শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ জুন, ২০২১ ২৩:৪২

হিমাগারে কালশী ট্র্যাজেডির তদন্ত

♦ পাঁচ মামলার সর্বশেষ অবস্থান নিয়েও অন্ধকারে পুলিশ ♦ নিরাপত্তাহীনতায় একমাত্র জীবিত ফারজানা

সাখাওয়াত কাওসার

হিমাগারে কালশী ট্র্যাজেডির তদন্ত
সাত বছর আগে রাজধানীর কালশী বিহারি ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে নয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় -বাংলাদেশ প্রতিদিন
Google News

সাত বছর পেরিয়ে গেলেও রাজধানীর কালশী বিহারি ক্যাম্পের অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার রহস্য উদঘাটন হয়নি। চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনায় ছয়টি মামলা হলেও কেবল একটি মামলা ছাড়া বাকিগুলোর সর্বশেষ অবস্থা নিয়েও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশের ওপর হামলাসহ কয়েকটি অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইনে পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক জাহিদের বাদী হওয়া মামলার (মামলা-৩১) চার্জশিট দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ওই মামলার চার্জশিটে ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যারা পুলিশের ওপর হামলা করেছিল। ক্ষতিগ্রস্ত বিহারিদের অভিযোগ, পরিকল্পনা করেই মামলাগুলো হিমাগারে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে উদ্বেগজনক খবর হলো, ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বেঁচে যাওয়া ওই পরিবারের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি ফারজানাও নিরাপত্তাহীনতায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ২০১৪ সালের ১৪ জুন মিরপুর-১২ পল্লবীর কালাপানির পূর্ব কুর্মিটোলা কালশী বিহারি ক্যাম্পে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। আগুনে ইয়াসিনের স্ত্রী, তিন ছেলে, তিন মেয়েসহ ছেলের গর্ভবতী স্ত্রী মারা যান। ইয়াসিন ও তার ছোট মেয়ে ফারজানা অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে ইয়াসিন বাসায় ফেরার দুই দিনের মাথায় রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। এরপর তার লাশ পাওয়া যায় হাসপাতালে। বলা হয় সড়ক দুর্ঘটনায় ইয়াসিনের মৃত্যু হয়েছিল। তবে তার প্রতিবেশীদের অভিযোগ ছিল, লাশের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না।

বিহারি ক্যাম্পে গতকাল দুপুরে গিয়ে কথা হয় সে সময়ের প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে। এদের একজন মঈনুদ্দিন হোসেন মুন্না। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রায় সাত বছর হয়ে গেল। এখনো সেই আগুনের ঘটনার সঠিক রহস্য জানা যায়নি। আমাকে বছর দেড়েক আগে সিআইডি থেকে ডাকা হয়েছিল। গিয়েছিলাম। কথা বলেছি। তবে বর্বর, নৃশংস এই ঘটনার আদৌ কি রহস্য উন্মোচন হবে?’ পল্লবী থানার এসআই জাহিদের ৩১ নম্বর মামলার চার্জশিট আদালতে জমা হয়েছে ২০১৯ সালের ১৮ জুন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক নুরুল ইসলাম সিদ্দিক বলেন, আজাদ, আরিফ, জুয়েল, সাব্বির, বদরুদ্দীন, আরজুকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, ওই মামলায় ক্যাম্পের বদরুল, সাব্বির, আজাদ, আরজু, আরিফ ও জুয়েলকে এজাহারভুক্ত করে অজ্ঞাতনামা প্রায় ৩ হাজার জনকে আসামি করে একটি মামলা হয়। মামলাটি তদন্তের জন্য প্রথমে পল্লবী থানা, ডিবি, সর্বশেষ সিআইডিতে যায়। সিআইডিতে গিয়েও তিনবার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়।

গতকাল রাজধানীর একটি এলাকায় কথা হয় পালিয়ে বেড়ানো সেই ফারজানার সঙ্গে। তার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। কথা বলতে গিয়েও তার গলা শুকিয়ে আসছিল। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি বলছিলেন, ‘ভাই, সাত বছর আগে তো সবই হারাইছি। এখন আমিও নিরাপদ নই। আমার মতো এতিমকেও ওরা মারতে চায়। ভয়ে ক্যাম্পে থাকতে পারি না। যারা এ ঘটনার জন্য দায়ী তারা ধরা পড়েনি। অথচ নিরপরাধ লোকজনকে মামলার আসামি করে হয়রানি করা হচ্ছে।’

বিহারিদের সংগঠন এসপিজিআরসির সভাপতি খোরশেদ আলম বলেন, ‘ইয়াসিনের মৃত্যু নিয়েও রহস্য আছে। আগুনে ক্যাম্পের অন্য অনেকের ঘর পুড়ে ছাই হয়। আগুনে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদেরই আসামি করা হয়। এখনো আমরা আতঙ্কে আছি। আগুন কীভাবে লেগেছিল তা এখনো আমরা জানতে পারিনি। ওই আগুনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ইয়াসিনের। আগুনে পুড়ে তার পরিবারের ৯ জন মারা যান।’ এদিকে মামলার অবস্থান নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) আ স ম মাহতাব উদ্দিন বলেন, ২০১৪ সালের ১৪ জুন পল্লবীর কালশী বিহারি ক্যাম্পে আগুনে পুড়ে একই পরিবারের ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। মামলাটি শুরুতে তদন্ত করলেও এখন আর থানা পুলিশ তদন্ত করছে না। তবে অন্য কোন সংস্থা মামলাটি তদন্ত করছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জানা নেই।’ পরে এই মামলার তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) উপ-কমিশনার মানস কুমার পোদ্দার বলেন, ‘এ মামলার বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। মামলাটি ডিবিতে আছে কি না তাও আমার জানা নেই।’ এরপর কথা হয় যুগ্ম-কমিশনার মাহবুব আলমের সঙ্গে। তিনিও কোনো তথ্য দিতে পারেননি। সর্বশেষ সিআইডির কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। কেউই মনে করতে পারছিলেন না বহুল আলোচিত সেই ঘটনার মামলাগুলোর কথা। অবশেষে এসএস (মেট্রো-পশ্চিম) শামসুন্নাহার একটি মামলার (নম্বর-৩১) বিষয়ে তথ্য দেন। এদিকে অনুসন্ধান ও একাধিক সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে বিরোধ, বিহারিদের মধ্যে পুলিশবিদ্বেষী তীব্র মনোভাবসহ নানা কারণে মর্মান্তিক ওই ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনার তদন্ত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের ধরতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর