পাখির কিচিরমিচির যে কেবল এলোমেলো শব্দ নয়, বরং নির্দিষ্ট অর্থবাহী এক ধরনের যোগাযোগের মাধ্যম। দীর্ঘ গবেষণায় তারই প্রমাণ তুলে ধরে এক লাখ ডলারের সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক বিজ্ঞানী।
তার গবেষণা ভবিষ্যতে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে সরাসরি দ্বিমুখী যোগাযোগের সম্ভাবনাকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘জেব্রা ফিঞ্চ’ নামের এক ধরনের পাখির ডাকে ব্যবহৃত ১১টি মৌলিক শব্দ এবং সেগুলোর অর্থ শনাক্ত করার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে’র গবেষক ড. জুলি এলিকে ২০২৬ সালের ‘কলার-ডুলিটল প্রাইজ ফর টু-ওয়ে ইন্টারস্পিশিস কমিউনিকেশন’ প্রদান করা হয়েছে। পুরস্কারের অর্থমূল্য এক লাখ ডলার।
প্রাণী কল্যাণ ও প্রাণীদের অনুভূতি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘জেরেমি কলার ফাউন্ডেশন’ ২০২৪ সালে ‘তেল আবিব ইউনিভার্সিটি’র সঙ্গে যৌথভাবে এ পুরস্কার চালু করে। পাশাপাশি মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে কার্যকর দ্বিমুখী যোগাযোগের সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান যিনি দিতে পারবেন, তার জন্য ১ কোটি ডলারের বিশেষ পুরস্কারও ঘোষণা করেছে ফাউন্ডেশনটি।
এক দশকেরও বেশি সময়ের গবেষণায় ড. জুলি এলি দেখিয়েছেন, জেব্রা ফিঞ্চ পাখিরা কীভাবে নিজেদের পরিচয় দেয়, তারা কী করছে তা জানায় এবং বক্তার পরিচয় নয়, বরং প্রতিটি পাখির স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর শুনে একে অপরকে শনাক্ত করে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পাখিরা অনেক সময় একই ধরনের শব্দের চেয়ে অর্থে কাছাকাছি কিন্তু ভিন্ন শব্দগুলোর মধ্যে বেশি বিভ্রান্ত হয়।
পুরস্কার গ্রহণের পর ড. জুলি এলি বলেন, “আমি সত্যিই সম্মানিত বোধ করছি।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ স্থাপনের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টায় তার গবেষণা কার্যকর অবদান রাখবে।
‘তেল আবিব ইউনিভার্সিটি’র প্রাণিবিজ্ঞানী এবং বিচারক প্যানেলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইয়োসি ইয়োভেল বলেন, এ গবেষণা প্রাণী-মানব যোগাযোগ বিষয়ে নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হবে।
ড. এলি গবেষণার জন্য জেব্রা ফিঞ্চকে বেছে নেন, কারণ এ প্রজাতির পাখি অত্যন্ত বেশি কিচিরমিচির করে। ফলে তাদের আচরণ ও যোগাযোগ নিয়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, “এসব সদা-চঞ্চল গানের পাখিদের ডাক শোনার সময় আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, এরা আসলে কী বলছে?”
১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি জেব্রা ফিঞ্চের বিভিন্ন ধরনের ডাক পর্যবেক্ষণ ও রেকর্ড করেন। পরে পরিস্থিতি এবং পাখির আচরণ অনুযায়ী ডাকগুলোকে পৃথক শ্রেণিতে ভাগ করেন। এরপর মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির সাহায্যে তিনি বিশ্লেষণ করেন, এসব ডাকে কী ধরনের তথ্য লুকিয়ে বা এনকোড করা রয়েছে। পরবর্তীতে একাধিক পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত হন, তার তৈরি শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে পাখিরাও কার্যত একমত।
এমনই এক পরীক্ষায় জেব্রা ফিঞ্চদের একটি বোতাম চাপলে পরিচিত বিভিন্ন ধরনের ডাক শোনানো হতো। নির্দিষ্ট কিছু ডাকের পর পুরস্কার হিসেবে তাদের বীজ বা খাবার দেওয়া হতো। পরীক্ষা চলতে থাকলে পাখিরা দ্রুত শিখে যায়, কোন ধরনের ডাকের পর খাবার পাওয়া যাবে না। এরপর তারা বোতাম চেপে সেই ডাকগুলো ‘স্কিপ’ করে পরবর্তীটিতে চলে যেতে শুরু করে।
ড. এলির ভাষায়, বিষয়টি অনেকটা সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও স্ক্রল করার মতো। কোনো ভিডিওর শুরুটা বিরক্তিকর মনে হলে মানুষ যেমন দ্রুত পরের ভিডিওতে চলে যায়, পাখিরাও পরীক্ষায় ঠিক একই আচরণ করেছে।
তিনি বলেন, “এদের এ প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, কী ধরনের আওয়াজ তারা করছে সে বিষয়ে তাদের মানসিক ধারণা রয়েছে। অন্যভাবে বললে, নিজেদের প্রতিটি ডাকার অর্থ তারা স্পষ্টভাবেই বোঝে।”
‘লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স’-এর দার্শনিক এবং বিচারক প্যানেলের সদস্য অধ্যাপক জোনাথন বার্চ বলেন, ড. এলি দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে অসাধারণ ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে এ গবেষণা চালিয়ে গেছেন।
তার ভাষায়, “তিনি শুধু জেব্রা ফিঞ্চের ১১টি মৌলিক শব্দের একটি অভিধানই তৈরি করেননি, বরং অভিনব পরীক্ষার মাধ্যমে খোদ পাখিদের কাছ থেকেই যাচাই করেছেন, শব্দগুলোর অর্থ সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে কি না। হাজার হাজার রেকর্ড করা ডাকের অর্থ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এটি একটি অনুকরণীয় গবেষণা।”
এ বছরের পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় আরও ছিল কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গবেষণা। এর মধ্যে একটি ফরাসি গবেষক দল দেখিয়েছে, আফ্রিকান স্ট্রাইপড ইঁদুর আল্ট্রাসনিক কিচিরমিচিরের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে। একটি সুইস-মার্কিন গবেষক দল প্রমাণ পেয়েছে, বোনোবো শিম্পাঞ্জিরা মানুষের বাক্যের মতো করেই বিভিন্ন ধরনের ডাক সাজিয়ে যোগাযোগ করে। এছাড়া আইভরি কোস্টের গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে আরেকটি ফরাসি দল শিম্পাঞ্জিদের বিভিন্ন ধরনের আওয়াজের অর্থ বিশ্লেষণেও কাজ করেছে।
গবেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে অর্থবহ ও সুসংগত যোগাযোগের সম্ভাবনাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। এসব প্রযুক্তির সহায়তায় প্রাণীদের ডাকের ভেতরে থাকা তথ্য ও অর্থ উন্মোচনের কাজও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
তথ্য সূত্র- দ্য গার্ডিয়ান।
বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ