Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৩১ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০
বহুমাত্রিক শিল্পী হামিদুজ্জামান খান
দেশের অন্যতম প্রধান ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান। জলরঙ, তৈলচিত্রের পাশাপাশি নিয়মিত ভাস্কর্যশিল্পের চর্চা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য বিভাগের অনারারি এই অধ্যাপকের চার দশকের শিল্পচর্চা নিয়ে আজকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- শেখ মেহেদী হাসান
বহুমাত্রিক শিল্পী হামিদুজ্জামান খান

আপনার জন্ম কিশোরগঞ্জে। কেমন ছিল আপনার ছেলেবেলা?

আমার জন্ম কিশোরগঞ্জের গচিহাটার সহশ্রামে। গচিহাটা একটি রেল ইস্টিশনের নাম। এই বিখ্যাত ইস্টিশনটি ও রেলগাড়ির সঙ্গে ছোটবেলা থেকে আমার পরিচয়। আমাদের অঞ্চলকে বলা হয় 'হাওর' অঞ্চল। কিন্তু রেললাইন গেছে উঁচু জায়গা দিয়ে। আমাদের জায়গাটা একটু উঁচু। ফলে দূরের গ্রামগুলো দেখা যায় না।

আমাদের বাড়িটা হাওরের কিনারায়। ছেলেবেলায় খেলাধুলা করেছি, হেসে-খেলে বড় হয়েছি। আমার স্কুলের নাম বড়গ্রাম হাইস্কুল। খুব নামকরা স্কুল। বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। ওই স্কুল থেকে আমি ১৯৬২ সালে মেট্রিক পাস করি। আমাদের স্কুলটা বিখ্যাত লেখক নীরোদ চৌধুরীর বাড়ির খুব কাছে।

তার ভাইপো আমার সঙ্গে পড়ত। সেই সুবাদে আমি নীরোদ চৌধুরীর বাড়িতে কয়েকদিন পরপর যেতাম। আমাদের গ্রামে অনেক উচ্চশিক্ষিত লোকজন বাস করত, ফলে আমার মানস গঠনে অনেক সহযোগিতা পেয়েছি।

ছোটবেলায় কি আপনি ছবি অাঁকতেন?

ছেলেবেলায় আমি স্কেচ করতাম। মনে পড়ে, আমার দাদার একটি ড্রইং করেছিলাম যা তার মুখাবয়ের সঙ্গে মিলে যায়। এতে সবাই খুব খুশি হয়। তখন তো ছবি-টবি এত ছিল না। এটাই ঘরে ফ্রেম করে রেখে দেওয়া হয়। আমার আব্বা ধার্মিক ছিলেন। কিন্তু আমার ছবি অাঁকাটা পছন্দ করতেন। উনি হয়তো আমাকে কোনো জায়গায় নিয়ে গেলেন... টাউনে, নিয়ে বলতেন- তুমি মসজিদের ছবি অাঁকো। মসজিদের ছবি অাঁকলাম। আমাদের কিশোরগঞ্জে শহীদে মসজিদ। আব্বা ওই মসজিদের ইমামের কাছে আমাকে নিয়ে গিয়ে বললেন, আমার ছেলে এটা এঁকেছে, আপনাকে দিবে। আরে কী খুশি!

তুমি মসজিদেরই ছবি এঁকেছো, সুন্দর হয়েছে তো! এরকম ঘটনা কিছু ছিল। তারপরে আমি টাউনে গেলেই আব্বাকে বলতাম, আমাকে রঙ কিনে দেন। আব্বা কিনে দিতেন। তখন আস্তে আস্তে গ্রো করল। আমাদের স্কুলটা ছিল হিন্দুপ্রধান। ভালো ভালো টিচার ছিল।

আমি ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হয়েছিলাম ভৈরব কলেজে। মাসখানেক ক্লাস করার পর এই সাবজেক্টটা আমার একদম ভালো লাগল না। আমি পড়াশোনা বাদ দিয়ে সিলেট চলে যাই।

তারপরই কী আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন? আমার চারুকলায় পড়ার ইচ্ছা কিন্তু আব্বাকে বলতে পারছি না। তখন আমাদের পোস্টমাস্টার একদিন আব্বাকে বললেন, 'আপনার ছেলে আর্ট কলেজে পড়তে চায়, ওকে সেখানে ভর্তি করে দিন।' আব্বা ওনার কথায় রাজি হলেন। আব্বার সঙ্গে ঢাকায় এলাম। আমরা আবেদিন স্যারের খোঁজে সরাসরি তার শান্তিনগরের বাসায় গেলাম। উনি বারান্দায় বসে ছিলেন। এই প্রথম আমি জয়নুল আবেদিনকে দেখলাম। আমার আব্বা সহজ-সরল মানুষ। তিনি আবেদিন স্যারকে বললেন, 'ও তো আর্ট কলেজে ভর্তি হতে চায়।' স্যার বললেন, 'কালকে নিয়ে আস, আমি ওকে ভর্তি করে নিব।' পরদিন আর্ট কলেজে যাওয়ার পর, আবেদিন স্যার আমার কাগজপত্র, ড্রয়িং দেখে ভর্তি করে নিলেন।

ছাত্রজীবনে আপনার আদর্শ শিক্ষক কে ছিলেন?

শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আমাকে খুব সাহস দিতেন। সারা রাত ছবি এঁকে সকালে ক্লাসে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। স্যার বললেন, 'ওকে ডেকো না।' ওই দিন তিনি আমার স্কেচ খাতা নিয়ে দেখেন- খাতাভর্তি স্কেচ। আরেকটি ঘটনা মনে পড়ে, সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় হঠাৎ একদিন আবেদিন স্যার আমাকে ডাকলেন। আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম। উনার সামনে যাওয়ার পর তিনি জিজ্ঞসা করলেন, 'তোমার এক্সিবিশনে কতগুলি ওয়াটার কালার আছে? এগুলো আমরা ডিপার্টমেন্ট থেকে ফ্রেম করে দিচ্ছি।' আমাদের প্রিন্ট মেকিংয়ের অনেকগুলো বড় বড় ফ্রেম ছিল। টিচাররা ইউজ করত মাঝে মাঝে। আমি গিয়ে দেখি, আমার ছবিগুলো সব ফ্রেম করা হয়ে গেছে। ছবিগুলো টাঙানো হলো। তারপর আবেদিন স্যার বললেন, 'এই শোনো, তোমার যে কয়টা ছবি আছে আমি কিনে নিলাম, এগুলো আমার। আমার যে বিভিন্ন গেস্ট আসে তাদের এগুলো প্রেজেন্ট করব। তুমি অফিস থেকে পয়সা নিয়ে যাও।' আমি খুশিতে কেঁদে ফেলি। ফাইনাল ইয়ারে পড়ার সময় আমার একটি মেজর অ্যাকসিডেন্ট হয়। ওই সময় আবেদিন স্যার সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন। মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পর ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নেই। তারপর ডা. আছির উদ্দিনের পরামর্শে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাই।

লন্ডনে চিকিৎসাকালীন আপনি তো বহু গ্যালারি পরিদর্শন করেছিলেন।

লন্ডনে যাওয়ার আগে আবেদিন স্যারের পরামর্শে চট্টগ্রাম ক্লাবে একটি প্রদর্শনী করে কিছু টাকা জোগাড় করি। তারপর লন্ডনে গেলাম। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তাররা আমাকে চার মাস লন্ডনে থাকতে বললেন। এমনকি চিকিৎসকরা আমি স্টুডেন্ট বিধায় আমার চিকিৎসা খরচ ফ্রি করে দিলেন। ওই সময় আমি ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ভিক্টোরিয়া আলবার্ট মিউজিয়াম, পোট্রেট গ্যালারি, ন্যাশনাল মিউজিয়াম, প্যারিসের লুভ্যর মিউজিয়ামসহ রোমের বিখ্যাতসব গ্যালারি পরিদর্শন করি। এরপর চিত্রকলা সম্পর্কে আমার ধারণা বদ্ধমূল হয়। দেশে ফিরে তখন একটাই স্বপ্ন নতুন কিছু করব।

তারপরই কী আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন?

আমি আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেই ১৯৭০ সালে। শিল্পী আবদুর রাজ্জাক ভাস্কর্য বিভাগ চালু করেছেন। ওই বিভাগের শিক্ষক হিসেবে জয়নুল আবেদিনই আমাকে নিয়োগ দিলেন। তিনি বললেন, 'হামিদ, তুমি পারবা। আজ থেকে ভাস্কর্য বানানো শুরু কর। তবে জলরঙটা ছেড় না।'

ভাস্কর্য বিষয়ে আপনি উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন ভারত এবং আমেরিকায়।

দেশ স্বাধীন হওয়ায় ইন্ডিয়ান স্কলারশিপ ওপেন হলো। আবেদিন স্যার বললেন, 'তুমি স্কলারশিপের জন্য অ্যাপ্লাই করো, মাস্টার্স কইরা আসো।' অ্যাপ্লাই করলাম। তিনি সিলেকশন কমিটির মেম্বার ছিলেন। নির্দিষ্ট দিনে আমি ইন্টারভিউ দিতে ঢুকছি, দেখি আবেদিন স্যার চলে যাচ্ছেন। স্যারকে বললাম, 'স্যার আমি তো ইন্টারভিউ দিতে আসছি।' উনি বললেন, 'যাও ইন্টাভিউ হবে না। আমি সিলেকশন দিয়ে আসছি, তোমার স্কলারশিপ হয়ে গেছে।' তারপর ১৯৭৪ সালে গেলাম বড়দা মহারাজা সাহজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ১৯৭৬ সালে এমএফএ করলাম। পরে ১৯৮২-১৯৮৩ তে নিউইয়র্কের স্কাল্পচার সেন্টারে উচ্চশিক্ষা নিই।

জলরঙ, তেলচিত্রের পাশাপাশি আপনি নিয়মিত ভাস্কর্যচর্চা করছেন।

আমার শিল্পচর্চার শুরু হয় পেইন্টিং দিয়ে। এ জন্য এখনো আমি জলরঙ, তেলরঙ, স্কেচ করি। এ মাধ্যমে আমি একাধিক প্রদর্শনীও করেছি। তবে ভাস্কর্যচর্চার মূল প্রেরণা আবেদিন স্যার ও রাজ্জাক স্যার। আমাদের দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য 'জাগ্রত চৌরঙ্গী' তৈরির সময় আমি রাজ্জাক স্যারের সহশিল্পী হিসেবে কাজ করি। বড়দায় থাকতে বৌম্বের এক প্রদর্শনীতে আমার ভাস্কর্য উপমহাদেশের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের নজর কাড়ে। হুসেনও আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। এরপর ১৯৮১ সালে বঙ্গভবনে 'পাখি পরিবার', সিউল অলিম্পিকে ১৯৮৮, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯০-তে 'সংসপ্তক', ২০০৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় জাতীয় ভাস্কর্য উদ্যানে আমি ভাস্কর্য করেছি। এ ছাড়া ঢাকা, সিলেট ক্যান্টনমেন্টসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে আমি ভাস্কর্য করেছি। ফলে মানুষের কাছে ভাস্কর্যশিল্পের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।

আপনি তো ঝুলন্ত ভাস্কর্য, ইলোস্ট্রেশন করছেন।

আসলে শিল্প মানে প্রতিনিয়ত নিরীক্ষা। আমি ভাস্কর্যশিল্পকে নতুন মাত্রা দিতে চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন ফর্মের পাশাপাশি ঢাকার ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউনাইটেড হাসপাতালে ঝুলন্ত ভাস্কর্য করেছি। আমার স্বপ্ন ভাস্কর্যশিল্প মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়া। এতে শিল্পরুচির বিকাশ ঘটবে।

আপনি তো একটি ভাস্কর্যউদ্যান করতে চেয়েছিলেন?

এশিয়ার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া জাতীয় ভাস্কর্য উদ্যান করেছে। আমি সাভারে নিজ উদ্যোগে একটি স্কাল্পচার পার্ক তৈরির চেষ্টা করছি। তারপরও সরকারি উদ্যোগে একটি ভাস্কর্য উদ্যান তৈরি করা দরকার। তাহলে বিশ্ববাসীর কাছে দেশ ও জাতি হিসেবে আমাদের আত্মমর্যাদা, সম্মান বাড়বে।

 

এই পাতার আরো খবর
up-arrow