Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : রবিবার, ৩ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২ জুলাই, ২০১৬ ২৩:৫১
গণতন্ত্র একটি সরকার-ব্যবস্থা গণতন্ত্র একটি মূল্যবোধ
রোবায়েত ফেরদৌস
গণতন্ত্র একটি সরকার-ব্যবস্থা গণতন্ত্র একটি মূল্যবোধ

রিখটার স্কেল দিয়ে ভূতাত্ত্বিকরা পরিমাপ করেন ভূমিকম্পের মাত্রা কতটুকু; তাদের স্কেলের পরিসীমা ১ থেকে ১০; সংখ্যা যত বেশি ভূমিকম্পের মাত্রা তত জোরালো; কিন্তু সর্বজন গ্রহণযোগ্য এমন গজকাঠি কি আছে যা দিয়ে গণতন্ত্র মাপা যায়? দেশে এখন কতখানি গণতন্ত্র বিদ্যমান কোন বাটখারা দিয়ে এর ওজন করব? ভূকম্পন একটি ‘পরিমাণগত’ বিষয়, একে তাই মাপা যায়, পক্ষান্তরে গণতন্ত্র একটি ‘গুণগত’ বিষয়, একে কি সংখ্যা দিয়ে মাপা সম্ভব?  কিন্তু আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক গণিতজ্ঞ পিথাগোরাস বলেছিলেন, ‘everything can be interpreted in terms of numbers’ – অর্থাৎ ‘সবকিছুকেই সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা যায়’। গণতন্ত্র-গবেষকগণও তাই অনেকগুলো চলক বিবেচনায় নিয়ে একটি দেশে কী পরিমাণ গণতন্ত্র বিদ্যমান তা হিসাব কষার চেষ্টা করেন।

চলকগুলো হতে পারে এরকম— ক. সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন খ. মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমতের সম্মান ও পরমতসহিষ্ণুতা গ. আইনের শাসন ও বিচার পাওয়ার অধিকার ঘ. কার্যকর সংসদ ঙ. সরকারের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা চ. সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ ইত্যাদি।

প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান সময়ে যে সংসদীয় গণতন্ত্র বিদ্যমান আছে সেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের ভূমিকা কী চোখে পড়ার মতো? এসব প্রশ্নের উত্তরে, হ্যাঁ বলার সুযোগ কম। কারণ দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দলসহ বেশ কিছু দল এখন সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চার বাইরে। সরকারের ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছা যাই বলা হোক না কেন বিশাল একটি রাজনৈতিক শক্তি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক চর্চা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যেমনটা এর আগে ’৯৬ এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে হয়েছিল। সুখের বিষয় হলো সেই সময়ের সরকারটি দেশ শাসন করতে পারেনি। বর্তমান যে সরকার তারা ’৯৬ এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মতো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একটি নির্বাচন করে দেশ চালাচ্ছে। এ নির্বাচনের পর অনেকেই বলেছিল গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ বলছে এবং এর আগেও বলেছে দেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত। বর্তমান সরকারও বলেছিল যে, গণতন্ত্র রক্ষার জন্য পুনরায় নির্বাচন দেওয়া হবে। তিন বছর হতে চলল এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচন দেয়নি সরকার। পাঠক বলতে পারেন, দেশ তো ভালোই চলছে, নির্বাচনের কী দরকার? আসলেই কি নির্বাচনের দরকার নেই? তাহলে প্রশ্ন এই যে দেশে অস্থিরতা বিরাজ করছে, এ সংকট কাটবে কী করে? বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, দেশে জঙ্গিবাদের উত্থানে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কাজ করছে, তা অবিশ্বাস করার উপায় নেই। র‌্যাব, পুলিশ, বাঁশের লাঠি দিয়ে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করা যাবে না। এ জন্য অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সব পর্যায়ে জনগণের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। যদি ধরে নেওয়া যায় নির্বাচন না দিয়েও এই সংকট সমাধান করা সম্ভব, তবে বর্তমান সরকার কেন পারছে না এ সংকট কাটিয়ে উঠতে? আর যদি এই দায় বিএনপিসহ সংসদের বাইরে থাকা দলগুলোকে দিতে হয় তবে অবশ্যই তাদের কথা বলার ও কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। এ কথা বলার ও কাজ করার সুযোগ না দিয়ে তাদের ওপর দায় চাপানোর কোনো যৌক্তিকতা আছে কিনা সেটাও  ভেবে দেখা দরকার।

গণতন্ত্র কেবল একটি সরকার ব্যবস্থা নয়, গণতন্ত্র একটি মূল্যবোধের নাম, গণতন্ত্র একটি দৃষ্টিভঙ্গি, একটি জীবন-ব্যবস্থা— কমপ্লিট কোড অব লাইফ; যে মূল্যবোধের মূল কথা টলারেন্স, পরমতসহিষ্ণুতা, অন্যের মতকে সম্মান দেওয়া; দেশে সেটা কতটুকু আছে? প্রতিদিন আমরা দেখছি গালাগালি আর দোষারোপের রাজনীতি; কুরুচি, চরিত্র হননকর আর অশ্লীল বাক্যবাণ। অথচ দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছিলেন, ‘আমি তোমার সঙ্গে দ্বিমত করতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলতে দেওয়ার জন্য আমি আমার জীবন দিতে পারি’— এর চেয়ে ভালো করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা, আমার মনে হয়, আর কেউ বলতে পারেননি; তো সেই ভলতেরিয়ান ফিলসফি থেকে আমাদের চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি কত দূরে? দেশ স্বাধীনের পর কিছু দিন পরই আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। এরপর ১৯৯১ সালে নির্বাচনমুখী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন হয়। এই দীর্ঘদিন গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে একটি অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। সেটা হলো, সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চায় নিজের অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার অবিশ্বাস। এ কারণে বিএনপি ’৯৬ এর ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন করেছিল। এরপর আওয়ামী লীগ তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। এরপর আবার বিএনপি। কিন্তু আওয়ামী লীগ আসলে এই ভুলটা করতে চায়নি। তারাও চেয়েছিল ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে। পাঠক আপনাদের অনেকের মনে আছে হয়তো, নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর এই আওয়ামী লীগই বলেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেইমানি করেছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানে কি বেইমানি করা? এরপর আবার দেখুন, বিএনপি কিন্তু একই কাজ করল। ১/১১ মতো একটি সরকার আসার প্রেক্ষপট তৈরি হলো। তার মানে বর্তমান দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দল সবসময় একই পথে হেঁটেছে। কেউ কাউকে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব দিতে চায়নি। চেয়েছে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দেশে কিংবা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চর্চার ক্ষেত্রে এটা হওয়ার কথা না। কারণ গণতন্ত্র শুধু গণতন্ত্র নয়, এটার মূল রূপ হলো অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র। রাজনৈতিক দলগুলো যদি এই ভাবনা ভাবতে না পারে যে, সরকার চালানোর জন্যই বিরোধী দল প্রয়োজন, তাহলে সেখানে ‘গণতন্ত্রের অ্যান্টিবায়োটিক’ প্রয়োগ করেও কোনো লাভ হবে না।

আরেকটি বিষয় দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা। পাঠক আপনারাই বলুন, দুই বড় দল/জোটের ভিতরে কি গণতন্ত্রের চর্চা আছে? আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির সভাপতি কিংবা চেয়ারপারসন কি কোনো দিন পরিবর্তন হবে? তার মানে এই নয় যে, দুই দলে আর কোনো যোগ্য লোক নেই। মূল ব্যাপারটা হলো দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা। দলের মাঝে গণতন্ত্রের চর্চা না করে দুই দল দেশের মাঝে গণতন্ত্র চর্চা করতে চায় কীভাবে? একটি মৌলিক প্রশ্ন বটে।

আর নির্বাচনের পর দলগুলো হেন কোনো দুর্নীতি নেই যা করেনি। প্রত্যেকটি দল ক্ষমতায় এসে তাদের দলের নেতাদের সুবিধা দিয়েছে এবং সুবিধা নিয়েছে। এর ফলে তাদের আদর্শিক ভিত নড়বড়ে হয়ে গেছে, নীতিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। পরিণামে, দলগুলো জনগণের প্রত্যাশামাফিক কাজ যেমন, জনমানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ, নীতি প্রণয়ন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সংহতকরণ— সব বিষয়ে অনীহা দেখায়। তখন একটা ভীতি তৈরি হয়। আর যার ফলাফল এখন সাধারণ মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে। গণতন্ত্রের সবচেয়ে দরকারি বিষয় সরকারের জবাবদিহিতা। সরকার সংসদের কাছে তার প্রত্যেকটি কাজের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য। সেটি আজ বিলীন হয়ে গেছে;  হাঁস আর সজারু মিলে এখন যে হাঁস সজারুমার্কা ‘সরকারি-বিরোধী দল’ আছে সংসদে, তাদের যে কথা বলার সাহস নেই, প্রতিবাদের সাহস নেই, সেটা সবার জানা। এমন একটি তাঁবেদার বিরোধী দল দিয়ে গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা যে সম্ভব নয় তা বর্তমান বিরোধী দলের লোকজনও জানে। এখন চলছে ‘তাঁবেদারিত্বের গণতন্ত্র’।

গণতন্ত্রে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। গণতন্ত্র সাধারণ মানুষের কথা বলে। সেই অবস্থা কী বর্তমানে আছে? জনমানুষের সেই ‘ভয়েস’ কোথায়? সেই ভয়েস সংসদে অনুুপস্থিত, অনুপস্থিত বাইরেও। গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা করতে হলে এই ভয়েসকে ফিরিয়ে আনতে হবে। নিজের নৈতিক জায়গা যখন দুর্বল হয়ে যায় তখন বিরোধী শক্তিকে আর সহ্য করার ক্ষমতা থাকে না। বর্তমান অবস্থা তাই। এখানে যে লড়াইটা এখন আছে সেটা ক্ষমতা দখলের। অবশ্যই গণতন্ত্র চর্চার জন্য নয়। তবে নাই-মামার থেকে যেহেতু কানা-মামা ভালো সে জন্য সামরিক বা ভিন্নরকম শাসনের চাইতে দুর্বল গণতন্ত্র অন্যতম।

ছোট্ট একটা তথ্য দেই, গেল ৭ জুন ফ্রান্সের স্ত্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বলা হয়েছে, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সংলাপ প্রয়োজন। বাংলাদেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত লক্ষ্যগুলো সম্ভবত ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া এবং সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশের জনগণকে দারিদ্র্যমুক্ত করার কাজ চালিয়ে যাওয়াই হবে প্রথম অগ্রাধিকার। এ অতি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বাংলাদেশের সব নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ প্রয়োজন এবং সেই সঙ্গে প্রয়োজন দেশটির আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সমর্থন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উদ্বেগজনক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ হতে পারে (প্রথম আলো, ১৪ জুন, ২০১৬)।

আমরা কি এ উদ্বেগ থেকে শিক্ষা নিচ্ছি? বরং বছরের পর বছর ধরে দলগুলোর ভিতরে ক্ষয়িষ্ণু গণতান্ত্রিক ধারাই কেবল লক্ষ করছি। সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রেও তাই। এখানে একটি রাজনৈতিক শক্তি আরেকটি রাজনৈতিক শক্তিকে সহ্য করতে পারে না। এই যে ‘পলিটিক্স অব অ্যানিহিলেশন’ বা ধ্বংসের রাজনীতি— এ ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একটি রাজনৈতিক শক্তিকে বিনাশ করে আরেকটি শক্তি টিকে থাকতে পারে না। বর্তমান অবস্থায় সেই চেষ্টা চলছে। সেটা শুধু বিএনপির জন্য নয়, সব বিরোধী চিন্তা ও রাজনৈতিক শক্তি ধ্বংস হলে কী হবে, একবারও কী ভেবে দেখা হয়েছে? রাজনীতিতে যে ভ্যাকুয়াম তৈরি হচ্ছে তার পরিণতি কী হতে পারে, সেটা কি ভেবে দেখা হয়েছে? জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ তো আকাশ থেকে পড়ছে না।   দেশ পরিচালনা আর দেশকে সাংস্কৃতিকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এক কাজ নয়। দেশকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সমান্তরালে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে এগিয়ে নিতে হলে সবাই মিলে কাজ করতে হবে। সবার কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে।   ভিন্নমত ও ভিন্ন মতাদর্শের তাদের কথা মূল্যায়নের সুযোগ করে দিতে হবে। তবেই গণতন্ত্রের সঠিক রূপ আমাদের কাছে ধরা দেবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; robaet.ferdous@gmail.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow