Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : ৬ জুন, ২০১৬ ১১:৩৭
আসন্ন বর্ষায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা
মানিক মুনতাসির
আসন্ন বর্ষায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা
বিভিন্ন খাল ভরাট করে ভবন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও নর্দমা বানানো হয়েছে। ছবি : জয়ীতা রায়

রাজধানী ঢাকার ৪৭টি খালের মধ্যে গত চার দশকে ২১টির অস্তিত্বই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বাকি ২৬টিও দখল-দূষণে বিপন্ন হতে চলেছে।

কোনো কোনো স্থানে চেনার উপায়ই নেই যে একসময় সেখানে খাল ছিল। খাল ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন, মার্কেট, বস্তি, টিনের ঘর, দোকান-পাটসহ নানা অবকাঠামো। চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে নগরীর পয়ঃনিষ্কাশন, বর্ষার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। এর ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমেও রাজধানীতে প্রচণ্ড জলাবদ্ধতা হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুই সিটির মেয়র অবশ্য রাজধানীর খালসহ বিভিন্ন বেদখল হওয়া জায়গা দখলে নিতে জোর কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। কিন্তু প্রভাবশালীদের দাপটে সে কার্যক্রম কতটা সফল হবে এ নিয়েও সংশয় রয়েছে।

পরিবেশবাদীরা জানিয়েছেন, ঢাকার খালগুলো দখল হওয়ায় বৃষ্টির পানি নদীতে পড়তে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। অন্যদিকে, নগরীতে পর্যাপ্ত খাল ও জলাশয় না থাকায় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ প্রক্রিয়াও।

ঢাকা ওয়াসার সূত্রে জানা গেছে, ৭০-এর দশকে রাজধানী ঢাকায় ৪৭টি খাল ছিল। কিন্তু বর্তমানে শহরটির পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খালের সংখ্যা কমে ২৬টিতে নেমে এসেছে। নগরীর চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদ-নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ছিল খালগুলো। খালগুলো ভরাট করে ভবন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও নর্দমা বানানো হয়েছে। একসময় বেশির ভাগ খালের প্রস্থ ছিল ১৫০ ফুটের বেশি। এগুলো বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনে ব্যবহার হতো। দখল-দূষণে এসব খালের প্রস্থ এখন ৮-২০ ফুটে এসে ঠেকেছে। নদ-নদীর সঙ্গে খালগুলোর সরাসরি সংযোগ নষ্ট হওয়ায় ঠিকমতো পানি অপসারিত হতে পারছে না। এ কারণে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।  

কসাইবাড়ী খাল: এই প্রাকৃতিক খালটি উত্তরা আবাসিক খাল থেকে উত্তরখানের ভিতর দিয়ে টঙ্গী খালে পড়েছে। খালটি সংস্কার ও পুনঃখনন করে প্রবাহপথ বাড়ানোর সুপারিশ করা হলেও তা খনন করা হয়নি। বর্তমানে খালটি ড্রেনে রূপান্তর হয়েছে। খালটির ওপর মার্কেট ও রাস্তা তৈরি করে ধ্বংস করা হয়েছে।

সাংবাদিক কলোনি খাল: ২০০৭ সালে ওয়াসার উচ্ছেদ কমিটির পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশে বলা হয়, খালটি কালশী রোড থেকে বাউনিয়া খাল পর্যন্ত বিস্তৃত। খালের এলাইনমেন্ট বরাবর কোনো স্থাপনা নেই। মধ্যবর্তী অংশে ডিসিসি পাকা ড্রেন করে দুই পাশে রাস্তা নির্মাণ করেছে, যা অপ্রতুল। সম্পূর্ণ খালটি অধিক প্রশস্ত ও গভীরতায় উন্নয়ন করা প্রয়োজন। হাউজিং এলাকার বাইরে খালটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ খাল দিয়ে পানিপ্রবাহ থাকলেও আগের মতো খাল প্রশস্ত নয়। দখলের কারণে খালটি সংকুচিত হয়ে গেছে।

হাজারীবাগ খাল: প্রায় ৩ কি.মি. দৈর্ঘ্য এবং ৬-১৮ মিটার প্রস্থ হাজারীবাগ খাল। ২০০৭ সালের উচ্ছেদে কাঁচাঘর, দোকান, ট্যানারি কর্তৃক দখল, সেমিপাকা দোকান, আবাসিক বাড়ি ইত্যাদিসহ মোট ১৪১টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও ফের দখল হয়ে গেছে। খালটি পুনঃখনন করে প্রবাহ নিশ্চিত করারও সুপারিশ করে ওয়াসা। তবে খনন করা হয়নি।

এ ছাড়া মহাখালী খাল, বাসাবো খাল, কল্যাণপুর খাল, গুলশান-বনানী খাল, কাঁটাসুর খাল, ইব্রাহিমপুর খাল, আবদুল্লাপুর খাল, দিয়াবাড়ী খাল, শাহজাহানপুর খালের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। গুলশান ও ধানমন্ডির খালগুলো নালায় পরিণত হয়েছে। মেরাদিয়া ও গজারিয়া খাল জীর্ণ নালা-নর্দমায় পরিণত হয়েছে। খিলগাঁও-বাসাবোর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ঝিলে চৈত্র-বৈশাখ মাসেও পাঁচ-ছয় হাত পানি থাকত। এখন খালের একাংশ দখল করে বানানো হয়েছে মার্কেট ও বহুতল ভবন। এ খালের ফলকটি জেগে আছে এখনো। কিন্তু খালের কোনো চিহ্নই নেই খিলগাঁও জোড়াপুকুর মাঠ সংলগ্ন।

জানা গেছে, সচিবালয় ও প্রেসক্লাব এলাকা, ফকিরাপুল, পুরানা পল্টন, শান্তিনগর, সিদ্ধেশ্বরী, কাকরাইল, বিজয়নগর, আরামবাগ, কমলাপুর প্রভৃতি এলাকার পানি সেগুনবাগিচা খাল দিয়ে নিষ্কাশিত হতো। সময়ের বিবর্তনে সেগুনবাগিচা খালের অস্তিত্ব শুধু বিলুপ্তিই হয়নি, সেখানে গড়ে উঠেছে বিশাল বিশাল দালান-কোঠা। কল্যাণপুর প্রধান খালের সঙ্গে আরও ৬টি খাল সংযুক্ত ছিল। এ ছাড়া রামচন্দ্রপুর, বাইসটেকি, ইব্রাহিমপুর, পরীবাগ, রাজাবাজার, রায়েরবাজার, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, গোপীবাগ, সেগুনবাগিচা, ধোলাইখাল, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও-বাসাবো, ধলপুর, মাণ্ডা, দক্ষিণগাঁও-নন্দিপাড়া, সুতিখাল, বাড্ডা-শাহজাহানপুর ইত্যাদি অধিকাংশ খাল বিলীন হয়ে গেছে দখলদারদের কারণে।

এদিকে, শাহবাগ থেকে মগবাজার পর্যন্ত ঢাকা ওয়াসার মানচিত্রে একটি খালের নাম পরীবাগ খাল। তবে সেখানে এখন খালের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না। সেখানে এখন সোনারগাঁও সড়ক। সে খালও ভরাট করে রাস্তা বানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, রাজধানীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখতে খালগুলো উন্মুক্ত রাখা খুব জরুরি। কিন্তু আমরা তা রক্ষা করতে পারিনি, এটা দুর্ভাগ্যজনক।



বিডি-প্রতিদিন/ ০৬ জুন, ২০১৬/ আফরোজ

আপনার মন্তব্য

সর্বশেষ খবর
up-arrow