Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : বুধবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৩১
কারবালা : জীবনের চেয়ে আদর্শ বড়
মাওলানা মুহাম্মদ সাহেব আলী

আশুরা বা ১০ মহররম একটি তাত্পর্যপূর্ণ দিন। দুনিয়া সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত রয়েছে এ দিনের সম্পর্ক। দুনিয়া যেদিন ধ্বংস হবে এবং মানুষ যেদিন বিচারের সম্মুখীন হবে সেই রোজ কিয়ামতের তারিখও এটি। এ দিনে দুনিয়ার প্রথম মানব-মানবী হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.) জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নির্বাসিত হন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এই মহান দিনে পাপিষ্ঠ রাজা নমরুদের আগুন থেকে রেহাই পান আল্লাহর অসীম রহমতে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতদের জন্য এটি এক শোকাবহ দিন। এ দিনটি অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রত্যয়দীপ্ত দিন। হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম ইরাকের কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শহীদ হন রসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.) ও তার অনুসারীরা। চতুর্থ খলিফা হজরত আলীর (রা.) আমলে খেলাফত নিয়ে হজরত মুয়াবিয়ার (রা.) সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। খেলাফতের ঐক্য রক্ষায় হজরত আলী (রা.) উমাইয়াদের সঙ্গে সমঝোতায় উপনীত হন। এই সমঝোতা অনুসারে হজরত আলীর (রা.) পর খেলাফতের অধিকারী হবেন মুয়াবিয়া— এই শর্ত নির্ধারিত হয়। তারপর আবার খেলাফত ফিরে যাবে হজরত আলী (রা.) ও হজরত ফাতেমা (রা.)-এর সন্তানদের হাতে। এই সমঝোতা ভঙ্গ করে উমাইয়ারা। মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তার মদ্যপ পুত্র ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। উমাইয়ারা ইয়াজিদের পক্ষে আনুগত্য লাভে উঠেপড়ে লাগে। তৎকালীন রীতি অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপ্রধান পরিবর্তন বিশিষ্ট নাগরিক তথা রাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকার অধিবাসীরা রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্য গ্রহণ করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রের বিশিষ্টজনরা মুয়াবিয়া (রা.) পুত্র ইয়াজিদের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করে। ইমাম হোসাইন (রা.) ইয়াজিদের বাইয়াত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। ইয়াজিদের বিরুদ্ধে মদ্যপান এবং নারী লোলুপতার অভিযোগ ছিল। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ছিল। তিনি খেলাফতের অবসান ঘটিয়ে রাজতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ইসলামী চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে উদ্যোগী হন। তিনি ইয়াজিদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কুফা সফরের সিদ্ধান্ত নেন। মক্কা থেকে কুফা যাওয়ার পথে অনুসারীদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে সুস্পষ্টভাবেই বলেন, ‘আমার সফরের উদ্দেশ্য হলো কপট উমাইয়া শাসকদের স্বরূপ উন্মোচন করা, অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা। এ ছাড়া আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।’

উল্লেখ্য, ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে ঘোষণার বিরোধিতা করে কুফার দেড় শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি ইমাম হোসাইনকে (রা.) আনুগত্য স্বীকার করে চিঠি লিখেন এবং তাকে কুফা গমনের আমন্ত্রণ জানান। হজরত হোসাইনের কুফা সফরের প্রস্তুতিতে ইয়াজিদ শিবিরে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। তারা কুফার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন চালিয়ে তাদের নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করে। এই অপচেষ্টা সাময়িকভাবে সফলও হয়। ইতিমধ্যে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার সহযাত্রীদের অবরুদ্ধ করা হয় ইয়াজিদের নিয়োজিত কুফার গভর্নরের নির্দেশে। এক মাস অবরুদ্ধ থাকার পর হজরত ইমাম হোসাইন কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর মুখোমুখি হন। অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার শপথে তিনি ঘোষণা করেন ‘অপমানজনক জীবনের চেয়ে সম্মানজনক মৃত্যু শ্রেয়।’ ইয়াজিদ বাহিনী হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) শিবিরের পানি সরবরাহ বন্ধে ফোরাত নদীর তীরে অবরোধ সৃষ্টি করেছিল। ইমাম পরিবারের শিশুদের জীবন রক্ষায় তিনি সে অবরোধ ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন। শুরু হয় নির্দয় ইয়াজিদ বাহিনীর সঙ্গে ইসলামী আদর্শের প্রতি অনুগত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর অনুসারীদের যুদ্ধ। সেই অসম যুদ্ধের একদিকে ইমাম হোসাইনের (রা.) পক্ষে ছিলেন মাত্র ৭২ জন সৈন্য। অন্যদিকে মুয়াবিয়ার (রা.) পুত্র ইয়াজিদের পক্ষে ছিল চার হাজার সৈন্য। যুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সহযোদ্ধাদের একে একে সবাই শাহাদাতবরণ করেন।  কারবালার প্রান্তরে অসম যুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রা.) শাহাদাতবরণ করেন। রক্ত দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন জীবনের চেয়ে আদর্শ অনেক বড়। ইসলামের আদর্শ সমুন্নত রাখতে তার শাহাদাতবরণ রোজ কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

     লেখক : ইসলামী গবেষক

এই পাতার আরো খবর
up-arrow