Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৫ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৪ জুলাই, ২০১৬ ২৩:১২
নিবরাস, রোহান ও মোবাশ্বেরকে খোলা চিঠি
ফরিদা ইয়াসমিন
নিবরাস, রোহান ও মোবাশ্বেরকে খোলা চিঠি

প্রিয় বলে সম্বোধন করতে পারলাম না। কীভাবে করি? তোমাদের হাত যে রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনা তোমরা ঘটিয়েছ।

তবুও আজ তোমাদের চিঠি লিখছি। জানি তোমরা এ চিঠি পড়বে না। কিন্তু তোমাদের হয়ে তোমাদের বয়সী যারা নিরুদ্দেশ হয়েছে, কিংবা হতে চায় তারা পড়বে— এ আশায় লিখছি। যদি তাদের একটু আত্মোপলব্ধি হয় সে প্রত্যাশায় লিখছি।

আচ্ছা তোমরা এখন কোথায় আছ? বেহেশতে গিয়েছ? কী করে যাবে? তোমাদের নিথর দেহ মেডিকেল কলেজ মর্গে পড়ে আছে। তোমাদের এই যে প্রিয় বাবা-মা, যারা তোমাদের কত কষ্ট করে না বড় করেছেন। কই তারা তো একবারও গেলেন না ওই নিথর দেহটা দেখতে। ইসলামী বিধান মতে তোমাদের কবরস্থ করতে। আদরের সন্তানদের শেষবারের মতো দেখতে। কত কষ্ট বুকে চাপা দিয়ে তারা পড়ে আছেন তোমরা কি তা বুঝতে পার? তারা তোমাদের আর নিজেদের সন্তান মনে করেন না বুঝতে পারছ? তোমরা তো ধর্মের জন্য প্রাণ দিয়েছ তোমরা কী জানতে না বাবা-মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। তোমরা ২২ জন মানুষকে নৃশংসভাবে খুন করেছ। তাদের পিতা-মাতার বুক খালি করেছ। কত সন্তানকে মা-বাবা হারা করেছ। তোমাদের পিতা-মাতারা কীভাবে যাবেন সন্তানকে শেষবারের মতো দেখতে। তোমরা তো তাদের আদরের ছেলে হয়ে থাকনি। তোমরা হয়ে গেছ জঙ্গি। বেহেশতের দরজা তো তোমাদের জন্য খুলবে না। ইসলাম ধর্মে তো কখনো পিতা-মাতার অবাধ্য হতে শিক্ষা দেয় না।

ইসলাম কি মানুষ হত্যা সমর্থন করে? তোমরা ভাবলে না এ মানুষগুলো তো আল্লাহর সৃষ্টি। নিরীহ মানুষগুলো তো কোনো অন্যায় করেনি যে তাদের খুন হতে হবে। আল্লাহর  সৃষ্টির সেরা মানুষ। মানুষ তৈরি করে আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেছিলেন মানুষকে সিজদা করতে। যে ফেরেশতা সিজদা করেনি তাকে বেহেশত থেকে বের করে দেওয়া হয়। সে-ই হচ্ছে শয়তান। মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়। অন্য ধর্মের মানুষকে হত্যা করতে হবে আল্লাহ কি কোথাও বলেছেন? পাপ-পুণ্যের বিচার করবেন আল্লাহ। যারা বিদেশি, বিধর্মী তারা তো এক আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, ‘যারা ইমান আনে, তারা খ্রিস্টান হোক, ইহুদি হোক কিংবা সাবী হোক (তারাই মুসলমান)। এদের যে কেউই আল্লাহর ওপর ইমান আনবে, ইমান আনবে পরকালের ওপর এবং যথার্থ ভালো কাজ করবে, আল্লাহতায়ালা তাদের অবশ্যই পুরস্কৃত করবেন এবং এসব লোকের যেমন ভয় নেই, তেমনি তারা চিন্তিতও হবে না। ’ (সূরা আল বাকারা, আয়াত ৬২)। তোমরাই বল ধর্মের কোথায় আছে যে অন্য ধর্মের মানুষকে হত্যা করতে হবে?

কে সূরা পড়তে পারে আর কে পারে না তার বিচার করার তোমরা কে? কী দোষ ছিল ফারাজ, ইশরাত, অবন্তীর? তোমরা কে তাদের বিচার করার? সব মানুষের বিচারের ভার তো আল্লাহ নিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি তাকে (চলার) পথ দেখিয়ে দিয়েছি, সে চাইলে (আল্লাহর) কৃতজ্ঞ বান্দাহ হতে পারে, আবার চাইলে কাফের হয়ে যেতে পারে। তবে যারা কুফরির পথ বেছে নেবে তাদের পাকড়াও করার জন্য আমি শেকল, বেড়ি ও (শাস্তির জন্য) আগুনের লেলিহান শিখার ব্যবস্থা করে রেখেছি। ’ (সূরা আদদাহ্র আয়াত ৩-৪)। আর তোমরা কিনা বেহেশত যাওয়ার আশায় নিজেরা আল্লাহর কাজ হাতে নিয়ে নিলে! এতটা মগজধোলাই তোমাদের হলো কীভাবে?

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী এই বাংলাদেশ। কোনো অপশক্তির কাছে এ দেশ হার মানবে না। তোমরা মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোননি? হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সবাই মিলে এ দেশটা স্বাধীন করেছে। ভারত এবং কত দেশ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে। পাকিস্তানি অপশক্তি এদেশে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে। তারাও বিকৃত ফতোয়া দিয়ে গণিমতের মাল বলে তোমাদের মা-বোনকে অপমান করেছে। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এদেশের মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছে। অবশেষে এক অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে এ বাংলাদেশের জন্ম। তোমাদের হয়তোবা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের ইতিহাস কেউ বলেনি। যদি জানতে তাহলে এত গৌরবময় দেশে জন্ম নিয়ে তোমরা এমন জঙ্গি হতে পারতে না। বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদ সন্ত্রাসের কোনো স্থান নেই।

ধর্মীয় জঙ্গিবাদ আজ সারা বিশ্বে একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জঙ্গিবাদীরা তোমাদের মতো তরুণ ছেলেমেয়েদের মগজধোলাই করে প্ররোচিত করছে সন্ত্রাসবাদের দিকে। তোমরা যে কোন নেশায় বুঁদ হয়েছিলে! বুঝতে পারলে না কতটা অসত্যের পথে পা বাড়াচ্ছ। জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস সিরিয়া ও ইরাকে যে যুদ্ধ করছে তাতে ইসলামের কী লাভ হচ্ছে? ইরাকে সাদ্দামের বাথ পার্টির ক্ষমতাচ্যুত সৈন্যরা গঠন করেছে আইএস। তারা তাদের হারানো ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার লোভে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য কিছু পশ্চিমা শক্তি তাদের মদদ দিচ্ছে। এখন শোনা যাচ্ছে যে এর পেছনে ইসরায়েলের গোয়েন্দা বাহিনী মোসাদের হাত রয়েছে।

তোমাদের মতো তরুণদের সামনে সারা পৃথিবী খোলা। জঙ্গিবাদে জড়ানোর আগে তোমাদের উচিত ছিল ঘটনার পেছনের ঘটনা বিশ্লেষণ করা। যুক্তি দিয়ে বোঝা— সত্যি কোনটা। আজ আইএস জঙ্গিদের কারণে নারী ও শিশুসহ লাখ লাখ মুসলমান উদ্বাস্তুর জীবনযাপন করছে। অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টে তারা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। কত ছোট ছোট শিশুর মৃত্যু ঘটছে। একটু আশ্রয়ের খোঁজে পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বারস্থ হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ মুসলমানদের সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। জঙ্গিরা আল্লাহর সৃষ্ট এ পৃথিবীতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। আল্লাহ কোথায় বলেছেন, তার এই পৃথিবীতে অশান্তি তৈরি করতে? আল্লাহ নিজেও কোনোরকম অশান্তি তৈরির ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। সূরা আল বাকারায় বলেছেন, ‘(স্মরণ কর) যখন মূসা তার লোকদের পানি সরবরাহের জন্য (আমার কাছে) দোয়া করল, আমি (তাকে) বললাম, তোমার হাতের লাঠি দিয়ে তুমি (এই) পাথরে আঘাত কর, (আঘাত করা মাত্রই) এই পাথর থেকে ১২টি নহর (পানির) উৎসারিত হয়ে গেল, প্রত্যেক গোত্রই নিজ নিজ (পানির) নহর চিনে নিল। (আমি বললাম) আমার দেওয়া রিজিক থেকে তোমরা উপভোগ কর, তবে আমার জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি কর না। ’ (সূরা আল বাকারা, আয়াত-৬০)।

আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত অপশক্তি। যারা কোনো দিন এদেশের জন্ম মেনে নেয়নি, তারা এখনো এদেশকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তোমরা তাদের খপ্পরে পড়লে? ধর্মের  উগ্রবাদী দীক্ষায় দীক্ষিত হলে। তোমাদের জানা উচিত ছিল এদেশের মানুষ ধর্মের উগ্রবাদিতাকে মেনে নেবে না। ধর্মের নামে কোনো হত্যাকাণ্ড মেনে নেবে না। ইসলাম অর্থ শান্তি। ইসলাম শান্তির ধর্ম, কোনো ধর্মই মানুষ হত্যা সমর্থন করে না। ধর্ম মানুষকে শান্তি ও সৌহার্দ্যের কথা বলে। ইসলামের কোথাও নেই মুসলমান ছাড়া অন্য ধর্মের মানুষ পৃথিবীতে বাঁচতে পারবে না। তবে যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহতায়ালার পথে সেসব লোকের সঙ্গে লড়াই কর, যারা তোমাদের সঙ্গে লড়াই করে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তোমরা সীমা লঙ্ঘন কোরো না, কারণ আল্লাহতায়ালা কখনো সীমা লঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করে না। ’ (সূরা আল বাকারা, আয়াত-১৯০)। হলি আর্টিজানের নিরীহ বিদেশি মানুষগুলো তো এদেশের মানুষের জন্য কাজ করতেই এসেছিল। তোমরাই বল তাদের হত্যা করে তোমরা কোন ধর্মের কাজটি করেছ?

তোমরা সবে স্কুল-কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিয়েছিলে। মোবাশ্বের তো কলেজ শেষ করেনি। এত অল্প বয়সে সৃষ্টির এ রহস্য, ধর্ম, সর্বোপরি জীবন সম্বন্ধে এত বড় সিদ্ধান্ত নিলে? তোমাদের এত সহজে জঙ্গিরা মগজধোলাই করে ফেলল? তোমাদের আরও জানার, আরও পড়ার, আরও বোঝার দরকার ছিল। তোমরা চোখ, কান খোলা রেখে পড়াশোনা করলে সঠিক আর ভুল বুঝতে পারতে। জঙ্গিরা সুন্দর বৈষম্যহীন জীবনের কথা বলে তোমাদের মধ্যে ধর্মীয় বিভ্রান্তির বীজ বুনে দিল? তোমরা মানুষ থেকে জঙ্গি হয়ে গেলে। বুঝলে না ধর্ম শান্তির কথা বলে, নিরীহ মানুষ খুনের কথা বলে না। তোমরা নাকি ইসলামী সমাজ কায়েমের শর্ত দিয়েছিলে। জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সমাজ বদল হয় না। এক সময় সমাজ বদলের অঙ্গীকার করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগানে এদেশে সর্বহারা পার্টির নামে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। একশ্রেণির তরুণ হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল, শ্রেণিশত্রু খতমের নামে তারা মানুষ খুন শুরু করেছিল। তারা আজ কোথায়? যুগে যুগে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তা কঠোর হস্তে দমন করা হয়েছে।

এ চিঠি তোমাদের কেন লিখছি জান? কারণ আমি একজন মা। সন্তান বিপথগামী হলে মায়ের যে কী কষ্ট তা মা ছাড়া কেউ কি এতটা বুঝতে পারবে? তোমাদের বয়সী আমার ছেলে আছে। দূর দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ভালো ফলাফলের জন্য প্রতিবছর ডিন অ্যাওয়ার্ড পায়। প্রায় প্রতিদিনই মাকে ফোন করে জানতে চায় মা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছে কিনা, ওষুধ খেয়েছে কিনা। এর ব্যতিক্রম হলে বুক ধুকপুক করতে থাকে। মা তো!

তোমাদের বলছি, তোমরা বেহেশত যেতে চেয়েছিলে তো! কীভাবে যাবে? তোমাদের মায়েদের কষ্ট একবারও টের পেলে না। জঙ্গিবাদে দীক্ষিত হওয়ার আগে মায়ের মুখটা মনে পড়ল না?

তোমাদের পিতা-মাতা যতদিন বাঁচবে কত কষ্ট নিয়ে বাঁচবে। তোমরা নাকি একটি বড় ঘটনা ঘটিয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নিতে চেয়েছিলে। হ্যাঁ বাঙালি জাতি যতদিন থাকবে, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, তোমাদের নাম মানুষ ঘৃণাভরে স্মরণ করবে। কত মানুষ তোমাদের অভিশাপ দেবে। তোমাদের নাম শুনলেই উচ্চারিত হবে ধিক! লেখক : সাংবাদিক।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow