যমুনার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটাসহ ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাটবাজার। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন। হারিয়ে যাচ্ছে তাদের জন্মস্থান ও মানুষের মৃত্যুর পরের ঠাঁই নেওয়া ঠিকানা কবরস্থানও।
নদী তীরের মানুষের চোখের সামনে নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে তাদের চিরচেনা শেষ সম্বলটুকু। এগুলো অশ্রু ঝরিয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর যেন কিছুই করার থাকছে না তাদের। পানি উন্নয়ন বোর্ডও নিচ্ছে না কার্যকরী ব্যবস্থা।
জানা যায়, কয়েক সপ্তাহ যাবত যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ৯ সে.মিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে সিরাজগঞ্জ সদরের কাওয়াকোলা ইউনিয়ন, কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ, ভেটুয়া, চৌহালী উপজেলার চল সলিমাবাদ, শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়ন ও কৈজুরীতে শতশত বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, দোকানপাট ও কবরস্থানসহ অসংখ্য গাছপালা এবং শতশত বিঘা আবাদি জমি যমুনার গর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়াও পানি বাড়ায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের মুখে পড়ছে। বসতভিটা হারানোর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে নদীপাড়ের মানুষের।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ ইউনিয়নে। এক সময় যেখানে ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবার বসবাস করত। পুরো গ্রামটি ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। মাত্র ২ সপ্তাহে অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। নদী তীর যেভাবে ভাঙ্গছে তাতে আরও শতাধিক পরিবার যেকোনো সময় গৃহহীন হয়ে পড়বে। এছাড়াও ২০ জুন বিকেলে সদর উপজেলার বাহুকা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীতে ধসে পড়েছে। ৩০ মিটার জায়গায় ১৫ লক্ষ টাকা ব্যয় করে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙ্গন প্রতিরোধ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এছাড়াও নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করায় ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।
কাওয়াকোলা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক আব্দুর রাজ্জাক জানান, পানি বাড়ায় বর্নি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে মাদ্রাসা, মসজিদসহ ফসলি জমি এবং বহু বসতবাড়ি। ভাঙ্গনের কারনে চরাঞ্চলবাসী আতঙ্কে বসবাস করছে।
চরগিরিশ আব্দুল মমিন জানান, এই চরে বাবা-দাদার ভিটা ছিল। জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে ঘর তুলেছিলাম। কয়েক দিনের মধ্যেই সব নদীতে চলে গেল। এখন অন্যের জমিতে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। রফিকুল ইসলাম বলেন, চোখের সামনে সবকিছু নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, কী খাবো তা নিয়ে দুশ্চিন্তয়ায় রয়েছি।
চরসলিমাবাদের কোহিনুর খাতুন বলেন, আমরা গরিব মানুষ। যা ছিল সব নদী নিয়ে গেছে। সরকারি সহায়তা না পেলে খোলা আকাশের নিচেই থাকতে হবে।
রেজাউল করিম জানান, নদী শুধু ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়নি, আমাদের স্বপ্নও কেড়ে নিয়েছে। নিজের দেশেই আমরা যেন উদ্ভাস্তু হয়ে পড়েছি। পূর্বপুরুষদের কবর এবং মসজিদও নদীতে চলে গেছে। এই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। আব্দু রশিদ মিয়া জানান, জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু এমন অসহায় কখনো লাগেনি।
ভাঙ্গনকবলিতদের অভিযোগ, বছরের পর বছর যমুনায় ভাঙলেও কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগে থেকেই চিহ্নিত থাকলেও সময় মতো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয় না বলেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, যমুনার পানি বৃদ্ধির কারণে সদর, কাজিপুর, শাহজাদপুর ও চৌহালীর কয়েকটি পয়েন্টে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ফেলে তীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে স্থায়ী সমাধানের প্রস্তাবনাও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে চরাঞ্চলের ভাঙ্গনে ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ নেই।
বিডি প্রতিদিন/এএম