শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ জানুয়ারি, ২০২১ ২৩:১১

নেই বাণিজ্যিক রাজধানীর প্রতিশ্রুতি

রেজা মুজাম্মেল, চট্টগ্রাম

নেই বাণিজ্যিক রাজধানীর প্রতিশ্রুতি

চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক নগরী। এই নগরের উন্নয়নে মূল নিয়ামক সংস্থা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। নগর উন্নয়নে মুখ্য ভূমিকাও থাকে চসিকের নির্বাচিত মেয়রের। কিন্তু আসন্ন চসিক নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতিতে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়নের বিষয়টি উপেক্ষিত। অথচ চট্টগ্রাম প্রকৃত অর্থেই বাণিজ্যিক রাজধানী না হওয়ায় প্রতিনিয়তই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয় ব্যবসায়ীদের। তাদের দাবি, চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হলে বিস্তৃত হবে ব্যবসা। এর সুফল পাবে দেশ। এ নিয়ে নির্বাচিত মেয়রের মুখ্য ভূমিকা পালন করার সুযোগ আছে। প্রসঙ্গত, বাণিজ্যিক রাজধানীর ধারণাটি হলো, শহরটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া, মন্ত্রণালয়ের একটি উইং থাকা, একাধিক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থাকা, ব্যবসা-সংশ্লিষ্ট দাফতরিক অনুমোদনের ব্যবস্থা থাকা, যোগাযোগব্যবস্থা সমৃদ্ধ থাকা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকা। চিটাগাং উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক রোজিনা আক্তার লিপি বলেন, ‘যে কোনো শহরের একটি প্রধান সমুদ্রবন্দরই বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবিদার। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ঘিরে চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক নগরী হিসেবে গড়ে উঠেছে। বন্দরের কারণেই এখানে হালকা, মাঝারি ও ভারী শিল্পের সূচনা হয়। এখনো সমুদ্রপথে সারা দেশে কনটেইনারে আমদানি-রপ্তানির ৯৮ শতাংশই এ বন্দর দিয়ে পরিবহন হয়। পণ্য হিসেবে চট্টগ্রাম দিয়ে পরিবহন হয় ৯৩ শতাংশ। অথচ চট্টগ্রাম এখনো নামেই বাণিজ্যিক  রাজধানী। এখনো বাণিজ্য-সংক্রান্ত অধিকাংশ সেবাই চট্টগ্রামে পাওয়া যায় না। আবার ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নেই সহায়ক অবকাঠামো। দীর্ঘদিন ধরে শিল্প-কারখানা স্থাপন ও আমদানি-রপ্তানির অনেক সেবার অনুমোদন ঢাকা থেকে নিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। আমরা মনে করি, এর প্রধান কারণ হলো, রাজনৈতিকভাবে জোরালো ভূমিকা না থাকা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।’ খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ জামাল হোসেন বলেন, ‘নগর উন্নয়নে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে জনপ্রতিনিধি আছে একমাত্র চসিকের। তাই চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়নে সিটি মেয়রের একটা মুখ্য ভূমিকা থাকা উচিত। আমরা চাই, আসছে নির্বাচনে নির্বাচিত মেয়র চট্টগ্রামকে সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়নে কার্যকর অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন।’ জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল চট্টগ্রাম কসমোপলিটনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও এর কোনো কার্যকারিতা নেই। ফলে এখনো ব্যবসায়ীদের জরুরি অনেক বিষয়েই ঢাকামুখী থাকতে হয়। এ ব্যাপারে এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ চট্টগ্রামে যে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর হচ্ছে, সেটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক রাজধানীর সম্পর্কও বিদ্যমান।’ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে ৫৯টি ব্যাংক থাকলেও সবগুলোর প্রধান কার্যালয় ঢাকায়। বিএসটিআইর ১৮১টি পণ্যের মধ্যে ৭৬টি পণ্যের মান পরীক্ষা ও লাইসেন্স নিতে হয় ঢাকা কার্যালয় থেকে। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পড়ে থাকলেও ঢাকা থেকে পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত ১৩টি পণ্য ছাড় করা যায় না।

 আমদানি-রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দফতর থেকে ৫৫টি সেবা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২৮টি সেবা নিতে হয় ঢাকার প্রধান কার্যালয় থেকে। মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ ২৮ ধরনের পণ্যের আমদানি-রপ্তানির অনুমতি নিতে হয় ঢাকা থেকে। শিল্প-কারখানায় বয়লার বসানোর আগে আমদানির ছাড়পত্র কিংবা বয়লারের নিবন্ধন নিতে হয় ঢাকা থেকে। চট্টগ্রামে কার্যালয় থাকলেও চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হয় ঢাকার প্রধান কার্যালয় থেকে। পণ্য রপ্তানির আগে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর নিবন্ধন নিতে হয়। চট্টগ্রামে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো কার্যালয় এ-সংক্রান্ত কাগজ যাচাই-বাছাই করলেও নতুন নিবন্ধনের অনুমোদন নিতে হয় ঢাকা থেকে। দেশে পুরনো জাহাজভাঙা কারখানার অবস্থান চট্টগ্রামে। পুরনো জাহাজ আমদানির ঋণপত্র খোলা থেকে কাটা পর্যন্ত চারবার শিল্প মন্ত্রণালয় ও সংস্থার অনুমোদন নিতে হয় ঢাকা থেকে। কোম্পানি গঠন করতে নিবন্ধন নিতে হয় যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয় থেকে। এই নিবন্ধকের কার্যালয়ের প্রধান কর্মকর্তা বা উপনিবন্ধক ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এসে সপ্তাহে এক বা দুই দিন অফিস করেন। তাই উদ্যোক্তাদের অপেক্ষা করতে হয়। পোশাক কারখানার যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য প্রত্যয়নপত্র নিতে হয় বিজিএমইএ থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন মতে, প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর করবেন সংগঠনের সভাপতি। চট্টগ্রামে সংগঠনটির প্রথম সহ-সভাপতি থাকলেও তার ক্ষমতা নেই।

জানা যায়, ২০০৩ সালের ৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার একটি প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করে। মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত হয়, যে কোনো একটি ব্যাংক বা বিমা কোম্পানির সদর দফতর চট্টগ্রামে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া শিক্ষা, প্রশাসনিক, যোগাযোগ, পর্যটন, বন্দরসহ যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক দফতর চট্টগ্রামে রয়েছে, সেগুলোর ক্ষমতাও বাড়ানো হবে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের কোনোটাই বাস্তবায়িত হয়নি। এ ছাড়া এক বছর আগে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকে সভাপতি ও জেলা প্রশাসককে সদস্যসচিব করে বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর