বরগুনার হরিণখোলা গ্রামে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে কিশোর মো. হযরত আলীর (১৪) মৃত্যুর ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে। প্রথমে ঘটনাটিকে অপমৃত্যু (ইউডি) হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও, পরবর্তীতে আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তালতলী থানাকে এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১২ মে) নিহতের চাচা মো. হাবিব খলিফা বাদী হয়ে বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। মামলায় মো. মুসা ঘরামী (২২), মো. বশির উদ্দিন ঘরামী (২৮), আ. রহিম মাস্টার (৫৫) ও মো. আলাউদ্দিন হানিফ ঘরামীর (৫৭) নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩–৪ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ এপ্রিল হরিণখোলা দাখিল মাদরাসা মাঠে একটি প্রীতি ফুটবল খেলা চলছিল। খেলার একপর্যায়ে নিহত মো. হযরত আলীর কাছে একটি গরু চলে আসে। সেটি সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে গরুটি দিকভ্রান্ত হয়ে মাঠের মধ্যে প্রবেশ করে। এ সময় স্থানীয় রহিম মাস্টারের ছেলে মুসা ঘরামীর সঙ্গে হযরত আলীর বাকবিতণ্ডা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, পরে মুসাসহ কয়েকজন সংঘবদ্ধ হয়ে হযরত আলীর ওপর হামলা চালায়। লাঠিসোঁটা ও লোহার রড দিয়ে মারধরের একপর্যায়ে সে গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরও তাকে মারধর করা হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে না নিয়ে বিচার-সালিশের নামে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দরিদ্র পরিবার হওয়ায় তাৎক্ষণিক চিকিৎসা করাতে পারেননি তার মা আছিয়া বেগম। পরে খবর পেয়ে ঢাকা থেকে চাচা ইউনুস খলিফা এসে তাকে তালতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান। পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
নিহতের মা আছিয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন। আমার একমাত্র ছেলেটাকেও হারালাম। টাকার অভাবে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিতে পারিনি। যারা আমার ছেলেকে মেরেছে, আমি তাদের বিচার চাই।’
ঘটনার পর তালতলী থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, থানা বাউন্ডারির ভেতরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে তাদের দিয়ে ওই ইউডি মামলা করানো হয়। এমনকি প্রশাসনের উপস্থিতিতে ওই অপমৃত্যু মামলার ভিডিও ধারণ করা হয়েছে বলেও দাবি স্বজনদের।
পরিবারের দাবি, ঘটনাটিকে মৃগী ও হাঁপানি রোগজনিত মৃত্যু হিসেবে প্রচার করে হত্যার আসল অভিযোগ আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় সচেতন মহল ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
এদিকে বাদীপক্ষ একাধিকবার হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিলেও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপ ও ভয়ভীতির কারণে তা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। শেষ পর্যন্ত সকল চাপ উপেক্ষা করে নিহতের চাচা হাবিব খলিফা আদালতে মামলা করেন।
অভিযুক্তদের পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় এবং তারা পলাতক থাকায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, অসহায় পরিবারটির পক্ষে বিনা পারিশ্রমিকে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় এসেছেন তরুণ আইনজীবী মো. বেলাল হোসেন খান। তিনি শুধু মামলাটি গ্রহণই করেননি, বরং ব্যক্তিগতভাবে পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়ে পুরো মামলাটি বিনা পারিশ্রমিকে লড়ার ঘোষণা দেন।
তালতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সব্যসাচী দাস সানি জানান, হাসপাতালে আনার সময় হযরত আলীর অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এ বিষয়ে তালতলী ওসি সাইদুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে মামলা হয়েছে কি না, তা আমি অবগত নই। তবে আদালতের নির্দেশ পেলে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিডি-প্রতিদিন/এমএল