ায় পড়ে গিয়ে কংক্রিটের বাঁধে ধাক্কা লাগার ফলে ১২ জুলাই ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের একজন মহিলা পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।  এরপর থেকে কর্তৃপক্ষ খুবই সাবধানতা অবলম্বন করছে নিয়মিতই।

 

বালুকাময় রানওয়ের জন্য বিখ্যাত 

ব্যারা বিমানবন্দর, স্কটল্যান্ড

দৃষ্টিনন্দন রানওয়ের জন্য বিখ্যাত এই ব্যারা বিমানবন্দর। ব্যারা বিমানবন্দর হলো স্কটল্যান্ডের একটি ছোট রানওয়ে বিশিষ্ট বিমানবন্দর। বিমানবন্দরটি স্কটল্যন্ডের ব্যারা দ্বীপে অবস্থিত। এই বিমানবন্দরে তিনটি বালুকাময় রানওয়ে রয়েছে। এটি বিশ্বের একমাত্র চালু বিমানবন্দর যেটি রানওয়ে হিসেবে সমুদ্রসৈকতকে ব্যবহার করে। এই বিমানবন্দর থেকে স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন দ্বীপে বিমান চলাচল করে। বিমানবন্দরটি থেকে একটি সরাসরি বিমান সংযোগ রয়েছে গ্লাসগো বিমানবন্দরের সঙ্গে। ব্যারা বিমানবন্দরটি প্রতি বছর ১০ লাখের ওপরে যাত্রী পরিবহন করেছে এবং এই একই সময় বিমানবন্দরটিতে ১ হাজারটি বিমান চলাচল করেছে। বিমানবন্দরটি পরিচালনা করে  হাইল্যান্ডস অ্যান্ড আইসল্যান্ডস এয়ারপোর্ট লিমিটেড।

 

রানওয়ের চার পাশে পানি বেষ্টিত সৌন্দর্য

হামাদ বিমানবন্দর, কাতার

হামাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। এর রানওয়েটি অসম্ভব দৃষ্টিনন্দন। ওপর থেকে বিমানে করে রানওয়েতে নামার সময় এ সৌন্দর্য আরও ফুটে ওঠে। কাতারের দোহা শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে হামাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের অবস্থান। বিমানবন্দরটি তৈরির পরিকল্পনা করা হয় ২০০৩ সালে। ২০০৬ সাল থেকে এই বিমানবন্দরের কাজ শুরু হয়। ২০১৪ সাল থেকে এর যাত্রা শুরু হয়। বছরে প্রায় ৩০ মিলিয়ন যাত্রী এই বিমানবন্দরটি ব্যবহার করে থাকে। এটি স্থাপত্যের দিক থেকে অন্যতম সেরা। এটিকে বিশ্বের অন্যতম বিলাসবহুল বিমানবন্দর হিসেবেও ভাবা হয়। ২০১৮ সালে এটি মধ্যপ্রাচ্যের সেরা বিমানবন্দর হিসেবে নির্বাচিত হয়। এতে দুটি টার্মিনাল এবং দুটি রানওয়ে রয়েছে। রানওয়ের চার পাশে পানিবেষ্টিত হওয়ায়  এর সৌন্দর্য বেড়ে যায় বহুগুণ।

 

রানওয়ের পাশে রয়েছে গলফ কোর্সও

ইনচেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এমনিতেই বিখ্যাত। এই বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে রয়েছে গলফকোর্সও। রয়েছে আউস স্কেটিংয়েরও সুব্যবস্থা। দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর এই ইনচেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রতি বছর ৪১.৭ মিলিয়ন যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করে থাকেন। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী ঘেঁষেই একটি দ্বীপে বিমানবন্দরটি নির্মিত হয়। ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করা এই বিমানবন্দরটি বিশ্বের ২৪তম ব্যস্ত বিমানবন্দর। যাত্রীসেবা প্রদানে ইনচেন বিমানবন্দরে সর্বাধুনিক বিনোদন ব্যবস্থা করেছে। এখানে রয়েছে যাত্রীদের জন্য আলাদা ঘুমানোর কক্ষ। রানওয়ের পাশে ছোটখাটো গলফ কোর্স থাকায় সময় কাটাতে চলে যেতে পারেন সেখানে।  স্পা সেন্টারে শরীর ম্যাসাজ করাতে পারেন, ঘুমিয়ে নিতে পারেন সেখানেই।

 

কৃত্রিম দ্বীপের দৃষ্টিনন্দন রানওয়ে

সেন্ট্রাল জাপান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর জাপানের কৃত্রিম দ্বীপ ‘সি বে’ তে অবস্থিত। এখানেই গড়ে তোলা হয়েছে জাপানের দৃষ্টিনন্দন রানওয়েটি। চারদিকে পানিবেষ্টিত হওয়ায় দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন অসীম জলরাশির মধ্য থেকে বিমান ওপরে উঠে যাচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্বের সেরা বিমানবন্দরের তালিকায় এর নাম রয়েছে। স্থানীয়রা চুবু এয়ারপোর্ট নামেই চেনেন এটিকে। বছরে প্রায় ৯.৮ মিলিয়ন যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। জাপান এয়ারলাইনস ও এএনএ-এর ঘর এটি। এই বিমানবন্দরে রয়েছে ১ হাজার ফুট দীর্ঘ স্কাইডেক। এখানে দাঁড়িয়ে যাত্রীরা নাগোয়া পোর্টের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। জাপানের ঐতিহ্যবাহী বাথহাউসও রয়েছে এখানে।  উঁচু ছাদে দাঁড়িয়ে সমুদ্রে সূর্যাস্তের রূপ দেখতে অনেকেই ছুটে আসেন।

 

দর্শনার্থীর ভিড় থাকে জুরিখের রানওয়েতে

জুরিখ বিমানবন্দর

জুরিখ বিমানবন্দর বিশ্বের সেরা বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে একটি। ভিআইপিদের বিশেষ সেবা প্রদানে এগিয়ে থাকা বিমানবন্দরের কথা উঠলে জুরিখ বিমানবন্দরকে এগিয়ে রাখতে হবে। তবে আরও একটি কারণ হলো এর দৃষ্টিনন্দন বিমানবন্দর। সাধারণ যাত্রীরাও প্রথম ভ্রমণে ধাক্কা খেতে পারেন। কারণ ওপর থেকে দেখলে মনে হয় মনোপলি খেলার বোর্ড। আশপাশে বনায়ন করা হয়েছে। এতে এর সৌন্দর্য বেড়ে গেছে আরও কয়েক গুণ। সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর এটি। প্রতি বছর ২৪.৯ মিলিয়ন যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। সুইস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের ঘর বলে খ্যাত এই বিমানবন্দরের ভিতরেই পাঁচ তারকা হোটেলের মতো প্রায় সব সুবিধাই ভোগ করতে পারেন যাত্রীরা। সাইকেল চালিয়ে ঘুরে আসতে পারেন গোটা বিমানবন্দর। চাইলে স্কেটিংও করতে পারেন।

 

রাতে সৌন্দর্য বেড়ে যায় অনেক গুণ

বেইজিং দাক্সিং বিমানবন্দর

বেইজিং দাক্সিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যা বেইজিং নতুন বিমানবন্দর নামেও পরিচিত। রাতে এই বিমানবন্দরের রানওয়ের লাইটিং ব্যবস্থা এতটাই মনোমুগ্ধকর যে, দূর থেকে দেখলে মনে হয় অপার্থিব কোনো জায়গা। ২০২১ সালের মধ্যেই এই মেগা প্রজেক্টের আওতায় প্রায় ৪৫ মিলিয়ন যাত্রী আনা-নেওয়ার কাজ করবে এই বিমানবন্দর এবং ভবিষ্যতে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ মিলিয়নেও পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় টার্মিনালসমৃদ্ধ এই বিমানবন্দর বছরে প্রায় ৪ মিলিয়ন কার্গো পণ্য পরিবহনে সক্ষম হবে। ২০১৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ৭০ বছর পূর্তি।  সেই উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি শি জিন পিং বেইজিংয়ে এই বিমানবন্দরটির উদ্বোধন করেন। এই বিমানবন্দরটি উপভোগ করতে অনেকেই আসেন এর রানওয়েতে।

 

স্থাপত্যশৈলীতে  অনন্য জার্মানির মিউনিখ

মিউনিখ বিমানবন্দর

স্থাপত্যশৈলীতে অনন্য জার্মানির মিউনিখ বিমানবন্দর। এই বিমানবন্দরের রানওয়েটিও অসম্ভব সুন্দর আর দৃষ্টিনন্দন। জার্মানির প্রধান বিমানবন্দরের এটি দ্বিতীয়। বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দরের তালিকাতেও থাকবে এই বিমানবন্দরের নাম। যাত্রীসেবা প্রদানে সেরার তালিকায়ও এটি ওপরের দিকেই রয়েছে। আবার বিশ্বের বিলাসবহুল বিমানবন্দরের তালিকায় এর নাম খুঁজে নিতে কষ্ট হয় না। ইউরোপের সপ্তম ব্যস্ত বিমানবন্দরটি প্রতি বছর ব্যবহার করেন ৩৮.৭ মিলিয়ন মানুষ। বিমান রানওয়েতে নামার সময় যাত্রীরা বিমানবন্দরটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।  মিউনিখ বিমানবন্দরের চমৎকার একটি দিক হলো- এই বিমানবন্দরের সঙ্গে গোটা শহরের যোগাযোগ রয়েছে।

 

রয়েছে দৃষ্টিনন্দন রানওয়ে

ও’হেয়ার ইন্টারন্যাশনাল

শিকাগো ও’হেয়ার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টও বিখ্যাত তার রানওয়ের জন্য। বিশাল এলাকাজুড়ে এই বিমানবন্দরের রানওয়েগুলো অবস্থিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের প্রকৃত নাম ও’হেয়ার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিমান বাহিনীর এয়ারফিল্ড হিসেবে প্রথমে এর যাত্রা শুরু হয়। সে সময় মার্কিন নৌবাহিনীর প্রথম মেডেল অব অনার পাওয়া সৈনিক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এডওয়ার্ড হেনরি ও’হেয়ারের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। আটটি রানওয়ে বিশিষ্ট এয়ারপোর্টটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান বিমানবন্দর। প্রতি বছর প্রায় ৮ কোটি থেকে ৯ কোটি যাত্রী বিমানবন্দরটি ব্যবহার করেছেন।

 

সাগরের বুকে রানওয়ে

হানেদা বিমানবন্দর

অনন্য দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা টোকিও হানেদা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বিশ্বের চতুর্থ ব্যস্ত বিমানবন্দরও এটি। এর রানওয়েটি সম্পূর্ণ সাগরের ওপরে। চারপাশে পানিবেষ্টিত হওয়ায় দেখতে অত্যন্ত নয়নাভিরাম। ব্যবসায়ীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানবন্দরটি প্রতি বছর ৬৮.৯ মিলিয়ন যাত্রী ব্যবহার করে। জাপানের ব্যবসা ও পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে হানেদা বিমানবন্দরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই বিমানবন্দর দ্রুততম সময়ে যাত্রীদের নিরাপত্তা বেষ্টনী, ইমিগ্রেশন ও লাগেজ চেকিং শেষ করায় যাত্রীবান্ধব বলে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। যাত্রীসেবা প্রদানে বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মীদের আচরণ যে কাউকে মুগ্ধ করবে। তারা সাহায্যপরায়ণ ও নিবেদিত।  পরিচ্ছন্ন ও ছিমছাম বিমানবন্দর হিসেবেও এর সুনাম রয়েছে।